মুক্তাঙ্গন এখন বিস্মৃত

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৩, ০৩:২৫ পিএম

একপাশে বিশাল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র। দিনরাত বিকট দুর্গন্ধ ছড়ায় আশপাশে। কয়েক বছর আগে পার্ক ও খেলার মাঠ নির্মাণের উন্নয়ন প্রকল্প কাজের উদ্যোগ নেওয়া হলেও ছয় মাস ধরে কাজ বন্ধ। সকাল থেকে মধ্যরাত অবদি মাদকসেবী ও ভবঘুরেদের আড্ডা। নোংরা ও স্যাঁতসেঁতে ফুটপাত ঘিরে মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড। এক সময় রাজনৈতিক আন্দোলন ও মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ের অন্যতম অনুষঙ্গ মুক্তাঙ্গনের এখন এমনই পরিবেশ। এটি এখন কেবলই বিস্মৃত। আশির দশক থেকে পরবর্তী প্রায় তিন দশক প্রায় প্রতিদিন এই স্থানটি মিছিল, স্লোগান আর ভাষণে মুহুর্মুহু কেঁপে উঠত। কিন্তু সেই মুক্তাঙ্গন এখন আর নেই।

দেশের ইতিহাস আর ঐতিহ্যের স্মৃতিবিজড়িত এই স্থানটিকে রক্ষা কিংবা ঐতিহ্য ও ঐতিহাসিক হিসেবে রক্ষণাবেক্ষণে কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি সরকারিভাবে। পুরানা পল্টন থেকে জিরো পয়েন্ট যেতে এবং জিরো পয়েন্ট থেকে পুরানা পল্টনে যাওয়া আসা করা কৌতূহলী মানুষেরা এখনো উৎসুক হয়ে মুক্তাঙ্গনকে খুঁজে ফেরেন। কিন্তু তাদের হতাশই হতে হয় এমন পরিস্থিতি দেখে। হতাশা ব্যক্ত করেন একসময় মুক্তাঙ্গনে পদচারণা করা রাজনীতিবিদেরাও। মুক্তাঙ্গন নামটি থাকলেও এর অস্তিত্ব আর এখন নেই বললেই চলে। এ নিয়ে আক্ষেপ রয়েছে রাজনীতিক ও সাধারণ মানুষের।

বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, মুক্তিযুদ্ধের পর ওই দশকের শেষ দিকে রাজনৈতিক কর্মসূচির জন্য মুক্তাঙ্গনকে নির্ধারণ করে দেয় সরকার। এরপর থেকে জিরো পয়েন্ট, গুলিস্তান, বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউ, পুরানা পল্টনের আশপাশের এলাকা পরিচিত হয়ে উঠে এই একটি এলাকা ঘিরে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে সকল রাজনৈতিক ও অধিকার আদায়ের সংগ্রামের কেন্দ্র হয়ে উঠে মুক্তাঙ্গন। যা বহাল ছিল ২০১০ সাল পর্যন্ত।

প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন হতাশকণ্ঠে দেশ রূপান্তরকে বলেন, এই জায়গাটিকে নির্ধারণই করা হয়েছিল সভা সমাবেশের জন্য। এখানে আমার মতো আরও অনেকের রাজনৈতিক জীবনের বহু স্মৃতি আছে। বহু রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত হয়েছে এখান থেকে। এটা খুবই দুঃখজনক যে এই জায়গাটা কখনো মাইক্রোবাস স্ট্যান্ড হয়েছে। এখন এখানে ময়লার ভাগাড় করা হয়েছে। উন্মুক্ত জায়গা রাখতে সিটি করপোরেশনের যে কথা সেটা বিবেচনায় নিলে এটি ঠিক হয়নি। অন্তত ঐতিহাসিক বিবেচনাতেও এই স্থানটিকে সংরক্ষণ করাই ছিল সমীচীন।

তিনি বলেন, ঢাকায় উন্মুক্ত স্থান এমনিতেই কমে গেছে। একসময় পল্টনে সমাবেশ হতো। মুক্তাঙ্গনও ছিল, সেটিও এখন নেই। ঢাকায় এখন রাস্তায় কর্মসূচি পালন ছাড়া আর কোনো জায়গা নেই।

দীর্ঘ দিন অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকার পর তিন বছর আগে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) ১৩ নম্বর ওয়ার্ডের আওতায় মুক্তাঙ্গন পার্ক ও খেলার মাঠের উন্নয়নকাজ শুরুর উদ্যোগ নেয়। তবে, কাজ শুরু হলেও গত ছয় মাস ধরে তা বন্ধ রয়েছে। শিশুদের জন্য বিভিন্ন রাইড স্থাপন ও খেলার মাঠ তৈরিরও কথা শোনা গেলেও তা থমকে আছে। প্রকল্পের অগ্রগতির সার্বিক বিষয়ে জানতে ডিএসসিসির জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছেরের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা রাসেল সাবরিনের কাছে জানতে চাইলে তিনি প্রধান প্রকৌশলীর সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন। ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী আশিকুর রহমানের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাননি।

গত শনিবার দুপুরে মুক্তাঙ্গনের ভেতর ও আশপাশ সরেজমিনে ঘুরে দেখা গেছে, সামনের ফুটপাতের পুরোটাই ভ্রাম্যমাণ দোকান, মাইক্রোবাস ও কার স্ট্যান্ডে দখলে। ফুটপাত দখল হয়ে যাওয়ায় পুরানা পল্টন থেকে হেঁটে জিপিও মোড় পর্যন্ত যেতে হয় মূল সড়ক দিয়ে। স্বস্তি নেই তাতেও। ময়লা, বর্জ্য আর প্রস্রাবের দুর্গন্ধে টেকা দায়। ফুটপাত ঘেঁষে টিনের বেড়া দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। ভেতরে গিয়ে দেখা যায় মাদক সেবনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন মাদকসেবীরা। প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় এখানে সেখানে পড়ে রয়েছে ইট, বালি, সুরকি পাথরের স্তূপ। এখানে সেখানে গজিয়ে উঠেছে হাঁটু সমান ঘাস। ভর দুপুরেও সেখানে অনেকটা গা ছমছমে পরিবেশ। বাইরে আশপাশটা প্রায় পুরোটা মাইক্রো স্ট্যান্ডের দখলে। মুক্তাঙ্গনের বাম দিকে বিশাল ভবনে ‘অন্তর্বর্তীকালীন বর্জ্য স্থানান্তর কেন্দ্র’। এখানে আবর্জনা ও বর্জ্য রাখা শুরু হয় দুই বছর আগে শুরু হয়। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে বর্জ্য সংগ্রহের পর রাতে সেগুলো নিয়ে যাওয়া হয় মাতুয়াইলে। দিনভর বর্জ্য ও ময়লা পানির দুর্গন্ধ আশপাশে। মুক্তাঙ্গনের পাশ দিয়ে গেলে অনেকেই অস্বস্তিবোধ করেন। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কেন্দ্রের পাশেই পার্ক ও শিশুদের খেলার মাঠ নির্মাণ নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে সচেতন মহলের।

স্থানীয় কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সন্ধ্যা হলেই এই এলাকাটি ছিনতাইকারী ও মাদকসেবীদের কারণে অনেকটা অপরাধপ্রবণ এলাকা হয়ে উঠে। একসময় মুক্তাঙ্গনের ভেতরে রাখা হতো মাইক্রোবাস ও কার। তবে, ডিএসসিসির উন্নয়নমূলক কাজের তাগিদে সেটিকে উচ্ছেদ করা হলেও ফুটপাতের পাশে সাইনবোর্ডে ‘ঢাকা মুক্তাঙ্গন মাইক্রোবাস কার মালিক সমিতি’র ব্যানারে এখনো ভাড়ায় চালিত মাইক্রোবাসের ব্যবসা চলছে। সমিতির সাধারণ সম্পাদক দাবি করে আব্দুস সাত্তার দেশ রূপান্তরকে বলেন, একসময় এটি খালি ছিল। তারা গাড়ি রাখতেন। আশপাশে আর জায়গা নেই। প্রকল্পের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকে বাইরে গাড়ি ভাড়ার ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন।

ফুটপাত দিয়ে জায়গা না পেয়ে মূল সড়ক দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন পঞ্চাশোর্ধ্ব এক ব্যক্তি। একটু পর পর বাম দিকে উঁকি দিচ্ছেন। মো. আশরাফুল ইসলাম নামে ওই ব্যক্তি জানান, মাগুরার একটি মাধ্যমিক স্কুলে শিক্ষকতা করেন তিনি। নানা কাজে মাঝে মধ্যে ঢাকায় আসেন। মুক্তাঙ্গনের সামনে দিয়ে যাওয়া আসা করতে হয়।

তিনি বলেন, অনেক দিন ধরেই ঢাকায় আসি। এই মুক্তাঙ্গনকে চিনতে কষ্ট হয়। কিন্তু এখন হতাশ হই। আমাদের আশা ছিল নতুন প্রজন্মের জন্য ঐতিহাসিক এই জায়গাটিকে সংরক্ষণ করা। কিন্তু এখন মনে হয় এটি স্মৃতি হয়েই থাকবে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত