শতাব্দীপ্রাচীন ছিন্নমূল বাঙালিদের সংগ্রামের একটা ভিত্তি ইস্ট বেঙ্গল। এপার বাংলা থেকে ওপার বাংলায় পাড়ি দিয়ে বঞ্চিত হওয়া সেই সব মানুষ একসময় লাল-হলুদ ক্লাবকে আঁকড়ে ধরেই লড়াই করতে শিখেছিলেন। সেই সংগ্রাম আজ এক বিশাল আবেগে রূপান্তরিত। পায়ে পায়ে আজ ১০৪ বছর পূর্ণ করল কলকাতার ঐতিহ্যবাহী এই ফুটবল ক্লাব।
নব্বইয়ের দশকে এই ক্লাব লিগ শিল্ডে মুখ থুবড়ে পড়েছিল। টিকে থাকার লড়াই থেকেও ছিটকে যাচ্ছিল। আর সেই সময় তাদের নজর যায় ঢাকার ক্লাব আবাহনীর দিকে। শেখ মোহাম্মদ আসলামকে তারা প্রস্তাব দেয়। কিন্তু আসলাম একা যেতে রাজি হননি। সঙ্গে নিয়ে যান মোনেম মুন্না, গোলাম গাউস ও রিজভি করিম রুমীকে। ময়দানে সেদিন চার ঢাকাই ফুটবলারের পা পড়তেই বদলে যায় ইস্ট বেঙ্গলের ভাগ্য। এই ইস্ট বেঙ্গল মাঠেই ফুল ফোটাতেন তারা। তাদের নাম ফিরত সমর্থকদের মুখে মুখে। গ্যালারিতে জয়ধ্বনি আর ম্যাচ জেতার পর উচ্ছ্বাস ছিল নিত্যদিনের বিষয়।
তিন দশক আগে বাংলাদেশি ফুটবলারদের সেই অবদানের কথা ভোলেনি ইস্ট বেঙ্গল। তাই ১০৪তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে তাদের আত্মজন প্রীতি ও স্মৃতি সম্মাননা প্রদান করেছে ক্লাবটি। প্রয়াত মোনেম মুন্নাকে স্মৃতি সম্মাননা ও জীবিত ফুটবলারদের দেওয়া হয় প্রীতি সম্মাননা। ক্লাবটির হয়ে মাঠ মাতানো চার ফুটবলারের পাশাপাশি সম্মাননা পেয়েছেন আবাহনীর প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হারুনুর রশীদ ও বাংলাদেশের সংগীতশিল্পী মেহেরীন মাহমুদ।
মঙ্গলবার ক্ষুদিরাম অনুশীলন কেন্দ্রে প্রতিষ্ঠা দিবসের অনুষ্ঠানে তাদের এই সম্মাননা দেয় ইস্ট বেঙ্গল। এ সময় উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের ক্রীড়ামন্ত্রী অরুপ বিশ^াস ও কলকাতার মেয়র এবং রাজ্য সরকারের পুরমন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম, ক্লাব সভাপতি ড. প্রণব দাশগুপ্ত ও সাধারণ সম্পাদক কল্যাণ মজুমদার। এ সময় আবাহনীর পক্ষ থেকেও ইস্ট বেঙ্গলকে প্রীতি সম্মাননা জানানো হয়।
আত্মজন প্রীতি সম্মান গ্রহণ করতে শেখ মোহাম্মদ আসলাম, গোলাম গাউস ও হারুনুর রশীদের পা কলকাতায় পড়লেও কানাডাপ্রবাসী রিজভী করিম রুমী সম্মাননা নিতে আসতে পারেননি। ৩০ বছর আগে যে মাঠে তাদের নামে জয়ধ্বনি দিত ইস্ট বেঙ্গলের সমর্থকরা, সেই মাঠেই ফিরলেন শেখ মোহাম্মদ আসলাম এবং গোলাম মোহাম্মদ গাউস। চেনা ক্লাব, চেনা মাঠে ফিরে স্মৃতির ভিড়ে যেন থমকে গেলেন আবাহনী ক্রীড়াচক্র থেকে ইস্ট বেঙ্গলে আসা দুই সাবেক ফুটবলার।
আসলাম বলেন, ‘এখানে এসে কত কথা মনে পড়ছে। যখন প্রথম প্রস্তাব দেওয়া হয়, আমি একা আসতে রাজি ছিলাম না। বলেছিলাম, গাউস আর মুন্নাকে আনতে হবে। আজ মুন্না, পল্টুদা (দাস), কৃশানুকে (দে) খুব মনে পড়ছে। শঙ্কর মালি খুব ভালোবাসতেন আমাদের সবাইকে। ম্যাচের আগে পুজো করে সবার কপালে টিপ পরিয়ে দিতেন, তারপর আমরা মাঠে যেতাম। আমি দুই বাংলায় কিংবা ইস্ট বেঙ্গল ও আবাহনীর মধ্যে কোনো তফাত খুঁজে পাই না।’
আসলামের কথায় সম্মতি জানালেন গাউসও। ইস্ট বেঙ্গলের হয়ে খেলায় ব্যস্ত থাকা আসলাম তার মেয়ের মুখ দেখেছিলেন ২১ দিন পর।
ঢাকার মতো কলকাতায়ও মোনেম মুন্নার জনপ্রিয়তা ছিল আকাশছোঁয়া। কিডনিজনিত রোগে ২০০৫ সালে মারা যান কিংবদন্তি এই ডিফেন্ডার। তাই তার হয়ে ইস্ট বেঙ্গল ক্লাবের দেওয়া আত্মজন স্মৃতি সম্মান গ্রহণ করবেন মুন্নার স্ত্রী সুরভী মোনেম। ক্লাব তাঁবুতে সুরভীর সঙ্গে ছিলেন ছেলে আজমান সালিদ। সুরভী বলেন, ‘মুন্না কখনো খেলা নিয়ে বাড়িতে কথা বলত না। কিন্তু ওর চলে যাওয়ার এত বছর পর বুঝি ও কত বড় ফুটবলার ছিল। এখনো ওকে সবাই কত সম্মান করে, ভালোবাসে। এটা আমাদের কাছে বড় পাওনা।’
দীর্ঘদিন পর মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, ভাস্কর গঙ্গোপাধ্যায়, প্রশান্ত বন্দ্যোপাধ্যায়, অলোক মুখোপাধ্যায়, বিকাশ পাজিদের দেখে উচ্ছ্বসিত আসলাম-গাউস। ১৯৯১ সালে লিগ-শিল্ডসহ পাঁচ ট্রফি পেয়েছিল ইস্ট বেঙ্গল।
