সরকারের পদত্যাগ ও নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের এক দফা দাবিতে আগামী দিনের কর্মসূচিগুলোতে সমন্বয়হীনতা দেখতে চায় না বিএনপির স্থায়ী কমিটি নেতারা। এজন্য দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সতর্ক করার কথা বলেছেন তারা। একই সঙ্গে গত ২৯ জুলাই ঢাকার প্রবেশপথে অবস্থান কর্মসূচি সমন্বয়হীনতার কারণে সফল হয়নি বলে দলটির সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী ফোরামের মূল্যায়নে উঠে এসেছে। দেশি-বিদেশি গণমাধ্যমসহ সাধারণ মানুষের কাছে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের ওপর হামলার ঘটনাটি উঠে আসায় কার্যত বিএনপির সাংগঠনিক দুর্বল প্রকাশ পায়নি বলে নেতারা মনে করছেন।
এ অবস্থায় মহাসমাবেশ ও গণঅবস্থান কর্মসূচির মূল্যায়নের পর নতুন কর্মসূচি নিয়ে আগামী সেপ্টেম্বরে ধারাবাহিকভাবে মাঠে থাকা সিদ্ধান্ত নিয়েছে দলটি। এর আগে আগস্ট মাস জুড়ে নিয়মতান্ত্রিক কর্মসূচি দিয়ে যাবে তারা। এরই অংশ হিসেবে আগামী শুক্রবার রাজধানীতে বিক্ষোভ মিছিলের কর্মসূচি পালনের সিদ্ধান্ত হয়েছে।
গত সোমবার রাতে দলের স্থায়ী কমিটির ভার্চুয়াল বৈঠকে এমন মূল্যায়ন ও সিদ্ধান্তের কথা উঠে এসেছে। মহাসমাবেশে ও অবস্থান কর্মসূচির পর এটিই ছিল নীতিনির্ধারকদের প্রথম বৈঠক।
দলটি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, এক দফার যুগপৎ আন্দোলনের নতুন কর্মসূচি আমরা শিগগির ঘোষণা করব।
এক প্রশ্নের জবাবে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘২৯ জুলাইয়ের কর্মসূচিতে আমাদের প্রচুর লোক, লাখো নেতাকর্মী ছিল। পুলিশ ও সন্ত্রাসীরা হামলা করেছে, মারধর করেছে। স্থায়ী কমিটির সদস্য, সিনিয়র নেতাদের পিটিয়েছে। কতজন মেরেছে, কত আহত হয়েছে, কত গ্রেপ্তার হয়েছে সবই গণমাধ্যমে এসেছে।’
জানা গেছে, গত ২৯ জুলাই অবস্থান কর্মসূচি সফল হয়নি মূল্যায়ন করে স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নেতারা বলেছেন, ওইদিন নেতাকর্মীরা সেভাবে মাঠে ছিল না। ফলে কর্মসূচি সফল হয়নি। পুলিশ ও সরকারি দলের মারমুখী অবস্থান এবং দোলাইরপাড়ে কর্মসূচিতে গয়েশ্বর চন্দ্র রায়ের ওপর পুলিশি হামলার কারণে সাংগঠনিক দুর্বলতার বিষয়টি ওইভাবে সামনে আসেনি। লাখ লাখ মানুষের উপস্থিতিতে সফল মহাসমাবেশের পর এমন কঠোর ও সাংঘর্ষিক কর্মসূচি নিয়ে নেতাদের মধ্যে নানা প্রশ্ন ছিল। দলের স্থায়ী কমিটির অধিকাংশ নেতারাও অবস্থান কর্মসূচির বিষয়ে আগে অবগত ছিলেন না। ঢাকার পাঁচটি প্রবেশপথে স্থায়ী কমিটির কোন সদস্য কোথায় থাকবেন সেটা গভীর রাতে তাদের জানানো হলেও ভাইস চেয়ারম্যান, উপদেষ্টাসহ কেন্দ্রীয় কমিটির অন্য নেতারা কোথায় থাকবেন তা শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জানানো হয়। ফলে কর্মসূচি বাস্তবায়নে সুস্পষ্ট কোনো পরিকল্পনা ছিল না। জানা গেছে, ঢাকার বাইরে থাকা বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন নেতাকে অবস্থান কর্মসূচি বাস্তবায়নে সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। কর্মসূচিতে সিনিয়র নেতাদের রাজপথে না নামা এবং অবস্থান কর্মসূচি থেকে একটি অঙ্গসংগঠনের একজন শীর্ষ নেতার হঠাৎ প্রস্থানকেও ভালোভাবে নেয়নি দল।
সূত্রগুলো বলছে, ঢাকার প্রবেশপথের প্রতিটি পয়েন্টে ২৫-৩০ হাজার নেতাকর্মী জড়ো হওয়া সম্ভব ছিল। কারণ ২৮ জুলাইয়ের মহাসমাবেশ ঘিরে সারা দেশ থেকে লাখ লাখ নেতাকর্মী তখন ঢাকায় অবস্থান করছিল। পরিকল্পনা ঠিক থাকলে হয়তো পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারত। আন্দোলনের গতিপথও পাল্টে যেত। বিএনপির পরিকল্পনা ছিল, ঢাকায় অবস্থানরত নেতাকর্মীদের সম্পৃক্ত করে ঢাকাকেন্দ্রিক ধারাবাহিক কর্মসূচির মাধ্যমে দ্রুততম সময়ের মধ্যে লক্ষ্যে পৌঁছানো। এখন নতুন করে আবার ঢাকাকেন্দ্রিক আন্দোলনে ছক কষতে হচ্ছে নীতিনির্ধারকদের। কারণ অবস্থান কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে পুলিশের সঙ্গে নেতাকর্মীদের সংঘর্ষের মধ্যে গাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা, মামলা, বাড়ি বাড়ি গ্রেপ্তারের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হানা ইত্যাদি মোকাবিলা করতে হচ্ছে। এ অবস্থায় বাধ্য হয়ে আন্দোলন কৌশলে পরিবর্তন আনতে হচ্ছে। ফলে ৩১ জুলাই জেলা ও মহানগরে প্রতিবাদ সমাবেশের কর্মসূচির মধ্য দিয়ে নেতাকর্মীদের নিজ জেলায় ফেরত পাঠানো হয়েছিল।
জানা গেছে, যুগপৎ আন্দোলনের অংশ হিসেবে আগামী শুক্রবার ঢাকায় বিক্ষোভ মিছিল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বিএনপি। ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপির উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালিত হবে। তবে দেশের বিভিন্ন স্থানে বন্যার কারণে ঢাকার বাইরে আপাতত কর্মসূচি রাখতে চাইছে না তারা। ইতিমধ্যে যুগপতের শরিকদের এ কর্মসূচির ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে।
বৈঠকে সরকার জোর করে ক্ষমতায় থাকতে বিচার বিভাগকে ব্যবহার করে বিএনপিসহ বিরোধী দল দমনের চেষ্টা করছে আলোচনা হয়। এজন্য স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, ঢাকা মহানগর উত্তরের আহ্বায়ক আমানউল্লাহ আমানসহ নেতাদের সাজা দেওয়া হয়েছে বলে আলোচনায় আসে। এ বিষয়ে আরও সোচ্চার হয়ে বিভিন্ন সভা-সমাবেশ- সেমিনারে বক্তব্য, বিবৃতির মধ্য দিয়ে আলোচনা তৈরির সিদ্ধান্তের কথা বলা হয় বৈঠকে।
