প্রকোপ বাড়ে কমে প্রাকৃতিক প্রতিরোধ ক্ষমতার কারণে

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৩, ০৬:১৪ এএম

এখন তো ডেঙ্গুর খারাপ অবস্থা। দিন দিন আরও খারাপ হচ্ছে। যে হারে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে, সারা দেশে ডেঙ্গু ছড়িয়ে পড়েছে ও লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, তাতে তো মনে হচ্ছে জুলাই-আগস্ট মাসে ডেঙ্গুর প্রকোপ বিশাল আকার ধারণ করতে পারে। যদি আমরা এডিস মশা নিয়ন্ত্রণ ভালো মতো করতে না পারি তাহলে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করার আশঙ্কা আছে।

ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করতে হলে উড়ন্ত মশা মারতে হবে। বাড়ির বাইরে, আশপাশে পানি জমতে না দেওয়া ও মশা মারার দায়িত্ব প্রশাসনের। কিন্তু নিজের ঘরের দায়িত্ব নিজেকেই নিতে হবে। বাসার ভেতর, ছাদে, জানালার কার্নিশে, ফ্রিজের নিচে, ফুলের টবে পানি জমতে দেওয়া যাবে না, এগুলো পরিষ্কারের ব্যবস্থা করতে হবে, এটা নিজ দায়িত্বে করতে হবে।

এবার ডেঙ্গুর ব্যাপারে বেশি সতর্ক থাকতে হবে। কারণ ধরন বদলে গেছে। অনেক লক্ষণ বোঝায় যায় না। সামান্য জ¦র, সর্দি কাশি, মাথাব্যথা হলেই এবার রোগীর অবস্থা খারাপ হয়ে যায়। সে জন্য যারই এসব উপসর্গ দেখা দিচ্ছে, অবহেলা না করে সঙ্গে সঙ্গে ডেঙ্গু টেস্ট করান। এনএস১ এন্টিজেন্ট টেস্ট করলে এক দিনের মধ্যেই ডেঙ্গু শনাক্ত করা যায়।

দ্রুত টেস্ট করার উদ্দেশ্য হলো, যদি ডেঙ্গু পজিটিভ হয় তাহলে চিকিৎসকের সঙ্গে পরামর্শ করে আগেই চিকিৎসা শুরু করা যায়, তাহলে জটিলতাগুলো এড়ানো সম্ভব। কিন্তু অনেকে দেরি করে। ভাবে, দেখি কী হয়, কালক্ষেপণ করে। যখন অবস্থা মারাত্মক আকার নেয় তখন তাড়াতাড়ি হাসপাতালে যায়। কিন্তু তখন তো আমরা কিছু করতে পারি না। সে জন্য কেউ অবহেলা করবেন না। বিশেষ করে বাচ্চা, বয়স্ক মানুষ, গর্ভবতী নারী এবং যারা অন্যান্য রোগে ভোগেন, যেমন- ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, কিডনি, লিভার, হৃদরোগÑ তাদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি। এই শ্রেণির মানুষ দ্রুত ডেঙ্গু টেস্ট করাবেন। তাদের যদি ডেঙ্গু হয়েই যায়, তাহলে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ভালো।

ডেঙ্গুর যে লক্ষণ, তা পরিবর্তন হয়েছে। আমরা এতদিন বলতাম যে, যাদের ১০৪-১০৫ ডিগ্রির ওপর জ¦র, হাড়ে হাড়ে, গিটে গিটে, ঘাড়, মাথা, পিঠে ও চোখে ব্যথা, গায়ে র‌্যাশ ওঠে, রক্তে প্লাটিলেট কমে যায়, বমির সঙ্গে রক্তক্ষরণ হয়, এগুলো ডেঙ্গুর লক্ষণ। কিন্তু এবার এ ধরনের রোগী পাওয়া যায় না। এবার আগের মতো উচ্চমাত্রার পাঁচ দিনের জ¦র না-ও হতে পারে, সামান্য জ¦র নিয়েও ডেঙ্গু হতে পারে। আগে বলা হতো, পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলে এবং জ¦র সেরে যাওয়ার পরই কেবল জটিলতা শুরু হয়। তবে এখন দেখা যাচ্ছে, জ¦রের শুরুতেই বা দ্বিতীয়, তৃতীয় দিনেও জটিলতা নিয়ে রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন। আকস্মিক রক্তচাপ কমে যাওয়া, ক্যাপিলারি লিকেজ, রক্তের প্লাটিলেট কমে যাওয়া, হেমাটোক্রিট বেড়ে যাওয়াÑ এসব দেখে জটিলতা বোঝা যায়। এবার দেখা যায়, রোগীর ২-৩ দিন জ¦র, মাথাব্যথা হওয়ার পরই শরীর খারাপ হয়ে যায়। এ ধরনের ডেঙ্গুকে শক সিনড্রোম বলে। এবার বেশির ভাগ রোগী এই শক সিনড্রোমেই মারা যাচ্ছে।

ধরনটা বদলে যাওয়ার কারণে বোঝার উপায় থাকে না ডেঙ্গু কি না। রোগীও বোঝে না। ভাবে, একটু জ¦র, গলাব্যথা, দেখি কী হয়। সময়ক্ষেপণ করে, চিকিৎসা নিতে দেরি হয়ে যায়। তা ছাড়া বর্তমানে যারা আক্রান্ত হচ্ছেন, তারা প্রায় সবাই দ্বিতীয়, তৃতীয় বা চতুর্থবারের মতো সংক্রমিত হচ্ছেন। এসব কারণে জটিলতাও বেশি দেখা যাচ্ছে।

মাঝখানে যে ডেঙ্গুর প্রকোপ কম ছিল, সেটা হতে পারে প্রাকৃতিক কারণে, বা মানুষের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা ওঠানামাও কারণ হতে পারে। এবার বেড়ে গেছে। এটার কারণ এমনও হতে পারে, দুই-তিন বছর করোনা গেল। মানুষের শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কমে গেছে। ডেঙ্গু বাড়া বা কমার কারণ ব্যাখ্যা করা কঠিন। কিন্তু প্রাকৃতিক বা যে কারণেই হোক, ডেঙ্গু হয়েছে।

ডেঙ্গুর চিকিৎসার ব্যাপারে আমাদের চিকিৎসকরা দক্ষ। চিকিৎসা সবাই ভালো মতোই পারে। চিকিৎসার সমস্যা নেই। রোগীরা আগে আসবে। যারা আসবেন না, তারা ঘরে থাকবেন। প্রচুর পানি, শরবত, গ্লুকোজ, তরল খাবার খাবেন।

বাইরের ওষুধের দোকান থেকে প্যারাসিটামলের বাইরে কোনো ওষুধ খাওয়া যাবে না। এমনকি নিজের ইচ্ছায় বা ফার্মেসির কথা শুনে কোনো ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক খাবেন না। চিকিৎসক প্রেসক্রিপশন দিলে সেটা খাবেন। পরিস্থিতি যদি খারাপ দেখেন তাহলে হাসপাতালে ভর্তি হবেন।

ডেঙ্গু নির্মূল করা যাবে না, নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যেহেতু মশা আছে ও কমবেশি থাকবে, তাই ডেঙ্গুও ওঠানামা করবে। সুতরাং ডেঙ্গু ছিল, আছে ও ভবিষ্যতেও থাকবে। এটাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। সে জন্য জনগণকে সচেতন ও সতর্ক থাকতে হবে। প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা চালাতে হবে।

লেখক : ইমেরিটাস অধ্যাপক ও মেডিসিন বিশেষজ্ঞ 

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত