ইসরায়েলি অবরোধ এবং পশ্চিমা মিডিয়ার কপটতা

আপডেট : ১১ জুলাই ২০২৩, ১০:২১ পিএম

অনেক পশ্চিমা সাংবাদিক যেন ইসরায়েলকে রক্ষা করতে এক পায়ে খাড়া, এমনকি মিথ্যা বলতেও রাজি। কথাটা তারা কখনো স্বীকার করবে না বটে, কিন্তু এটাই তারা করে আসছে বারবার। এবার বর্ণবাদী ইসরায়েলের জঙ্গি নেতারা জেনিন শরণার্থী শিবিরের নারী-শিশুসহ ১৪,০০০ ফিলিস্তিনিকে আক্রমণ করতে সেনাদের একটি ব্রিগেডকে নির্দেশ দেওয়ার  ঘটনায় তাদের মিথ্যাচার রাখঢাক ছাড়া বেরিয়ে পড়েছে। শুরুতে যে ‘জঙ্গি, ‘বর্ণবাদ’, ‘আক্রমণ’ বললাম এই তিনটি শব্দ বেশির ভাগ পশ্চিমা সম্পাদকরা ইসরায়েলের ধারাবাহিক ধ্বংসাত্মক কর্মসূচি বর্ণনার সময় সচেতনভাবে এড়িয়ে যান। এর চেয়ে তারা মিথ্যা বলতে বেশি পছন্দ করেন।

গত সপ্তাহে ২০০০ ইসরায়েলি সৈন্য সাঁজোয়া যান, ড্রোন, রকেট এবং হেলিকপ্টার গানশিপ নিয়ে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ঝাঁপিয়ে পড়ে। টানা দুটি দিন ফিলিস্তিনে তারা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড এবং উপর্যুপরি হামলা চালিয়ে পরিবেশ ভয়ংকর করে তোলে। অথচ দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস ও সিএনএনের শিরোনাম দেখলে মনে হয়, যেন কিছুই ঘটেনি। তাদের ভাষায় ইসরায়েল জেনিনে ‘আক্রমণ’ করেনি, কেবল একটি ‘অপারেশন’ ‘লঞ্চ’ করেছে। ‘অপারেশন’ শব্দের মধ্যে কী একটা নিরীহ, বলতে গেলে বিপদমুক্তির ভাব আছে, তাই না? এতে কয়েকটি বিষয় ফুটে ওঠে। প্রথমত, ‘অপারেশন’ বলতে বোঝায়, যাদের ‘অপারেশন’ হচ্ছে তারা সম্মতি দিয়েছেন। দ্বিতীয়ত, ‘অপারেশনে’র ভালো উদ্দেশ্য হলো, যা ভেঙে গেছে তা মেরামত করা। সর্বশেষ কথা হলো, একবার একটি ‘অপারেশন’ সম্পূর্ণ হলে সেখানে আরেকটি ‘অপারেশন’র সাধারণত প্রয়োজন হয় না।

জেনিনে শিশুসহ অন্তত ১২ ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছে। আরও কয়েক ডজন হয়েছে আহত, মানসিক আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছে তারও কয়েকগুণ বেশি। বাড়িঘর ভাঙচুর এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ধ্বংসের তো হিসাব নেই। হাজারো শরণার্থী আবার আশ্রয়হারা হলো, ঠাঁই নিতে হলো তাদের শিবিরের বাইরে কোথাও। কিন্তু যাওয়ার সময় ইসরায়েল তাদের হামলা শেষে বলে যায়

যে, আবার তারা আক্রমণে আসবে যখন তাদের ইচ্ছা। তবুও টাইমস ও সিএনএনের সংবাদ লেখকরা সত্য না বলে শিরোনামে ‘অপারেশন’ শব্দ বেছে নিয়েছেন। কেন? ১৯৪৬ সালে জর্জ অরওয়েল লিখেছিলেন, ‘স্পষ্ট ভাষার সবচেয়ে বড় শত্রু হলো কপটতা।’ বেশির ভাগ পশ্চিমা সাংবাদিকের মধ্যে ব্যক্তিগত কিংবা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে এই কপটতা প্রবল। কখনো তারা ইসরায়েল সম্পর্কে লিখতে বাধ্য হলে কপটতারই আশ্রয় নেয়।  তারা যে মনের অজান্তে ইসরায়েলের পক্ষপাত করছে তা নয়, বরং এটা ইচ্ছাকৃত এবং প্রকাশ্য। সুতরাং তাদের ‘ভালো ছেলেরা’ কি ফিলিস্তিনিদের ‘আক্রমণ’ করতে পারে? তারা তো জাস্ট তাদের ‘অপারেটিং’ করেছে!

অরওয়েল বলেছেন যে, ‘নির্দিষ্ট কয়েকটি বিষয়বস্তু যতই চাগিয়ে উঠুক’, তা সবসময় ‘বিমূর্ততার মধ্যে কংক্রিটের মতো গলে যায়’। জেনিনে ফিলিস্তিনিরা যে ভয়াবহতা সহ্য করেছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য এবং গ্রাফিক চিত্রগুলো যতই পশ্চিমা সাংবাদিকরা দেখুক, যেহেতু এগুলো ইসরায়েলের আগ্রাসনের কারণে হয়েছে, সুতরাং সব চিত্র তাদের সামনে অর্থহীন বিমূর্ততায় পর্যবসিত হয়।

ফলে দেখা যায়, অনেক পশ্চিমা সম্পাদক হামলায় নিহত ও পঙ্গু হওয়া ফিলিস্তিনিদের নাম, বয়স এবং উদ্বিগ্ন ও শোকাহত ফিলিস্তিনি পরিবারের দুঃখগাথা বেমালুম চেপে যান। বরং জেনিনে ইসরায়েলের ‘অপারেশন’ এবং ঐতিহাসিক প্রকৃতি ও তাৎপর্যের ওপর জোর দেন। পশ্চিমা সংবাদ সংস্থা ইয়াহু শিরোনাম তৈরি করেছে কীভাবে দেখুন, ‘পশ্চিম তীরে পরিচালিত ইসরায়েলের কয়েক বছরের মধ্যে বৃহত্তম সামরিক অভিযানটি দ্বিতীয় দিনে প্রবেশ করেছে।’ বাহ, অভিনন্দন, ইসরায়েল।

জনপ্রিয় ওয়েবসাইট দ্য ডেইলি বিস্টের শিরোনামে লেখক যেন আরও একধাপ আগানো। তার মতে, এটি ইসরায়েলি সৈন্যদের একটি ‘ঝটিকা অভিযান’ ছিল, তারা ফিলিস্তিনিদের ‘হত্যা’ করেনি, বরং ফিলিস্তিনিরা ‘বলে’ যে, তারা মারা গেছে। ওয়েবসাইটে অঙ্কিত পুরো শিরোনামটি এমন : ‘শরণার্থী শিবিরে ইসরায়েলের ঝটিকা অভিযানে নয়জন নিহত, ফিলিস্তিনিরা বলে।’ ‘অভিযান’ শব্দটি এখানে বেশির ভাগ নিরস্ত্র ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলি আক্রমণের তীব্রতা কমিয়ে এনেছে। অভিযানের ফলে যারা একটি অবরুদ্ধ শিবির থেকে ‘পালাতে’ বাধ্য হয়েছেন, এতে সেটাও অহেতুক মনে হয়। তা ছাড়া ‘বলে’ শব্দটি সংশয়ের ইঙ্গিত দেয়। মানে না-ও হতে পারে। ফিলিস্তিনিরা তাদের নিহতের সঠিক হিসাব দেবে, বিশ্বাস করা যায়? ফিগারটা একটু বেশি হয়ে গেল না? এই সন্দেহই প্রতিধ্বনিত হয়েছে শিরোনামের শরীরজুড়ে। ডেইলি বিস্টের সতর্ক সংবাদদাতা লিখেছেন, ‘সৈন্যরা অন্যদেরও আহত করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।’ অথচ সাধারণ একটি দুর্ঘটনাকে ‘আক্রমণ’ বলার দ্বিধাও কাজ করবে না, যদি তা ফিলিস্তিনিদের বেলায় ঘটে। গত সপ্তাহে একটি ফিলিস্তিনি পিকআপ তেল আবিব বাসস্টপ ছাউনিতে ঢুকে পড়লে আটজন ইসরায়েলি আহত হয়। নিউ ইয়র্ক টাইমস তাৎক্ষণিক সংবাদ ভিডিও প্রকাশ করে এবং শিরোনাম দেয় : ‘তেল আবিব আক্রমণে আট ইসরায়েলি আহত।’ মানে টাইমসের সম্পাদকীয় হিসাব-নিকাশে সাঁজোয়া যান ও হেলিকপ্টারে সজ্জিত ২০০০ ইসরায়েলি সৈন্যের একটি বাহিনী একটি বন্দি শরণার্থী শিবিরে আক্রমণ করল এবং এক ডজন ফিলিস্তিনিকে হত্যা করল এটা ‘আক্রমণ’ নয়, বরং একজন ফিলিস্তিনি পিকআপ চালিয়ে লাইনচ্যুত হয়ে তেল আবিবে পথচারীদের মধ্যে ঢুকে গেলে, সেটা আক্রমণ!

জেনিনের ঘটনায় পশ্চিমা সম্পাদকদের প্রায় সর্বজনীন ঐকমত্য ছিল যে, ইসরায়েলের ‘অপারেশন’র ‘লক্ষ্য’ ফিলিস্তিনিদের হত্যা কিংবা আঘাত করা নয় বরং ‘পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনি সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোকে শুদ্ধ করে’ যেকোনো প্রতিরোধ-কাণ্ড মুছে ফেলা।

প্যালেস্টাইন ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ইনেস আবদেল রাজেক আলজাজিরাকে বলেন, ‘জেনিনকে ফিলিস্তিনের বাকি ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন ও অবরুদ্ধ করে রাখতে এটি ইসরায়েলের চলমান কৌশলের একটি অংশ। গত কয়েক দশক ধরে গাজাকে বিচ্ছিন্ন করতে যা তারা করেছে, এটা তেমনই।’ পশ্চিমা অনেক সংবাদমাধ্যমে ফিলিস্তিনিদের ওপর ইসরায়েলের দীর্ঘ ও পদ্ধতিগত নিপীড়নকে ‘বর্ণবাদ’ শব্দ দিয়ে বোঝানোর অনুমতি নেই। ফলে ইসরায়েলি সৈন্যরা ফিলিস্তিনিদের ‘চরম শিক্ষা’ দেওয়ার পর কানাডার জাতীয় সংবাদপত্র দ্য গ্লোব ও মেইলের সম্পাদকরা লিখেছেন, ‘ইসরায়েল পশ্চিম তীরের জঙ্গি ঘাঁটি থেকে সৈন্য প্রত্যাহার করেছে এবং সতর্ক করেছে যে, দুদিনের অভিযানই শেষ নয়।’ অর্থাৎ ফিলিস্তিনিরা যদি আচরণ শুদ্ধ না করে তাহলে সৈন্যরা ফিরে আসবে, ড্রোন ও হেলিকপ্টার গানশিপের মাধ্য গোলা ছুড়ে মারবে। কেননা, ফিলিস্তিনিরা বাড়িতে বাস করে না, তাদের বাসস্থান ‘জঙ্গিদের ঘাঁটি’। কিন্তু কে তাদের জানাবে যে, আসলে গোটা ইসরায়েল একটি প্রতিষ্ঠিত ‘জঙ্গিদের ঘাঁটি’? তাদের সরকারের মন্ত্রিপরিষদে বর্ণবাদী মন্ত্রী দিয়ে ভরা? গত সপ্তাহে জেনিনের ইসরায়েলের হামলা বেশির ভাগ পশ্চিমা মিডিয়ার অজ্ঞতা, নির্লজ্জতা ও ঔদ্ধত্য এমন প্রকট আকারে ধরা পড়েছে যে, মনে হয় ইসরায়েলের সময় ফুরিয়ে আসায় তারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেছে।

লেখক : অ্যান্ড্রু মিত্রোভিকা। আলজাজিরার টরন্টোভিত্তিক কলাম লেখক। আলজাজিরা থেকে ভাষান্তর : মনযূরুল হক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত