১৩ মাসের শিশু মরিয়ম। বড় বোন ফাতেমা বৃষ্টিতে ভেজা স্যাঁতসেঁতে বারান্দার সিঁড়িতে মরিয়মের সঙ্গে খেলছে। খানিক আগেই মুষলধারে বৃষ্টি পড়েছে। ফাতেমার বয়স ৪ বছর। বৃষ্টিতে তাদের জামাকাপড় ভিজে গেছে, সেই সঙ্গে ভিজেছে তাদের খাবার হিসেবে সামনে থাকা কলা-পাউরুটিও। গতকাল শুক্রবার এমনই দৃশ্যের দেখা মেলে গাজীপুরের শ্রীপুর থানার সামনে।
শিশু দুটির মা নাসরিন আক্তার (৩৬) তিনদিন ধরে স্বামীর বাড়িতে ফেরার দাবিতে তাদের নিয়ে শ্রীপুর থানার পাশে ডাকবাংলোর বারান্দায় অবস্থান করছেন। মরিয়ম ও ফাতেমা হয়তো জানে না গতকাল রাতও তাদের খোলা আকাশের নিচে বৃষ্টি আর মশা উপেক্ষা করে থাকতে হতে পারে।
অবুঝ শিশু দুটিকে খেলা ফেলে একটু পর পর মায়ের কাছে খাবারের জন্য বায়না ধরতে দেখা যায়। অসহায় মা কলা আর রুটি দিয়ে তাদের শান্ত রাখার চেষ্টা করেন। আর অনাগত আগামীর দুশ্চিন্তাতে আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখের জল ফেলেন।
নাসরিনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, দুই শিশুসন্তানকে নিয়ে ৩ দিন ধরে স্বামীর বাড়িতে ফেরার দাবিতে অবস্থান করছেন। ইতিমধ্যে নিরাপত্তা চেয়ে থানায় লিখিত অভিযোগও করেছেন। তবে পুলিশ তাদের কোনো সহযোগিতা করছে না বলে অভিযোগ নাসরিনের।
তিনি শ্রীপুরের গোসিংগা ইউনিয়নের পেলাইদ গ্রামের কবির হোসেনের স্ত্রী। পাঁচ বছর হলো তাদের সংসার জীবন।
নাসরিন জানান, তিনি পূর্ণ নিরাপত্তায় স্বামীর বাড়িতে ফিরতে চান। সম্প্রতি ব্যবসায়িক কারণে পারিবারিক মামলায় ছোট্ট শিশু মরিয়মসহ জেল খাটেন। কারাগার থেকে বাড়ি ফিরে দেখেন তার স্বামী কবির দ্বিতীয় বিয়ে করেছেন। নাসরিন বাড়িতে ঢুকতে চাইলে কবির তাদের তাড়িয়ে দেন। এখন তিনি স্বামীর বাড়িতে ফিরতে চান। বাড়িতে ফিরিয়ে না নেওয়া পর্যন্ত তিনি দুই সন্তানসহ থানার পাশেই অবস্থান করবেন।
তিনি আরও জানান, গত ২০ জুলাই কারাগার থেকে ছাড়া পেয়েছেন। এর পর থেকে দুই সপ্তাহের বেশি সময় আশ্রয়হীন হয়ে আছেন। কারও কাছে বিচার পাচ্ছেন না। থানায় লিখিত অভিযোগ দিলেও পুলিশ কোনো সহযোগিতা করছে না।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে নাসরিনের স্বামী কবির হোসেন বলেন, ‘আমার প্রথম স্ত্রীকে (নাসরিন) আমাদের বাড়িতে রাখতে চাইলেও যেতে চাচ্ছে না। গ্রামে আমাদের বাড়ি আছে, মা-বাবা থাকেন। কিন্তু সে ওই পুরাতন বাড়িতে ফিরবে না। তাকে নিয়ে আমরা চরম বিব্রতকর পরিস্থিতিতে আছি।’
শ্রীপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা তরিকুল ইসলাম বলেন, ‘খবর পেয়ে গত বৃহস্পতিবার রাতে গিয়ে ওই নারীকে শিশুসহ নিরাপদ আশ্রয়ে থাকতে পরামর্শ দিয়েছি। এ সময় ব্যক্তিগত তহবিল থেকে তাকে অর্থ সাহায্য করা হয়েছে। তাকে আইনের আশ্রয় নিতে পরামর্শ দিয়েছি।’
শ্রীপুর মডেল থানার ওসি আবুল ফজল মোহাম্মদ নাসিম বলেন, ‘মানবিক চিন্তা করে পরিবারের কাছে পাঠানো হলেও তিনি (নাসরিন) থাকেননি। তিনি স্বামীর দ্বিতীয় স্ত্রী থাকা অবস্থায় সেখানে থাকতে রাজি না। সমস্যা নিরসনে তাকে পারিবারিক আদালতে মামলা করে আইনি সহায়তা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছি।’
