মানবাধিকার, অংশীদারির সংলাপ, শ্রম, রোহিঙ্গা প্রভৃতি ইস্যুতে গত দুই বছরে বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের যত প্রতিনিধিদল এসেছে, সবই এসেছে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন মূল উপলক্ষ করে। আগামী নির্বাচনই তাদের আগ্রহের মূল বিষয়। আর এ বিষয়টি ছাপিয়ে রয়েছে চীনের বা অন্য শক্তির প্রভাবের প্রসঙ্গ। ওয়াশিংটনের বড় চিন্তা ঢাকা কোনোভাবেই যেন চীন বা অন্য বলয়ে ঢুকে না পড়ে। তাই দুই বছরে ১৫টির বেশি প্রতিনিধিদল সফর করেছে বাংলাদেশ।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, শুধু প্রতিনিধিদলের সফরই নয়, বাংলাদেশের জাতীয় দিবস কিংবা অন্যান্য উৎসবে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী অ্যান্টনি ব্লিঙ্কেনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনকে পাঠানো শুভেচ্ছা বার্তায়ও নির্বাচন বিষয়ে তাদের আশাবাদের কথা জানিয়েছেন।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞার ঘোষণা থেকেই বাংলাদেশের রাজনীতি, গণতন্ত্র, মানবাধিকার প্রভৃতি ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের আগ্রহের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতি, নির্বাচন, গণতন্ত্র প্রভৃতি নিয়ে তাদের আগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে একটি নেতিবাচক ইস্যুতে। এটা করে সরকারকে তারা এক ধরনের চাপে ফেলে দেয়, সরকারপক্ষ যেন তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে। সরকারপক্ষও চাপে পড়ে। এরপরই ঢাকা-ওয়াশিংটন যোগাযোগ বাড়ে। দুটি ডায়ালগ অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনা ও চাপ একসঙ্গে চলমান।
২০২১ সালের ১০ অক্টোবর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সাবেক ও বর্তমান সাত কর্মকর্তার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে যুক্তরাষ্ট্র। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার দিবসে পৃথকভাবে নিষেধাজ্ঞা দেয় যুক্তরাষ্ট্রের ট্রেজারি ডিপার্টমেন্ট (রাজস্ব বিভাগ/মন্ত্রণালয়) ও স্টেট ডিপার্টমেন্ট (পররাষ্ট্র বিভাগ/মন্ত্রণালয়)। তারপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া ও নতুন নিষেধাজ্ঞা যাতে না আসে, সেজন্য ঢাকা-ওয়াশিংটন যোগাযোগ বাড়তে থাকে। এ নিয়ে অনেক বৈঠক হয়েছে।
কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করেন, যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশকে পাশে চায়। গত কয়েক বছর ধরে এশিয়া অঞ্চলের আরেক শক্তি চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বেড়ে চলেছে। চীনও এ অঞ্চলে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার জন্য বাংলাদেশকে পাশে চায়। যুক্তরাষ্ট্র এ অঞ্চলে তাদের মিত্র এবং বাংলাদেশের বন্ধু ও প্রতিবেশী ভারতকে দিয়ে ঢাকার ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠায় সচেষ্ট ছিল। এবার যুক্তরাষ্ট্র তা করছে না। তারা সরাসরি ঢাকার সঙ্গে হিসাব মেলাতে চাইছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশকে নিয়ে চীনাভীতি যুক্তরাষ্ট্রে বেশি কাজ করছে। চীনও অন্য সময়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক বিষয়ে খুব সোচ্চার না হলেও এবার পরোক্ষভাবে বাংলাদেশ নিয়ে বেশ আগ্রহী।
গতকাল ঢাকায় সফররত দুই মার্কিন কংগ্রেসম্যান পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. মোমেনের সঙ্গে বৈঠকেও চীনের প্রসঙ্গ তোলেন। তারা জানতে চেয়েছেন, ‘লোকজন বলছে, বাংলাদেশ একটি ভয়ংকর জায়গা। এরা চীনের খপ্পরে পড়েছে। চীনের গোলাম হয়ে গেছে। বাংলাদেশে অশান্তি এবং পুলিশ যখন-তখন লোক ধরছে এবং মেরে ফেলছে।’
গত সপ্তাহে তিন দিনের সফরে ঢাকায় আসে মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের বৈশ্বিক দুর্নীতি দমনবিষয়ক সমন্বয়ক রিচার্ড নেফিউর নেতৃত্বে তিন সদস্যের প্রতিনিধিদল। তারা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সচিব মো. মাহবুব হোসেনের সঙ্গে বৈঠক করেছে। নেফিউর সফরটি সরাসরি নির্বাচনকেন্দ্রিক না হলেও কূটনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, সফরটি যথেষ্ট মাত্রায় রাজনৈতিক ও নির্বাচনকেন্দ্রিক ছিল। প্রতিনিধিদল ওয়াশিংটন সরকারের পক্ষে সুশাসনবিষয়ক বড় হুমকি দিয়ে গেছে। নির্বাচনের কয়েক মাস বাকি; তার আগে অর্থ পাচারসহ দুর্নীতি নিয়ে এ সফর ছিল অনেক বেশি রাজনৈতিক।
গত ১১ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের নাগরিক নিরাপত্তা, মানবাধিকার ও গণতন্ত্রবিষয়ক আন্ডার সেক্রেটারি উজরা জেয়ার নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল ঢাকায় এসেছিল। উজরা জেয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, আইনমন্ত্রী আনিসুল হক, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান, পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এবং বাংলাদেশ সরকারের অন্যান্য ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তিনি শ্রমিক আন্দোলন-কর্মী, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিসহ মানবাধিকার রক্ষাকর্মীদের সঙ্গেও বৈঠক করেন। তার আলোচনায় নির্বাচনের বিষয়টিই প্রাধান্য পায়।
এর আগে গত ১১ জানুয়ারি দক্ষিণ ও মধ্য এশিয়াবিষয়ক সহকারী মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ডোনাল্ড লু ঢাকা সফর করেন। সফরে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক শক্তিশালী করার বিষয়ে আলোচনার পাশাপাশি মানবাধিকার, শ্রম অধিকারের বিষয়ে আলোচনার কথা থাকলেও বাংলাদেশের আসন্ন নির্বাচনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের চাওয়া-পাওয়ার কথা জানানো হয়। তিনি পররাষ্ট্রমন্ত্রী, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র সচিবের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। নাগরিকসমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গেও কথা বলেন।
এ বছরের ২৫ মে নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করে ওয়াশিংটন। ভিসানীতিতে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য দায়ী বাংলাদেশি নাগরিকের ভিসা প্রদানে বিধিনিষেধ আরোপ করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত ও বাংলাদেশ এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউটের প্রেসিডেন্ট হুমায়ুন কবীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এবং পশ্চিমারা চায় বাংলাদেশে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পূর্ণ হোক। এ কথা তারা ২০২১ সালের ১০ ডিসেম্বর র্যাবের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারির মধ্য দিয়ে বলেছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র মানবাধিকার, গণতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা, শ্রম অধিকার, গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা, বিরোধী রাজনৈতিক পক্ষের প্রতি সরকারপক্ষের আচরণ বিষয়ে বার্তা দেওয়ার জন্য ঘন ঘন প্রতিনিধিদল পাঠাচ্ছে। সফরগুলোর বিষয়বস্তু ভিন্ন হলেও মূলে নির্বাচন। তারা এ অঞ্চলে তাদের নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চায়। এখানে গণতন্ত্র যেন তাদের গণতন্ত্রের কনসেপ্টের বাইরে না যায়। আমার মনে হয় আগামী কয়েক মাস এরকম সফর চলতেই থাকবে।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ও কূটনৈতিক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সফরগুলোর মূল লক্ষ্যই নির্বাচন। নির্বাচনের আগপর্যন্ত তারা এমন সফর অব্যাহত রাখবে। গত কয়েকটি নির্বাচনেও যুক্তরাষ্ট্র সরব ছিল। তবে এতটা নয়। চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিদলের সফর অব্যাহত রয়েছে। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতও বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন।’
