প্রাকৃতিক দুর্যোগ এবং জলবায়ু পরিবর্তনসহ মানবসৃষ্ট নানা কারণে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে শ্বাসমূলীয় বন সুন্দরবন। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় এই ম্যানগ্রোভ বা বাদাবন সিডর, আইলা বা আম্পানের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের হাত থেকে দেশের উপকূলীয় অঞ্চলকে বাঁচিয়েছে মমতাময়ী মায়ের মতো। লাখো মানুষের প্রতিদিনের জীবন বাঁচে এই বাদাবনের কৃপায়। কিন্তু দিন যত যাচ্ছে, ততই বেহাল হচ্ছে বনের অবস্থা। বন ঘিরে কথিত নানা উন্নয়ন প্রকল্প, বনের গাছ ও বন্য প্রাণীর চোরা কারবার আর জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাতে বিপর্যস্ত হচ্ছে বাংলাদেশের বর্ম খ্যাত এই বাদাবন। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সুন্দরবনের সুরক্ষায় ইউনেসকোর সুপারিশ অনুযায়ী কৌশলগত পরিবেশ সমীক্ষা (এসইএ) প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন না করায় অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে। এ অবস্থায় সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটি সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য রক্ষার স্বার্থেই বনটিকে ‘ঝুঁকিপূর্ণ বিশ্ব ঐতিহ্যের’ তালিকায় রাখার দাবি জানিয়ে ইউনেসকোকে চিঠিও দিয়েছে।
বাংলাদেশের মোট বনভূমির ৪৭ ভাগই সুন্দরবন। খুলনা, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার অংশবিশেষ নিয়ে এই ম্যানগ্রোভ বন গড়ে উঠেছে। সুন্দরবনে ৩৫টি বিশেষ প্রজাতির গাছ আছে। যারা বায়ুমন্ডল থেকে প্রচুর পরিমাণে কার্বন ডাই-অক্সাইড টেনে নেয়। এতে পরিবেশের দূষণ কমে। কেওড়াগাছ সর্বাধিক কার্বন ডাই-অক্সাইড তার শিকড়, কা-, ডালপালা ও পাতায় আটকে রাখতে পারে। এক হেক্টর কেওড়া বন বছরে ১৭০ টন পর্যন্ত কার্বন ডাই-অক্সাইড আটকে রাখতে সক্ষম। বাইনের ক্ষেত্রে তা ১১৫ টন, গেওয়ায় ২৩ টন।
বাংলাদেশের অক্সিজেনভান্ডার বা ফুসফুস হিসেবে অপরিসীম ভূমিকার পাশাপাশি লাখ লাখ মানুষের জীবিকারও আধার সুন্দরবন। এই বনের মাছ, মধু, গোলপাতা প্রভৃতি আহরণ করে জীবন চলছে অনেক মানুষের। সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনশিল্পে অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান হচ্ছে। সরকারও এই বন থেকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করছে।
অথচ এই সুন্দরবনকে হত্যার প্রায় সব আয়োজনই ইতিমধ্যে করা হয়েছে। সুন্দরবনের চারপাশের ১০ কিলোমিটার প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন (ইসিএ) এলাকায়ই ১৮৬টি শিল্প ও প্রকল্পকে পরিবেশের প্রাথমিক (অবস্থানগত) ও চূড়ান্ত ছাড়পত্র দেওয়া হয়েছে। শুঁটকিপল্লীর নামে উজাড় হয়েছে বনের বিস্তর এলাকা, পর্যটন বাড়িয়েছে দূষণ। এর পাশাপাশি ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণেও সুন্দরবন এখন বেশ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। পদ্মার শাখা নদী গড়াই, মাথাভাঙ্গা, আড়িয়াল খাঁ, মধুমতী, কপোতাক্ষ, চিত্রা, ইছামতী, ভৈরব প্রভৃতি নদী দিয়ে আসা মিষ্টি পানি সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হতো। তবে ফারাক্কায় বাঁধ চালু হওয়ার পর এখন অধিকাংশ শাখা নদী ভরাট হয়ে মিষ্টি পানির প্রবাহ সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে গেছে। মিষ্টি পানির অভাবে বনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হয়ে সুন্দরীসহ অনেক গাছ বিলীনের ঝুঁকিতে পড়েছে।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, ২০১০ সালে সুন্দরবনের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদের প্রতি লিটার পানিতে তেলের পরিমাণ ছিল সর্বোচ্চ ১০ দশমিক ৮ মিলিগ্রাম। আর এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৬৮ মিলিগ্রামে; যেখানে স্বাভাবিক মাত্রা হলো ১০ মিলিগ্রাম। তা ছাড়া পানিতে তেলের পরিমাণ বেড়ে যাওয়ায় ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বনের জলজ প্রাণী।
আরেক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৭৫-২০১০ সুন্দরবনসংলগ্ন কৃষি কার্যক্রম প্রায় ১৭ হাজার ১৭৯ হেক্টর বন ধ্বংস করেছে। চিংড়ি চাষ ধ্বংস করেছে আরও ৭ হাজার ৫৫৪ হেক্টর। কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র, অন্যান্য শিল্প প্রকল্প, সুন্দরবনসংলগ্ন ১৫০টিরও বেশি সক্রিয় কারখানা বিশ্বের বৃহত্তম এই ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চলকে মারাত্মক বিপদের মধ্যে ফেলে দিয়েছে।
উন্নয়ন অন্বেষণের গবেষণা অনুযায়ী, খুলনার কয়রা অঞ্চলের নির্দিষ্ট এলাকায় দুই দশকে (২০০০-২০) বনের ঘনত্ব কমেছে প্রায় অর্ধেক। প্রথম দশকে (২০০০-১০) ব্যাপক হারে ঘন বন উজাড় হয়ে কমতে থাকে বনের বিস্তার। এ সময়ে পতিত জমি বৃদ্ধির হার তুলনামূলক কম থাকলেও পরবর্তী দশকে (২০১০-২০) প্রায় দ্বিগুণ হারে খালি বা পতিত জমির পরিমাণ বেড়েছে। এসব কারণে সুন্দরবনের ৪০টির বেশি প্রজাতির উভচর, সরীসৃপ, পাখি ও স্তন্যপায়ী প্রাণীকে মহা বিপন্ন বা সংকটাপন্ন প্রাণীর তালিকায় রেখেছে আন্তর্জাতিক প্রকৃতি ও প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ সংঘ (আইইউসিএন)।
হাইকোর্ট সুন্দরবনের চারপাশে ১০ কিলোমিটার এলাকার মধ্যে নতুন কোনো শিল্পকারখানা স্থাপন না করা, স্থাপিত শিল্পকারখানাসহ অন্যান্য স্থাপনা সরিয়ে নেওয়ার নির্দেশনা থাকলেও তা মানা হচ্ছে না। উল্টো এক দশকে আরও বেড়েছে। এসব শিল্পকারখানাকে আইনগত বৈধতা দেওয়ার লক্ষ্যে নানা রকম আইনি কাঠামোতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে। লাল ক্যাটাগরির শিল্পগুলো সবুজ ক্যাটাগরিতে নেওয়া হচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে সংকটাপন্ন উপকূল বা ম্যানগ্রোভকে সঠিকভাবে রক্ষা না করে বরং সংকটকে আরও ঘনীভূত করছে এবং আইনিভাবে এ ধরনের শিল্পায়নকে বৈধতা দেওয়ার চেষ্টা চলছে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনজীবী সমিতির (বেলা) নির্বাহী প্রধান সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পরিবেশের সব ক্ষেত্রে সরকারি পর্যায়ে সংবেদনশীলতা কমে গেছে। বনের প্রতি সংবেদনশীলতা আমার ধারণা একেবারেই নাই। যেখানে ভরতে সুন্দরবনের ২০ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো শিল্পকারখানা করে না, সেখানে ভারতের অর্থায়নে আমাদের দেশে সুন্দরবনের ১৪ কিলোমিটারের মধ্যেই হচ্ছে। সুন্দরবনের ভেতরে কয়লা আনা-নেওয়ায় জাহাজডুবির ঘটনা ঘটছে। এসব বিষয়ে আমরাও বলেছি। আন্তর্জাতিক বিশেষজ্ঞ দলও তাদের উদ্বেগের কথা জানিয়েছে। এগুলো বাদে চট্টগ্রাম, কক্সবাজারের দিকে যাই তাহলে দেখা যাবে, চকরিয়ায় ২০ হাজার একর ম্যানগ্রোভ বন আশির দশকে এডিবির পেসক্রিপশনে চিংড়ি চাষ করা হয়েছে। কথায় কথায় সীতাকুণ্ডের বন উজাড় করে শিপ ব্রেকিং ইয়ার্ড স্থাপন করা হচ্ছে। আমলাদের প্রশিক্ষণের বনভূমি লাগবে। ফুটবল ফেডারেশনের জন্য বন উজাড় করতে হবে।’
তিনি বলেন, ক্যাবিনেট একটা আইন করে দিয়েছিল সরকারপ্রধানের অনুমোধন ছাড়া বন ভিন্ন কারণে ব্যবহার করা যাবে না। দেখা যাচ্ছে সেখানেও কৌশল নেওয়া হচ্ছে। সুতরাং বনের ক্ষেত্রে সংবেদনশীলতা একেবারেই কমে গেছে। এমন পর্যায়ে কমেছে হাইকোর্টের আদেশকেও কৌশলে এড়িয়ে লাল তালিকায় থাকা শিল্প প্রতিষ্ঠান কলমের এক খোঁচায় সবুজ হয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া পরিবেশ সংরক্ষণ আইনে যেসব নিষেথাজ্ঞা আছে, সেটাও এড়িয়ে যাওয়া হচ্ছে।
স্টামফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ডিন ও পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমেদ কামরুজ্জামান মজুমদার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের দেশে ম্যানগ্রোভ কমে যাওয়া বা দূষণ হওয়ার একাধিক কারণ রয়েছে। এর মধ্যে অন্যতম কারণ হচ্ছে সুন্দরবনের বাফার জোনের ভেতর বিভিন্ন ধরনের কলকারখানার অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে। কারখানার বিষাক্ত পানি বনের পরিবেশ নষ্ট করছে। এ ছাড়া এসব প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন ধরনের কাঁচামাল যাওয়ার সময় দুর্ঘটনা ঘটছে। এসব দুর্ঘটনার ফলে জ্বালানি তেল কয়লা নদীতে ছড়িয়ে পড়ছে। এ ছাড়া মধু ও মাছ আহরণের নামেও ম্যানগ্রোভ ধ্বংস করা হচ্ছে। এর বাইরে ইদানীং প্লাস্টিক দূষণ হচ্ছে। এসব কারণে মূলত আমাদের এই ম্যানগ্রোভ বন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। সুন্দরবনের আশপাশে সব ধরনের শিল্পায়ন বন্ধ করতে হবে।
গত এপ্রিল মাসে বিশ্ব ঐতিহ্য কেন্দ্রের পরিচালক ও আইইউসিএ বিশ্ব ঐতিহ্য কর্মসূচির পরিচালক বরাবর সংস্থাটির দেওয়া চিঠিতে বলা হয়, শিল্পের ক্রমবর্ধমান বিকাশ এবং জাহাজ চলাচল বৃদ্ধির ফলে এই প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এরই প্রেক্ষাপটে সুন্দরবনের সুরক্ষা নিশ্চিত করার জন্য পর্যাপ্ত উপকরণ সরবরাহে এসইএ ব্যর্থ হয়েছে। তাই ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ কনভেনশনের অপারেশনাল গাইডলাইনের ১৮০ অনুচ্ছেদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাংলাদেশের সুন্দরবনকে ঝুঁকিতে থাকা বিশ্ব ঐতিহ্যের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার জন্য আইইউসিএন এবং ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সেন্টারের প্রতি আমাদের অনুরোধ।
সুন্দরবন রক্ষা জাতীয় কমিটির সদস্য ও ওয়াটারকিপার্স বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতিসংঘ ২০১৪ সালে কৌশলগত সমীক্ষার কথা বলেছে। সেটা বাংলাদেশ সরকার শোনেনি। ২০১৭ সালে আবার বলেছে। ২০১৮ সালে সরকার উদ্যেগ নিয়েছে । তারা যে প্ল্যান তৈরি করেছে, সেটার বৈজ্ঞানিক গ্রহণযোগ্যতা নেই। সুন্দরবনের কী ক্ষতি হবে, সেটা মূল্যায়ন করতে গিয়ে সুন্দরবনের ইকোলজিক্যাল ও ক্রিটিক্যাল এড়িয়া বাদ দিয়ে দেবেন, তাহলে তো এটার বিজ্ঞানভিত্তিক বৈধতা থাকে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দেশে উপকূলজুড়ে ম্যানগ্রোভ ছিল কক্সবাজার থেকে শুরু করে সাতক্ষীরা পর্যন্ত। কিন্তু সেই ম্যানগ্রোভ নেই, কমতে কমতে শুধু সুন্দরবনে এসে ঠেকেছে। এখন সুন্দরবনের চারপাশে যেভাবে শিল্পায়ন হচ্ছে এবং মিঠাপানির প্রবাহ যেভাবে কমে যাচ্ছে তাতে সুন্দরবন ইতিমধ্যে বিপন্ন ধারায় পড়ে গেছে। কাজেই সুন্দরবনকে বিপন্ন হিসেবে তার যে বাস্তব অবস্থান সেটাকে গ্রহণ না করি, তাহলে এটা রক্ষার যে উদ্যোগ এটা যথাযথ হবে না।’
পৃথিবীতে একসময় ১ লাখ ৮১ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকাজুড়ে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ছিল। কিন্তু অতিসম্প্রতি এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, এ বনাঞ্চলের আয়তন ১ লাখ ৫০ হাজার বর্গকিলোমিটারের নিচে নেমে এসেছে। ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল থেকে অতিরিক্ত কাঠ ও মাছ আহরণের ফলে এবং উপকূলীয় ভূমিকে বিকল্প ব্যবহারযোগ্য ভূমি হিসেবে ব্যবহারের ফলে এ বনাঞ্চল হুমকির সম্মুখীন। পরিবেশবাদীরা অবশ্য অনেকে আগে থেকেই এ বিষয়ে প্রতিবাদ করে আসছেন। ১৯৯৮ সালের ২৬ জুলাই ইকুয়েডরে ম্যানগ্রোভ বন কেটে চিংড়ি চাষ করার প্রতিবাদে সমাবেশ করা হয়েছিল, সেখানেই একজন অংশগ্রহণকারীর মৃত্যু হয়। তার স্মরণে দিনটিকে আন্তর্জাতিক ম্যানগ্রোভ দিবস হিসেবে বিশ্বে পালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশেও দিবসটি পালন করা হচ্ছে। কিন্তু সর্বোবৃহৎ এই বাদাবনের বেদনা সত্যিকার অর্থে কোনো বোধ জাগাচ্ছে না কর্র্তৃপক্ষের।
