বিভীষিকার মণিপুর এরপর কী?

আপডেট : ২৪ জুলাই ২০২৩, ০৯:২৭ পিএম

গত ৪ মে মণিপুরে নারীদের বস্ত্রহীন করে ঘোরানোর মতো বর্বরতা এবং নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ম্যাকডাফের কথাগুলো বারবার প্রতিধ্বনিত হচ্ছে ‘হে বিভীষিকা, বিভীষিকা, বিভীষিকা! না হৃদয় পারে তোমায় ধারণ করতে, না জিহ্বা পারে নাম নিতে!’ এতক্ষণে মণিপুরের পাহাড় থেকে আরও কঙ্কাল গড়িয়ে পড়েছে। প্রায় হাজারখানেক জনতার নেতৃত্বে থাকা বর্বররা তাদের ঘৃণ্য পাপের মূল্য একদিন নিশ্চয় দেবে আশা করি। কিন্তু পরিহাস, যখন সম্ভব ছিল কর্র্তৃপক্ষ তখন তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এখন কুম্ভীরাশ্রু ফেলছে এবং অহেতুক স্থূল আলাপ ও নোংরামি ছড়াচ্ছে। তারা কেবল নিষ্ক্রিয়তার জন্য দোষী নয়, নেপথ্যের উসকে দেওয়ার ভয়াবহতার জন্যও দায়ী। সুতরাং অপরাধীও বটে। কিন্তু তাদের কাঠগড়ায় দাঁড় করাবে কে?

এটা বিশ্বাস করা অসম্ভব যে, গত সপ্তাহে ভিডিওটি সামনে আসার আগ পর্যন্ত মণিপুর রাজ্যের কর্র্তৃপক্ষের কেউ এই ভয়াবহতা সম্পর্কে জানত না। চিন্তা করুন, একটি সশস্ত্র গ্রুপ, প্রায় এক হাজার মানুষের একটি দল, রাজধানী ইম্ফল থেকে মাত্র ৩০ কিলোমিটার দূরে গ্রামের পর গ্রাম, বাড়িঘর কুঁড়ে-ছাউনি সব জ্বালিয়ে দিচ্ছে। অথচ শহর থেকে দূরত্ব হবে দিল্লির এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের চেয়েও কম। যে এলাকায় নারীদের ঘোরানো হয়েছিল এবং তাণ্ডব চালানো হয়েছিল সেটি একটি চেকপোস্ট থেকে মাত্র তিন কিলোমিটার দূরে। বলতে গেলে দিল্লির ‘সেন্ট্রাল ভিস্তা’র এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তের চেয়ে কম দূরত্বে। সরকারি লোকজন নীরব এবং নিষ্ক্রিয় থাকা ছাড়া কী করেছিল? গোয়েন্দারা কী করছিল? নিরো’র মতো বাঁশি বাজাচ্ছিল?

এখন জানা গেছে, নিগৃহীত নারী-পুরুষ পুলিশের সঙ্গেই ছিল এবং পুলিশের হাত থেকে বর্বররা তাদের নিয়ে যায়। তারা ছিল ২০২০ সালে স্বীকৃত ভারতের সেরা পুলিশ স্টেশন থেকে দুই কিলোমিটার অদূরে। আমরা কি বিশ্বাস করব যে, পুলিশও জানত না কী ঘটছে? যদি তারা জেনে থাকে, তবে কী করেছে তারা? তারা কি ‘ঊর্ধ্বতনদের’ খবর দিয়েছে? যদি হ্যাঁ হয়, তাহলে ‘ঊর্ধ্বতনরা’ কী করেছে? আর যদি না হয়, তাহলে কেন দেয়নি? নাকি পুলিশ জড়িত? পুলিশ কি সমান দোষী নয়? আমরা কখনই জানব না।

ঘটনার দিন সরকারি নির্দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। অপ্রীতিকর কিছু যদি না ঘটে থাকে তাহলে ইন্টারনেট বন্ধ করা হলো কেন? বোঝা গেল, সরকার ভয়াবহতা আঁচ করতে পেরেছিল এবং লৌহপ্রাচীর স্থাপন করতে চেয়েছিল। দিনের বেলা কী ঘটেছে যদি জানা যেত এবং বেআইনিভাবে নেটসংযোগ বন্ধ না থাকত, তাহলে ভিডিওটি নিশ্চয় সেদিন দেখা হয়ে যেত এবং কর্র্তৃপক্ষকে ভূমিকা নিতে বাধ্য করা যেত। নীরবতার পরিণামটি চিন্তা করুন মণিপুরে বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে ফেনিয়ে ওঠা পরিস্থিতি গৃহযুদ্ধের আবহ তৈরি করেছে; যার ফলে প্রায় ১৫০ জন নিহত, ৩০০ জনেরও বেশি আহত এবং ৫০ হাজারেরও বেশি গৃহহীন হয়ে পড়েছে। আসলে নিন্দার কোনো ভাষা নেই, বেদনা ও যন্ত্রণা বোঝানোর কোনো শব্দ নেই।

নীরবতার ষড়যন্ত্র চলতে থাকে। একদিকে ভিডিও বার্তাবাহককে গুলি করার চেষ্টা করা হয়, টুইটারকে আপত্তিকর ভিডিওটি নামিয়ে নিতে বলা হয় এবং আমরা জানি তারা নাকচ করার পর কী হবে। বরখা দত্ত নামে একজন পুরস্কারপ্রাপ্ত সাংবাদিককেও কর্র্তৃপক্ষ বেশ আপত্তিকর আদেশ দেয়। এই ভয়াবহ ঘটনার প্রায় দুই সপ্তাহ পর, ১৮ মে কাংকোকপি জেলার পুলিশকে কেউ একজন আনুষ্ঠানিকভাবে ঘটনাটি জানাতে সাহস করে। পুলিশ অভিযোগের রেকর্ড রাখে ব্যস, আর কিছুই না।

অবশেষে, ১৮ মে নথিভুক্ত অভিযোগসহ এফআইআরটি ২১ জুন এক মাসেরও বেশি সময় পরে থৌবাল জেলার এখতিয়ারি থানায় পৌঁছায়। যাক নথিভুক্ত হয়েছে তো, এইটুকু করুণার জন্য ঈশ্বরকে ধন্যবাদ। আপনার কি মনে আছে চ্যাম্পিয়ন কুস্তিগীরদের এফআইআর হিসেবে অভিযোগ রেকর্ড করার জন্য সুপ্রিম কোর্টের দুয়ারে কড়া নাড়তে হয়েছিল?

আইন বলে না যে, কোনো এফআইআর রেকর্ড হলেই পুলিশ রিপোর্টটি তদন্ত করতে বাধ্য। মানে রিপোর্ট হলেই নির্ভেজাল এবং নিরপেক্ষভাবে তদন্ত শুরু হয়ে যাচ্ছে না। সুতরাং, এফআইআর রেকর্ড হলো বটে, কিন্তু পুলিশ যেহেতু আইনত তদন্তে বাধ্য নয়, তাই থৌবাল জেলা-থানায় কেউ তদন্ত করার প্রয়োজনও মনে করেনি। ফলে পরিস্থিতি আপন গতিতে চলতে থাকে এবং প্রায় এক মাস পরে, ভয়াবহতার একটি ভিডিও প্রকাশ না হওয়া পর্যন্ত এফআইআরটি নিষ্ক্রিয় পড়ে থাকে।

পুলিশ এখন টারজানের মতো অ্যাকশনে নেমেছে এবং মুষ্টিমেয় অসভ্যদের গ্রেপ্তার করেছে। হয়তো পুলিশের প্রতি আস্থা না থাকায় অন্য নারীরা আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে মূল অভিযুক্তের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে ‘বুলডোজার বিচার’ চলে, তা থেকে তারা অনুপ্রাণিত হয়ে থাকতে পারে। যদিও সেই নারীদের সঙ্গে বুলডোজার ছিল না। হতে পারে জাতীয় নিরাপত্তার কারণে বা সন্ত্রাসী হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পর তাদেরও গ্রেপ্তার করা হবে। সবকিছুই সম্ভব।

এরপর কী? সত্যাসত্য জানা অসম্ভব। সত্য কখনই বেরিয়ে আসবে না। দীক্ষা দ্বিবেদী নামের ভারতের সুপ্রিম কোর্টের একজন প্র্যাকটিসিং আইনজীবী মণিপুরে হত্যাকাণ্ড সম্পর্কে তথ্য জানতে চেয়েছিলেন। অনুমান করেন তো তারপর কী হয়েছে? তাকে গ্রেপ্তারের হুমকি দেওয়া হয়েছে এবং গ্রেপ্তার থামানোর আদেশ দিতে তাকে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করতে হয়েছে। আর এদিকে গ্রেপ্তারকৃত আসামিরা কত তাড়াতাড়ি জামিন পাবেন তা কল্পনাও করতে পারবেন না। বিলকিস বানো মামলার ধর্ষক ও খুনিদের কথা মনে আছে?

লেখক : ভারতের সুপ্রিম কোর্টের সাবেক বিচারপতি।

দা ওয়্যার ডট ইন থেকে ভাষান্তর মনযূরুল হক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত