কর্মে বিভাময় যার জীবন

আপডেট : ০৫ আগস্ট ২০২৩, ১০:১৩ পিএম

নিজস্ব চিন্তা আর সূচিবদ্ধ জীবনের পরিধিতে কাজ করেন তিনি। সমালোচনাকে দূরে ঠেলে বিশ্বাসের দৃঢ়তা নিয়ে পথ চলেন। মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ এমনই এক ব্যক্তিত্ব। কওমি সনদের সরকারি স্বীকৃতিতে রেখেছেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। আর সন্ত্রাসবিরোধী লাখো আলেমের ফতোয়া তার জীবনের বাক পাল্টে দেওয়া ঘটনা। মহীরুহ এই আলেমকে নিয়ে লিখেছেন আবুল ফাতাহ কাসেমী

মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ ১৯৫০ সালে ৭ মার্চ কিশোরগঞ্জ জেলার তাড়াইল থানাধীন বেলংকা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা মাস্টার আব্দুর রশিদ (রহ.)-এর তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে কিশোরগঞ্জের প্রাচীন শিক্ষা-প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইমদাদিয়ার প্রতিষ্ঠাতা ও হজরত থানভি (রহ.)-এর খলিফা হজরত মাওলানা আতহার আলী (রহ.)-এর স্নেহধন্য হয়ে দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত সেখানেই পড়েন। সেখানে পড়াকালীন দেশের প্রবীণ আলেম আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.), আল্লামা আশরাফ আলী (রহ.) এবং আল্লামা কুতুবউদ্দীন (রহ.)সহ শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিত্বের কাছে হাদিসের কিতাব পড়েন।

তার মেধা, মনন আর যোগ্যতায় মুগ্ধ হয়ে কিশোরগঞ্জের জামিয়া ইমদাদিয়া কর্র্তৃপক্ষ ১৯৬৯ সালে সেখানেই শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। কিশোরগঞ্জে শিক্ষকতা করা অবস্থায় স্বীয় উস্তাদ আল্লামা কাজী মুতাসিম বিল্লাহ (রহ.)-এর সঙ্গে ঢাকায় চলে আসেন এবং জামিয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম মাদানিয়া যাত্রাবাড়ীতে মুহাদ্দিস হিসেবে যোগ দেন। পরবর্তী সময়ে উচ্চশিক্ষা লাভের উদ্দেশে তিনি ভারতের দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন। ১৯৭৬ সালে তিনি হাদিসশাস্ত্রে পুরো দেওবন্দে প্রথম বিভাগে প্রথম হয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন। পরে আশির দশকে দারুল উলুম দেওবন্দের একশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানে বাংলাদেশের একমাত্র প্রতিনিধি হয়ে বক্তৃতাও করেন।

দেওবন্দ থেকে ফিরে জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় মুহাদ্দিস হিসেবে যোগদান করেন। সেখানে অধ্যাপনাকালে লাজনাতুত তালাবা নামে একটি ব্যতিক্রমধর্মী সংগঠন গড়ে তোলেন। শিক্ষা, সাহিত্য, গবেষণা ও ব্যক্তি গঠনে যে সংগঠনের ভূমিকার কথা আজও স্মরণ করা হয়। পরে জামিয়া শারইয়্যাহ মালিবাগ, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা ও ঢাকার চৌধুরীপাড়ায় শেখ জনূরুদ্দীন (রহ.) দারুল কুরআন মাদ্রাসায় শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফরিদাবাদ মাদ্রাসায় পড়ানোর সময় ১৯৭৭ সালে তিনি ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশে যোগদান করেন। পরবর্তী সময়ে পরিচালকসহ বিভিন্ন দায়িত্ব পালন করেন। 

এই সময়টায় তিনি ইলমি ফেতনার পাশাপাশি বৈশ্বিক নবআবিষ্কৃত বিভিন্ন ফেতনার মূলোৎপাটন ও ইহুদি-খ্রিষ্টান ষড়যন্ত্রের মোকাবিলায় গবেষণার কাজে মনোযোগী হন। আশির দশকে তার গবেষণাধর্মী রচনা ‘ইসলামে শ্রমিকের অধিকার’ যেন পাশ্চাত্য কমিউনিজম আর পুঁজিবাদের মুখোশ উন্মোচনে বারুদের মতো কাজ করে। ভাষাশৈলী আর নববি প্রভা মাখানো বইটি আঘাত হানে ফাঁপা গবেষকদের কপালে। বইটির ইংরেজি সংস্করণও দেশের বাইরে থেকে প্রকাশিত হয়েছে। এই ব্যতিক্রমধর্মী গবেষণামূলক রচনার জন্য তিনি ঐতিহ্য ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে হাজী শরীয়তুল্লাহ স্বর্ণপদক-২০০৮ লাভ করেন। তাছাড়া ছাত্র জামানায় আরবি ভাষায় রচিত তার অনবদ্য গ্রন্থ ‘রাওয়ায়ে মিন আশআরিশ সাহাবাহ’ মিশরের দারুল হাদিস নামে একটি বৃহৎ প্রকাশনা সংস্থা প্রকাশ করেছে।

বাংলা ও উর্দু ভাষায় লিখিত বা অনূদিত বইয়ের সংখ্যা শতাধিক। এর মধ্যে বেশ কয়েকটি গ্রন্থ সরাসরি আরবি, ফার্সি ও উর্দু ভাষা থেকে অনুবাদ করেছেন। অসংখ্য বই অনুবাদ, সম্পাদনা ও লেখে বাংলাদেশের মানুষের কাছে মহান দীন ও শরিয়তের মেজাজ তুলে ধরেছেন। বর্তমানে উপমহাদেশের সর্ববৃহৎ শোলাকিয়া ঈদগাহের ইমাম হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া তিনি জাতীয় দীনি মাদরাসা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন। দেশের বিভিন্ন মাদরাসায় ৪৮ বছর যাবৎ হাদিসের সর্বোচ্চগ্রন্থ সহিহ বোখারির পাঠদান করেছেন এবং বর্তমানেও জামিয়া ইকরা বাংলাদেশে বোখারি শরিফ পাঠদান করছেন।

কওমি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ শ্রেণি দাওরায়ে হাদিসের সনদের সরকারি স্বীকৃতি বাস্তবায়নে তিনি ব্যাপক ভূমিকা রেখেছেন। কওমি সনদের স্বীকৃতির বিষয়টি হঠাৎ কোনো সিদ্ধান্ত নয়। ২০০৯ সাল থেকেই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আলেমদের সঙ্গে আলোচনার সূত্রপাত করেন, সেটি ২০১০ সালে গ্রহণ করা শিক্ষানীতিতেও স্থান পায়। পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালের ১৫ এপ্রিল বাংলাদেশ সরকার একটি কমিশন গঠন করে। ওই কমিশনে মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদকে কো-চেয়ারম্যান করা হয়। অবশেষে ‘আল-হাইয়াতুল উলইয়া লিল জামিয়াতিল কওমিয়া বাংলাদেশের’ অধীন ‘কওমি মাদ্রাসাসমূহের দাওরায়ে হাদিসের (তাকমিল) সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি (ইসলামিক স্টাডিজ ও আরবি) সমমান প্রদান বিল, ২০১৮’ জাতীয় সংসদে পাস হয়। কওমি মাদ্রাসাসমূহের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা আল হাইয়াতুল উলইয়ার সদস্য মাওলানা ফরীদ উদ্দীন মাসঊদ।

এ ছাড়া তিনি ইসলাহুল মুসলিমীন পরিষদ বাংলাদেশ নামে একটি বেসরকারি সেবা সংস্থার চেয়ারম্যান, রাজারবাগ পুলিশ লাইন শাহী জামে মসজিদ ও চৌধুরীপাড়া ঝিল মসজিদের খতিব, বাংলাদেশ জাকাত বোর্ড ও ঢাকা ইউনিভার্সিটি শিলালিপি বোর্ডের অন্যতম সদস্য, ইসলামী গবেষণা পরিষদের চেয়ারম্যান, রাজধানীর জামিয়া ইকরা বাংলাদেশের মহাপরিচালক ও শায়খুল হাদিস হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। বাংলাদেশে আধুনিক ইসলামিক স্কুল প্রতিষ্ঠার পুরোধা এবং দেওবন্দি চিন্তাধারার বাতিঘর হিসেবেই তিনি সমধিক পরিচিত। তিনি তার এ বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনে অসংখ্য স্কুল, মাদরাসা, মসজিদ ও ইয়াতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন। তার সম্পাদনায় বের হয় মাসিক পাথেয় ও পাথেয় টোয়েন্টিফোর.কম।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনে পরিচালক হিসেবে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন। ইসলামিক ফাউন্ডেশনে যথাক্রমে অনুবাদ-সংকলন বিভাগ, প্রকাশনা বিভাগ, গবেষণা ও ইমাম প্রশিক্ষণ বিভাগসমূহে পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। তার হাত ধরেই বাংলাদেশের ইতিহাসে হক্কানি উলামায়ে কেরামের গবেষণাকর্ম ছাপার অক্ষরে জনগণের হাতে আসে। ইসলামিক ফাউন্ডেশনের মতো দেশের গুরুত্বপূর্ণ এ অঙ্গনে সহিহ আকিদা-বিশ্বাসের কিতাবাদি স্থান পায়। তার তত্ত্বাবধানে কোরআনে কারিমের অনুবাদ, সহিহ ছয়টি হাদিস গ্রন্থের অনুবাদ সমাপ্ত হয়। তার উদ্যোগে ইসলামি বিশ্বকোষের সম্পাদনার কাজ শেষ হয় এবং এ কাজে কওমি আলেমরা ব্যাপক ভূমিকা রাখেন। বাংলাদেশ টেক্সটবুক বোর্ডের রিভিউ সম্পাদনা ও রচনা কমিটির সম্মানিত সদস্য হিসেবেও কাজ করেছেন অনেক দিন। ২০০০ সালে ইফাবা থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেওয়া এ মহান সাধক এখনো নিরবচ্ছিন্ন গবেষণাকর্ম অব্যাহত রেখেছেন। বর্তমানে তিনি বাংলা ভাষায় ‘আল্লাহর পরে শ্রেষ্ঠ যিনি’ নামে তিন খণ্ডের একটি কালজয়ী সিরাত গ্রন্থ লিখেছেন। যা ইতিমধ্যে বাংলা ভাষাভাষি পাঠকের হৃদয় ছুঁয়েছে। অচিরেই মেজাযে শরিয়ত নামে তার আরেকটি কালজয়ী গ্রন্থ বাজারে আসছে। তাছাড়া বর্তমানে অবসর সময়ে তিনি কোরআন মাজিদের তাফসির রচনায় সময় পার করছেন। এক কন্যা ও তিন ছেলের জনক তিনি।

২০১৭ সালে বিশ্বব্যাপী মুসলমানদের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে তিনি লক্ষাধিক আলেম, মুফতি ও ইমামের স্বাক্ষর সংবলিত ‘সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদবিরোধী মানবকল্যাণে শান্তির ফতোয়া’ প্রকাশ করেন। সন্ত্রাস ও অরাজকতার বিরুদ্ধে মানবকল্যাণে তার এ ফতোয়া দেশব্যাপী আলোড়ন তৈরি করে। ফতোয়া জারির মুখ্য ভূমিকায় থেকে তিনি ইসলামের মহান হুকুম জিহাদ ও সন্ত্রাসের মধ্যকার পার্থক্য দেশবাসীর সামনে পেশ করেন এবং এ ফতোয়া ওআইসি সেক্রেটারির হাতে তুলে দেন।

তিনি অনেক দেশ সফর করেছেন। পুরানো পাণ্ডুলিপি পাঠ বিষয়ক ওআইসির জেদ্দায় অনুষ্ঠিত সেমিনার, জাকাত ফান্ডের আন্তর্জাতিক সম্মেলনসহ মধ্যপ্রাচ্য, লন্ডন, বার্মিংহাম, পাকিস্তান, ভারত, নেপাল, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য ইত্যাদি দেশের মাহফিল ও ইসলাহি ইজতেমায় অতিথি হয়ে বিশ্বের মুসলমানদের দিক-নির্দেশনার গুরু দায়িত্বও পালন করেন। বর্নাঢ্য জীবনের এ মহাসড়কে হেঁটেছেন সুন্নতে নববির অনুসরণে। পূর্বসূরি প্রাজ্ঞ আলেমদের সান্নিধ্য ঝর্ণায় সিক্ত এ মনীষী লালন করছেন পূর্ণাঙ্গ দেওবন্দি চেতনা। তিনি বিশ্বাস করেন দেওবন্দি চেতনা কোনো প্রতিষ্ঠানের নাম নয়। এটা স্রেফ কোনো পাঠশালা নয়। এটা সাহাবাদের এক উচ্ছ্বল বিভা। আল্লাহর প্রিয় ও একনিষ্ঠ পূর্বসূরি সংগ্রামী আলেমদের অব্যক্ত আলো।

বর্তমানে বাংলাদেশে লেখালেখি ও শিক্ষা গবেষণায় ক্ষেত্রে নেতৃত্ব দিচ্ছেন যারা, তাদের অধিকাংশই তার শিষ্য। মাদানি সান্নিধ্যের আলোয় আলোকিত এই মহীরূহ আধ্যাত্মিকতার পরশে মাসিক সবগুজারি আর বাৎসরিক ইসলাহি ইজতেমার মাধ্যমে জাগিয়ে তুলছেন আত্মভোলা অসংখ্য প্রাণ। শায়খুল আরব ওয়াল আজম সাইয়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানি (রহ.)-এর খলিফা ও সাহেবজাদা ফেদায়ে মিল্লাত হজরত আসআদ মাদানি (রহ.)-এর হতে বায়াত গ্রহণ করে উম্মতের দরদকে দেখছেন তার শায়খের আয়নায়। মাদানি সিলসিলার এই মহান বুজুর্গ আজ আলো ঝরাচ্ছেন দেশের পরতে পরতে। জীবনের পড়ন্ত বিকেলে কাসেমি পাঠশালার প্রত্যক্ষ এ সন্তান অনেকটা নীরবে-নিভৃতিতে লেখালেখি, গবেষণা ও হাদিসের খেদমতে দিনাতিপাত করছেন। আমরা মহান এই ব্যক্তিত্বের সুস্থতা ও নেক হায়াত কামনা করি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত