গণমাধ্যম হতে পারে ইসলাম প্রচারের উর্বর ক্ষেত্র

আপডেট : ১৫ জুলাই ২০২৩, ১০:২৬ পিএম

আধ্যাত্মিক, অরাজনৈতিক ও মানবকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠান বায়তুশ শরফ আনজুমনে ইত্তেহাদ বাংলাদেশের চতুর্থ পীর রাহবারে বায়তুশ শরফ আল্লামা শায়খ মুহাম্মদ আব্দুল হাই নদভী। বিভিন্ন ভাষায় পারদর্শী এই আলেমের সম্পাদিত, রচিত ও অনূদিত গ্রন্থসংখ্যা দুই শতাধিক। তিনি মুখোমুখি হয়েছিলেন দেশ রূপান্তরের। কথা বলেছেন বায়তুশ শরফের কর্মকাণ্ডসহ নানা বিষয়ে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এহসান সিরাজ

দেশ রূপান্তর : আপনার বাবার সমাজ সংস্কারকমূলক চিন্তাধারা ও তার কর্মময় জীবন সম্পর্কে কিছু জানতে চাই?

মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল হাই নদভী : আমার বাবা শাহ মুহাম্মদ আবদুল জব্বার রহমাতুল্লাহি আলাইহি ছিলেন মসজিদভিত্তিক আধ্যাত্মিক ও সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান বায়তুশ শরফের প্রধান রূপকার। তিনি ছিলেন যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলেম, পীরে কামেল, শিরক, বিদআত ও অসামাজিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। তিনি জাতীয় পর্যায়ে বারবার পুরস্কারপ্রাপ্ত চট্টগ্রামের বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসাসহ দেশের আনাচে-কানাচে ৬৫টি বায়তুশ শরফ প্রতিষ্ঠা করেই শেষ করেননি। ১৯৯৩ সালে প্রস্তাবিত আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় চট্টগ্রামের প্রথম প্রস্তুতিসভা তার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠাকালীন অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ আন্তর্জাতিক ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম ট্রাস্ট তাকে চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত করে।

ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ লিমিটেড প্রতিষ্ঠায়ও তার ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। তিনি ছিলেন ইসলামী ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, গভর্নিং বোর্ডের ভাইস প্রেসিডেন্ট এবং আজীবন শরিয়াহ কাউন্সিলের চেয়ারম্যান। তার প্রতিষ্ঠিত বায়তুশ শরফ ফাউন্ডেশন ইসলামী ব্যাংকের অন্যতম স্পন্সর। একজন সুলেখক ও অনুবাদক হিসেবে তিনি ছোট-বড় ২১টি গ্রন্থ রচনা করেন। ১৯৯১ সালের ৮ জানুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র সফরকালে তার ব্যাপক কর্মধারা সম্পর্কে অবগত হয়ে ভয়েস অব আমেরিকা তার সাক্ষাৎকার প্রচার করে। এ সময় বায়তুশ শরফকে ‘মিনি গভর্নমেন্ট’ আখ্যায়িত করা হয়।

দেশ রূপান্তর : আপনি তার মিশন কীভাবে এগিয়ে নিচ্ছেন?

মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল হাই নদভী : ১৯৯৮ সালের ২৬ মার্চ বাবার ইন্তেকালের পর তার দীর্ঘদিনের ছায়াসাথী আল্লামা শাহ মুহাম্মদ কুতুব উদ্দিন (রহ.) বায়তুশ শরফের হাল ধরেন। ২০২০ সালের ২০ মে আল্লামা শাহ মুহাম্মদ কুতুব উদ্দিন (রহ.)-এর চিরবিদায়ের মধ্য দিয়ে পরিসমাপ্তি ঘটে এক আলোকিত অধ্যায়ের। বায়তুশ শরফের পীর সাহেব হিসেবে সমধিক পরিচিত আল্লামা শাহ মুহাম্মদ কুতুব উদ্দিন (রহ.)-এর ইন্তেকালের পর বায়তুশ শরফের দায়িত্ব এসে পড়ে আমার ওপর।

দায়িত্ব আসার পর বিশেষায়িত ব্যক্তিবর্গ নিয়ে আনজুমনে ইত্তেহাদ বাংলাদেশ ও মজলিসুল ওলামা পুনর্গঠন, বায়তুশ শরফ ইসলামী গবেষণা কেন্দ্র ও আনজুমনে নওজোয়ানকে পুনর্জীবনসহ যেসব কর্মসূচি দ্বারা আল্লামা মুহাম্মদ আবদুল জব্বার (রহ.) বায়তুশ শরফকে জাতিভিত্তিক আধ্যাত্মিক ও মানবসেবামূলক প্রতিষ্ঠানে রূপ দিয়েছিলেন তার সবটিতে নতুন করে প্রাণসঞ্চারে ব্যাপক কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।

চট্টগ্রাম মহানগরীর ধনিয়ালাপাড়াস্থ কেন্দ্রীয় বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সসহ বর্তমানে দেশব্যাপী সাত শতাধিক শাখা কমপ্লেক্সকে নতুন আঙ্গিকে সাজানো ও পরিচালনার মহাপরিকল্পনার অংশ হিসেবে একশত কোটি টাকা ব্যয়ে বহুতল বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় মসজিদ বায়তুশ শরফ, বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স-মাস্টার্স) মাদ্রাসার একাডেমিক ভবন, এতিমখানা ভবন, হোস্টেল ভবন নির্মাণের কাজ অতিশিগগিরই শুরু হবে বলে আশা করছি। শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল ইতিমধ্যেই একাডেমিক ভবনের ভিত্তিস্থাপন করেছেন। ব্যাপকভিত্তিক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা গ্রহণের ফলে কেন্দ্রীয় বায়তুশ শরফ কমপ্লেক্সের পাশাপাশি দেশের আনাচে-কানাচে প্রতিষ্ঠিত বায়তুশ শরফের শাখা-প্রশাখাতেও দেখা দিয়েছে প্রাণচাঞ্চল্যতা।

দেশ রূপান্তর : আল্লামা শাহ আব্দুল জব্বার ফাউন্ডেশনের বর্তমান কার্যক্রম কী?

মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল হাই নদভী : ‘আল্লামা শাহ আবদুল জব্বার ফাউন্ডেশন’ আর্ত-মানবতার সেবায় নিবেদিত একটি সমাজ কল্যাণমূলক, শিক্ষা ও গবেষণাধর্মী প্রতিষ্ঠান। এটি একটি দলীয় প্রভাবমুক্ত সম্পূর্ণ স্বাধীন, নিরপেক্ষ, বস্তুনিষ্ট ইসলামি মূল্যবোধ ভাবাপন্ন প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি মানুষের জীবন ব্যবস্থায় উদ্ভূত ধর্মীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক সমস্যাবলির ইসলামি মূল্যবোধসম্মত সমাধান খুঁজে বের করতে আগ্রহী। ইতিমধ্যে এই ফাউন্ডেশনের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু হয়েছে। ভবিষ্যতে সংগঠনের শিক্ষামূলক কার্যক্রম, তালিম-তরবিয়াত, সাহিত্যানুষ্ঠান, তাহজিব-তামাদ্দুন ও ইসলামি ঐতিহ্যের প্রচার-প্রসার, দুর্গতের মাঝে ত্রাণ তৎপরতা ও মানবসেবামূলক নানাবিধ কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং সংগঠনের শাখা সারা দেশে প্রতিষ্ঠা সম্ভব হবে বলে আমার দৃঢ় বিশ্বাস।

দেশ রূপান্তর : মজলিসুল ওলামা বাংলাদেশ নামে রাজনীতিবিমুখ একটি ইসলামি ঐক্যপ্রয়াসী সেবামূলক সংগঠন করেছিলেন আপনার বাবা। সেটার কার্যক্রম কী?

মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল হাই নদভী : বিগত শতাব্দীর আশির দশকের শেষের দিকে হঠাৎ দেশব্যাপী একদিকে ইসলামবিদ্বেষী শক্তির নানামুখী অপতৎপরতা, অন্যদিকে আলেম-ওলামাদের মাঝে পারস্পরিক হানাহানি, রেষারেষি, গালাগালি, একে অন্যের বিরুদ্ধে ফতোয়াদানের রীতি ব্যাপক আকার ধারণ করলে আমার বাবা আল্লামা আবদুল জব্বার (রহ.) অত্যন্ত বিচলিত হন। রাজনীতির ঊর্ধ্বে থেকে সব হক্কানি আলেম-ওলামা, পীর-মাশায়েখকে ঐক্যবদ্ধ করতে তিনি দীর্ঘ সাংগঠনিক সফর ও জটিল পথপরিক্রমা অতিক্রম করে ১৯৮৫ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ইত্তেহাদুল ওলামা বাংলাদেশ। মহল বিশেষের অসহযোগিতা ও নানামুখী ষড়যন্ত্রের কারণে তার এই উদ্যোগ ব্যর্থ হলেও থমকে দাঁড়াননি; ১৯৯৮ সালে গঠন করেন মজলিসুল ওলামা বাংলাদেশ।

মতানৈক্যের মাঝে মতৈক্য প্রতিষ্ঠাই ছিল মজলিসুল ওলামা গঠনের মূল লক্ষ্য। আব্বা সবসময় বলতেন, ‘মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু ইসলামের মৌলিক বিষয়ে আনুগত্য ও আস্থাশীল থাকলে ক্ষুদ্র মতপার্থক্য ঐক্যের পথে বাধার প্রাচীর হতে পারে না।’ সেই লক্ষ্য সামনে নিয়ে আমরাও এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছি।

দেশ রূপান্তর : আপনি একজন লেখক। দুই শতাধিক বই বের হয়েছে। কীভাবে সম্ভব?

মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল হাই নদভী : বায়তুশ শরফের খেদমতের দায়িত্ব এসেছে মাত্র তিন বছর আগে। ইতিপূর্বে প্রায় তিন দশক ধরে আমি ছিলাম লেখালেখি ও গবেষণার জগতে। উপমহাদেশের বিখ্যাত দ্বীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভারতের উত্তর প্রদেশের নাদওয়াতুল ওলামা লক্ষেèৗ থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে দেশে ফেরার কিছুদিন পর ১৯৯৩ সালে বায়তুশ শরফ আদর্শ কামিল মাদ্রাসায় শিক্ষকতায় যোগদান করি। শিক্ষকতার পাশাপাশি লেখালেখি ও গবেষণাধর্মী কাজে নিজেকে পরিব্যাপ্ত রাখি।

আমার পড়াশোনা আর লেখালেখি মূলত কোরআন-হাদিস, ইলমে ফিকহ, নবী-রাসুল, খোলাফায়ে রাশেদীন, পীর-আউলিয়াদের জীবনাবলি, সমসাময়িক মাসয়ালা-মাসায়েল ও যুগ-জিজ্ঞাসার জবাব। তারই ফলশ্রুতিতে প্রকাশিত হতে থাকে একের পর বিভিন্ন গ্রন্থ। ২০২০ সালে বায়তুশ শরফের দায়িত্বভার আসার পর লেখালেখি আর পড়াশোনায় ব্যত্যয় ঘটলেও সময় সুযোগ পেলেই বসে পড়ি অধ্যবসায়।

দেশ রূপান্তর : আরবি, ফারসি এবং উর্দুর সঙ্গে বাংলা চর্চা কীভাবে করলেন?

মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল হাই নদভী : মাদ্রাসা পড়ুয়া হয়ে মাতৃভাষা বাংলায় ইসলামি সাহিত্যচর্চা নতুন কিছু নয়। অধিকন্তু, বর্তমানে মাদ্রাসা শিক্ষা কার্যক্রমে আরবিকে ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হলেও বাংলাই হচ্ছে প্রধান মাধ্যম। যদিও আমাদের সময় আরবির পাশাপাশি ফারসি এবং উর্দুকে সমান গুরুত্ব দেওয়া হতো। অবশ্য এর পেছনে কারণও ছিল। তখন কোরআন-হাদিসের অধিকাংশ তাফসির এবং ইসলামের অন্যান্য মৌলিক গ্রন্থগুলো ছিল ফারসি কিংবা উর্দুতে। বর্তমান সিলেবাসে ইসলামের মৌলিক গ্রন্থগুলো বাংলায় অনূদিত হওয়ায় ফার্সি এবং উর্দুর আর প্রয়োজন পড়ে না।

দেশ রূপান্তর : ইসলাম প্রচারে গণমাধ্যম কী ভূমিকা রাখতে পারে?

মাওলানা মুহাম্মদ আব্দুল হাই নদভী : ইসলাম নিছক কোনো ধর্ম নয়, এটি পূর্ণাঙ্গ একটি জীবন বিধানের নাম। এখানে একজন মানুষের সামগ্রিক জীবনের সবদিক সম্পর্কেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আলোকপাত করা হয়েছে। যেহেতু এ দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ মুসলিম, স্বাভাবিকভাবে তারা গণমাধ্যমে জীবনের অনুষঙ্গ ইসলামকে খুঁজে ফেরেন। অন্য দশটি বিষয়ের সঙ্গে ধর্মের প্রয়োজনীয় আলোচনাও থাকুক সেটা তারা চান। এ জন্য গণমাধ্যমের উচিত গণমানুষের কাছে ইসলামের সঠিক বার্তা পৌঁছে দেওয়া। ইসলামের বিস্তৃত ব্যাখ্যা যেমন আছে তেমনি আছে কিছু অপব্যাখ্যাও। ইসলামের সঠিক ব্যাখ্যা উপস্থাপনের মাধ্যমে গণমাধ্যম হতে পারে দাওয়াতের একটি উর্বর ক্ষেত্র।

গত দুই-তিন দশকে এ দেশের সংবাদমাধ্যমে পরিবর্তন এসেছে। সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ইসলামও গণমাধ্যমের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছে। ইসলামি মনোভাবাপন্ন পাঠকের এই চাওয়া থেকেই গণমাধ্যমগুলো ধর্মীয় কনটেন্টের পরিমাণ বাড়াচ্ছে দিন দিন। নিঃসন্দেহে এটি একটি ইতিবাচক দিক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত