নেত্রকোনার কলমাকান্দা উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা ব্যক্তিদের কারণে-অকারণে হয়রানি করার অভিযোগ উঠেছে অফিসটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, দালাল অথবা ভূমি কার্যালয়ের লোকদের সঙ্গে ঘুষের বিষয়ে চুক্তিবদ্ধ না হয়ে সেবা নিতে গেলে সেবা গ্রহীতাদের পড়তে হয় চরম দুর্ভোগে।
অভিযোগ আছে, ভূমি কার্যালয় থেকে নামজারির জন্য শুনানির তারিখ নির্ধারণ করলেও নির্দিষ্ট সময়ের আগেই নামঞ্জুর করে দেওয়ার। তা ছাড়া নাম জারিসহ উপজেলা ভূমি কার্যালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র কার্যালয়টির অফিস সহায়ক (পিয়ন) আব্দুল জলিল প্রথম পর্যায়ে যাচাই-বাচাই করেন এই বলেও অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, জমির নামজারি, ডিসিআর, মিস কেসসহ অন্যান্য জমি সংক্রান্ত সেবা ও সমস্যা সমাধানের জন্য উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে আসেন এলাকাবাসী। আসলেই বিভিন্ন অজুহাতে পড়তে হয় তাদের নানা সমস্যায়। সবচেয়ে বেশি হয়রানির শিকার হতে হয় নাম জারি ও মিসকেস নিয়ে।
বর্তমানে ভূমি কার্যালয়ের প্রায় সকল কার্যক্রমেই চলে অনলাইনে। তথ্যানুযায়ী একজন নামজারি গ্রহীতা প্রথমে অনলাইনে আবেদন করবেন। এরপর তার হার্ড কপি সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে কাছে জমা দেবেন। আবার জমি সংক্রান্ত সকল সেবার জন্য নিয়ম অনুযায়ী লিখিত অবেদনও জমা দিতে হবে। তারপর শুরু হওয়ার কথা সেই ফাইলের কার্যক্রম।
সরকারি নিয়ম অনুযায়ী আবেদন মঞ্জুর হওয়ার পর ডিসিআর এর জন্য এক হাজার একশত টাকা জমা দিলে জমির নামজারি হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু উপজেলা ও ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও দালালসহ প্রতি নাম জারিতে প্রায় ১০-১২ হাজার টাকা করে দিতে হয় সেবা গ্রহীতাদের। আর চাহিদা অনুযায়ী টাকা না দিলে দিনের পর দিন ভূমি কার্যালয়ে ঘুরেও মেলে না কোনো প্রতিকার। বিশেষ করে, প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে সেবা নিতে আসা সাধারণ মানুষরা পড়েন চরম দুর্ভোগে।
নাজিরপুর ইউনিয়নের রহিমপুর গ্রামের ভুক্তভোগী রাজিয়া বেগম জানান, গাখাজুরা মৌজায় স্বামী ও তার নামে প্রায় পাঁচ একর জমি আছে। গত জানুয়ারি মাসে রাজিয়া নাজিরপুর ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে জমির নামজারি করতে গেলে সেখানকার ইউনিয়ন সহকারি ভূমি কর্মকর্তা মীর মাসুদ তার কাছে এক লাখ ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। পরে অবশ্য ৩০ হাজার টাকার মৌখিক চুক্তি হয় সেই কর্মকর্তার সাথে। কিন্তু রাজিয়া সেই টাকা জোগার করতে না পারায় এখনও নামজারি করতে পারেনি বলে দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন তিনি। তবে কাগজপত্র অফিসটিতে জমা রেখেছেন বলেও জানান এই ভুক্তভোগী।
কলমাকান্দা সদর ইউনিয়নের চত্রংপুর গ্রামের ভুক্তভোগী আব্দুর রশিদ আকন্দ বলেন, গত দুই মাস আগে তিনি নিয়ম অনুযায়ী তার দেড় একর জমি খারিজের জন্য অনলাইনে আবেদন করেন। কিন্তু ভোটার আইডি কার্ডে তার পিতার নাম লাল চান আকন্দ আর জমির দলিলে ইয়াছিন আকন্দ লিপিবদ্ধ হয়েছে। তাই তিনি ইউনিয়ন পরিষদ থেকে লাল চান আকন্দ ও ইয়াছিন আকন্দ একই ব্যক্তি মর্মে চেয়ারম্যান কর্তৃক একটি প্রত্যয়ন জমা দেন। কিছুদিন পর মোবাইলে খুদে বার্তা দিয়ে জানানো হয় তার আবেদনটি নামঞ্জুর করা হয়েছে। তবে কি কারণে নামঞ্জুর করা হয়েছে তিনি এখনও জানতে পারেনি।
কলমাকান্দা সদর ইউনিয়নের চাঁনপুর গ্রামের কৃষ্ণ চন্দ্র কর বলেন, গত মাসে তিনি দুইটি খারিজের জন্য সদর ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয় যান। প্রতিটি খারিজের জন্য তার কাছে চাওয়া হয় ১০ হাজার টাকা করে মোট ২০ হাজার টাকা। পরে তিনি অন্য আরেক জায়গায় ৫০০ টাকা দিয়ে অনলাইনে আবেদন করেন। ১২ জুলাই তার মোবাইলে খুদে বার্তায় জানানো হয় ২৩ জুলাই শুনানি হবে। কিন্তু শুনানির আগেই ১৬ জুলাই মোবাইলে খুদে বার্তা দিয়ে জানানো হয় তার নাম জারিগুলো নামঞ্জুর করা হয়েছে। তিনি বলেন, ২০ হাজার টাকার চিন্তা না করে যদি অফিসের লোক দিয়ে নামজারিগুলো করাতাম তাহলে হয়তো নামঞ্জুর হতো না।
কলমাকান্দা উপজেলা ভূমি অফিসের পিয়ন আব্দুল জলিল বলেন, কাগজপত্র যাচাই-বাছাই আমি করি না।
নাজিরপুর ইউনিয়ন সহকারি ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) মীর মাসুদ বলেন, রাজিয়া নামে এমন কেউ আমার কাছে আসে নাই। অভিযোগটি মিথ্যা।
সদর ইউনিয়নের নায়েব আজগর আলীর মোবাইলে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও ফোন বন্ধ্ দেখিয়েছে ।
এই ব্যাপারে জানতে চাইলে কলমাকান্দার উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, জনগণ অনলাইনে আবেদন করবে। নায়েবদের কাছে যাবে কেন? নিজের আবেদন নিজেই করবে।
তিনি আরও বলেন, আবেদন না মঞ্জুরের ক্ষেত্রে কাগজপত্রে ত্রুটি থাকতে পারে। কোন অভিযোগ থাকলে তারা (ভুক্তভোগীরা) সরাসরি আমার সাথে যোগাযোগ করতে পারে। নায়েবদের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে দেখা হবে।