এইচআইভি ও এইডস বিষয়ে দেশের কিশোর-কিশোরীদের জ্ঞানের পরিধি শূন্য। এইচআইভি কী জানতে চাইলে তাদের অনেকে বলেছে, তারা তা জানে না। এদের কেউ কেউ এটিকে একটি সফটওয়্যার বলে উল্লেখ করেছে।
দেশের প্রত্যন্ত এলাকার কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যজ্ঞান সম্পর্কে ধারণা পেতে মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কিশোর-কিশোরীদের ওপর চালানো একটি জরিপে এ চিত্র পাওয়া গেছে। গত জুন মাসে স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতিতে এ জরিপ চালায় দেশ রূপান্তর।
কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞানদান ও সচেতনতায় সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগ থাকলেও মাঠপর্যায়ে সেগুলোর কোনো ফলাফল পাওয়া যায়নি। কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যজ্ঞান তৈরির জন্য কমিউনিটি হাসপাতাল থেকে কার্যক্রম পরিচালিত হওয়ার কথা। এ ছাড়া বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সচেতন করতে স্বাস্থ্যকর্মীদের উদ্যোগ থাকার কথা। এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনাও আছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, এই নির্দেশনা বেশিরভাগ ক্ষেত্রে কাগজে রয়ে গেছে। দেশ রূপান্তরের ওই জরিপে দেখা যায়, মৌলভীবাজারে কিশোর-কিশোরীদের প্রজনন স্বাস্থ্য ও পরিচ্ছন্নতা থেকে শুরু করে সাধারণ স্বাস্থ্যবিষয়ক বনিয়াদি জ্ঞানের অভাব রয়েছে।
পাঠ্যবইয়ে কী আছে
বিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসংক্রান্ত বইয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক বিভিন্ন তথ্য দেওয়া থাকলেও কিশোর-কিশোরীরা এগুলো সম্পর্কে বলতে পারে না। নবম ও দশম শ্রেণিতে পুষ্টির ধারণা ও এর প্রয়োজনীয়তা, পুষ্টিহীনতার কারণ ও প্রতিকার, বয়স অনুসারে খাদ্যতালিকা ও ক্যালরির চাহিদা, খাদ্যে বিষক্রিয়া, কারণ ও প্রতিকার সম্পর্কিত পাঠ রয়েছে। অষ্টম শ্রেণিতে হিউম্যান ইমিউনোডেফিসিয়েন্সি ভাইরাস (এইচআইভি), এই ভাইরাসের কারণে সৃষ্ট রোগ এইডস, প্রজনন স্বাস্থ্য ও প্রজনন স্বাস্থ্যসংক্রান্ত স্বাস্থ্যবিধি, প্রজননতন্ত্রের বিভিন্ন রোগ প্রতিরোধ, নিরাপদ মাতৃত্ব, উপযুক্ত বয়সে গর্ভধারণ বিষয়সহ অন্যান্য বিষয়ে পাঠ রয়েছে। এ ছাড়া সপ্তম শ্রেণিতে বয়ঃসন্ধিকালে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, দৈহিক ও মানসিক স্বাস্থ্য ঠিক রাখার উপায় এবং মাদকের কুফল সম্পর্কে অলোচনা করা হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, শ্রেণিকক্ষে এসব বিষয়ে ঠিকমতো পাঠদান করা হয় না। এগুলো পড়ানোর জন্য আলাদা এবং উপযুক্ত শিক্ষক নেই। ফলে যে উদ্দেশ্যে পাঠ্যবইয়ে এগুলো সংযোজিত হয়েছে, তা ব্যর্থ হচ্ছে।
এ বিষয়গুলো শিক্ষার্থীদের সরাসরি জানাতে মাঠপর্যায়ের স্বাস্থ্যকর্মীদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বিদ্যালয়গুলোয় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, স্বাস্থ্যকর্মীরা নিয়মিত এসব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন না।
স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ ও স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত রয়েছে কিশোরীরা। উঠান বৈঠক ও কাউন্সেলিং নিশ্চিত করার কথা থাকলেও এসবের কোনোটিই করা হচ্ছে না বলে কিশোরীদের অভিযোগ।
কিশোরীদের বয়ঃসন্ধিকালীন দৈহিক পরিবর্তন, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, স্যানিটারি প্যাডের ব্যবহার, কিশোরী মাতৃত্বের কুফলসহ অন্যান্য বিষয়ে কাউন্সেলিং না পাওয়ায় স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞান নিয়ে সঠিক ধারণা তাদের মধ্যে নেই।
স্বাস্থ্যজ্ঞানের করুণ দশা
মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলার বিভিন্ন এলাকার কিশোর-কিশোরীদের নিয়ে গত জুন মাসে স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতিতে জরিপ চালায় দেশ রূপান্তর। সেখানে স্বাস্থ্যবিষয়ক অধিকাংশ প্রশ্নের ভুল উত্তর দিয়েছে তারা। শারীরিক বৃদ্ধির কারণে বয়ঃসন্ধিক্ষণকালে আয়রনের চাহিদা বাড়ে। এ জন্য কিশোরীদের আয়রন ট্যাবলেট খেতে হয়। কিন্তু দেখা গেছে, আয়রন ট্যাবলেট নিয়ে অনেক কিশোরীর কোনো ধারণাই নেই। অনেকের জানা থাকলেও কতটি খেতে হবে, এ রকম কোনো তথ্য তাদের কাছে নেই।
জরিপে দৈবচয়নভিত্তিতে ১৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী ২০ কিশোর ও ২০ কিশোরীকে ছয়টি প্রশ্ন করা হয়। কুলাউড়ার কাদিপুর, রাউৎগাঁও, কুলাউড়া সদর ও পৌরসভা এলাকায় এ জরিপ চালানো হয়। এতে দেখা গেছে, কিশোরীরা সবাই কেবল দুটি প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরেছে। চারটি প্রশ্নের উত্তর কেউই দিতে পারেনি। কিশোরদের ক্ষেত্রে তিনটি প্রশ্নের উত্তর কেউই দিতে পারেনি। অন্য তিনটি প্রশ্নের ক্ষেত্রে বেশিরভাগই ভুল উত্তর দিয়েছে।
জরিপে একটি প্রশ্ন ছিল বডি মাস ইনডেক্স বা বিএমআইসংক্রান্ত। বিএমআই হচ্ছে শরীরের আদর্শ ওজন নির্ণয়ের একটি গাণিতিক পদ্ধতি। শরীরের উচ্চতা অনুযায়ী আদর্শ ওজন নির্ণয় বিএমআইয়ের ভিত্তিতে করা হয়। কিন্তু জরিপে এ-সংক্রান্ত প্রশ্নের কোনো উত্তর কিশোর-কিশোরীরা দিতে পারেনি। বিএমআই তাদের কাছে অপরিচিত বলে জানায় তারা।
কৈশোরকালীন বৈচিত্র্যময় খাবার খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ সময় বৈচিত্র্যময় খাবার না খেলে অপর্যাপ্ত পুষ্টির কারণে স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে এবং দীর্ঘস্থায়ী রোগের ঝুঁকি বৃদ্ধি করে বলে জানান বিশেষজ্ঞরা। কিন্তু বৈচিত্র্যময় খাবার সম্পর্কে কোনো ধারণা নেই কিশোরীদের। পুষ্টি বিশেষজ্ঞরা ছয় ধরনের খাবারের কথা বললেও জরিপে দেখা গেছে, এসব সম্পর্কে কিশোর-কিশোরীদের কোনো ধারণা নেই।
স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে না জানায়, তারা রাস্তার খোলা খাবার, এনার্জি ড্রিংক, চটপটিসহ অস্বাস্থ্যকর নানা ধরনের মুখরোচক খাবার গ্রহণ করছে। গ্রামের অনেক কিশোর জরিপে চিপস খাওয়াকে মোটামুটি ভালো হিসেবে চিহ্নিত করেছে। জরিপে অংশগ্রহণকারী ৪০ কিশোর-কিশোরীর মধ্যে ছয়জন বলেছে, এইচআইভি একটি সফটওয়্যার বলে তাদের অনুমান।
কেন এত অজ্ঞতা
বিদ্যালয়ের কিশোর-কিশোরীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা বয়ঃসন্ধিকালের স্বাস্থ্যগত বিষয় সম্পর্কে কারও কাছ থেকে কোনো রকম প্রশিক্ষণ বা পরামর্শ পায়নি।
শান্ত দেব নামের এক শিক্ষার্থী এই প্রতিবেদককে বলে, ‘বয়ঃসন্ধিকালে কী করতে হবে, আমার জানা নেই। এগুলো কোথাও শুনিনি।’
অষ্টম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহদি রহমান বলে, ‘এইচআইভি কী, আমি জানি না। এটা কী কাজে লাগে, তাও বলতে পারি না। কেউ এটা সম্পর্কে বলেনি।’
শাহিনা আক্তার নামে দশম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলে, ‘আয়রন ট্যাবলেট খাওয়ার কথা কেউ বলেনি। এগুলো আমরা খাই না। আমাদের মায়েরাও এই বয়সে খায়নি। এ জন্য আমাদের তারা বলেনি।’
নাদিয়া আক্তার নামের সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী বলে, ‘বৈচিত্র্যময় খাবার সম্পর্কে আমরা জানি না। আমরা নিয়মিত খাবার খাই। তবে আমাদের মতো করে।’
সব উদ্যোগ কাগজে
কিশোর-কিশোরীদের স্বাস্থ্যজ্ঞান তৈরির জন্য উঠান বৈঠক, বাড়ি পরিদর্শন, স্যাটেলাইট বা কমিউনিটি ক্লিনিকে স্বাস্থ্য শিক্ষা ও কমিউনিটি সভা ও বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ এবং সচেতনতা তৈরিতে কাজ করার নির্দেশনা আছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের। স্থানীয় পর্যায়ে স্বাস্থ্যসহকারী, কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার এবং ফ্যামিলি ওয়েলফেয়ার অ্যাসিস্ট্যান্টদের এগুলো বাস্তবায়ন করার কথা।
কয়েকজন স্বাস্থ্যকর্মীর সঙ্গে কথা বললে তারা দাবি করেন, মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা তারা জানেন। সে অনুযায়ী তারা কিশোর-কিশোরীদেরও কাউন্সেলিং বা স্বাস্থ্যবিষয়ক পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন।
উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের কর্মধা ইউনিয়নের স্বাস্থ্য সহকারী দিলীপ কুমার বলেন, ‘আমরা কিশোর-কিশোরীদের পরামর্শ দিই। আমরা এসব পরামর্শ দিয়ে তাদের সচেতন করি।’
কিশোর-কিশোরীরা বলেছে, কাউন্সেলিং করা হয় না। এ বিষয়ে স্বাস্থ্য সহকারী প্রদীপ সিংহ বলেন, ‘কাউন্সেলিং করার নির্দেশনা রয়েছে। আমরা নিয়মিত করার চেষ্টা করি।’
আরেক স্বাস্থ্য সহকারী মো. আব্দুর রব জানান, তারা নিয়মিত কাউন্সেলিং করার চেষ্টা করেন। তবে এসব নিয়ে কিশোর-কিশোরীদেরই আগ্রহ কম থাকে।
উপজেলার কর্মধা উচ্চবিদ্যালয়, আলী আমজদ উচ্চবিদ্যালয়, মনু মডেল কলেজসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে গিয়ে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন এই প্রতিবেদক।
নবীন চন্দ্র মডেল উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমির হোসেন বলেন. ‘বিদ্যালয়ে শারীরিক শিক্ষা ও স্বাস্থ্য নিয়ে আমাদের শিক্ষকরা পাঠদান করেন। এ ছাড়া স্বাস্থ্যকর্মীদের এসব বিষয়ে ক্লাসে আলোচনা করার কথা রয়েছে। কিন্তু তা হয় না।’
এ বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মৌলভীবাজারের সিভিল সার্জন ডা. চৌধুরী জালাল উদ্দিন মোর্শেদ বলেন, ‘স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। আমাদের কার্যক্রম চলমান আছে। এরপরও যদি কিশোর-কিশোরীরা কিছু বলতে না পারে, তাহলে আমার কিছু করার নেই।’
