জনগণের জন্য কাজ করায় আওয়ামী লীগকে কোনো তথ্য গোপন করতে হয় না বলে মন্তব্য করেছেন দলটির সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ জনগণের জন্য কাজ করে। আওয়ামী লীগের কোনো রাখঢাক (গোপনীয়) কিছু নেই। কোনো তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে, সেই চিন্তা আমাদের নেই। আমরা যা করব, সম্পূর্ণভাবে জনগণকে জানিয়ে জনগণের সঙ্গে সম্পৃক্ত থেকেই করব। জনগণের কল্যাণ করাটাই আওয়ামী লীগের লক্ষ্য এবং সেই লক্ষ্য নিয়েই আমরা কাজ করে যাচ্ছি।’
প্রধানমন্ত্রী গতকাল রবিবার গণভবন থেকে ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নবনির্মিত ১৫ তলা বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ভবন ও ১৩ তলা তথ্য কমিশন ভবন উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন। এ ছাড়া তিনি বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি) কমপ্লেক্সেরও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
তথ্যের অবাধ প্রবাহ নিশ্চিতে তার সরকারের প্রচেষ্টার উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, ‘তথ্য চাওয়া এবং তথ্য পাওয়া মানুষের অধিকার। সেই অধিকার আমরা নিশ্চিত করতে পেরেছি এবং এখন মানুষ কোনো তথ্য চাইলে তা পেতে পারে।’
প্রধানমন্ত্রী জানান, আওয়ামী লীগ ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে ‘তথ্য অধিকার আইন’ পাস করে এবং এর আওতায় ‘তথ্য কমিশন’ গঠন করে। পাশাপাশি প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ দেয় এবং কমিশনের নিজস্ব ভবন নির্মাণের পদক্ষেপ গ্রহণ করে।
১৯৯৬-২০০১ মেয়াদে আওয়ামী লীগ সরকার বেসরকারি খাতকে উন্মুক্ত করে দেওয়ায় স্বাধীনভাবে মতপ্রকাশের অবারিত সুযোগ সৃষ্টি হয় এমন অভিমত ব্যক্ত করে তিনি বলেন, ‘আমরাই বাংলাদেশ টেলিভিশন, বিটিভি ওয়ার্ল্ড ও সংসদ টেলিভিশনের পাশাপাশি ৪৪টি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল, ২২টি এফএম রেডিও ও ৩২টি কমিউনিটি রেডিও, ১৪টি আইপি টিভিসহ অসংখ্য সংবাদপত্র, অনলাইন পোর্টালের অনুমোদন দিয়েছি। আমরা সাংবাদিকদের কল্যাণে “বাংলাদেশ সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্ট” প্রতিষ্ঠা করেছি। জাতীয় অনলাইন গণমাধ্যম নীতিমালা-২০১৭, জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালা-২০১৪সহ বিভিন্ন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করেছি।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আজ আমরা টেলিডেনসিটি ১০৪ শতাংশে উন্নীত করেছি। দেশে এখন মোবাইল গ্রাহক ১৮ কোটির ওপরে। ১৭ কোটি মানুষ কিন্তু সিম ব্যবহার হচ্ছে ১৮ কোটির ওপরে। মোবাইল ইন্টারনেট সংযোগ রয়েছে এমন গ্রাহকের সংখ্যা ১২ কোটি ৭০ লাখ।’
মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘দেশের সব টিভি চ্যানেল বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট ব্যবহার করছে। সাবমেরিন কেব্ল কক্সবাজারে এবং কুয়াকাটায় সংযুক্ত করা হয়েছে এবং আরও একটি সংযোগের জন্য প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। বর্তমানে বিটিআরসির ব্যান্ডউইথ চাহিদা বৃদ্ধি পাওয়ায় বাংলাদেশ সাবমেরিন কেব্ল কোম্পানি লিমিটেডের (বিএসসিসিএল) পাশাপাশি আরও তিনটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে সাবমেরিন কেব্লে সংযুক্তির লাইসেন্স প্রদান করা হয়েছে। সারা দেশে অপটিক্যাল ফাইবার বিস্তৃত হয়েছে ১ লাখ ৬০ হাজার ৩৪৮ কিলোমিটার।’
আওয়ামী লীগ সভাপতি বলেন, ‘বিএনপি আমলে ১৯৯১ ও ’৯৪ সালে দু-দুবার বিনা খরচে সাবমেরিন কেব্লে সংযুক্ত হওয়ার সুযোগ পেয়েছিল বাংলাদেশ। অথচ তথ্য ফাঁস হয়ে যাবে এ অজুহাতে তারা এই সুযোগ প্রত্যাখ্যান করে।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০১১ থেকে ২০২৩ পর্যন্ত বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পুরস্কার লাভের পাশাপাশি ১২ বছরে বিটিআরসি শুধু তরঙ্গ বরাদ্দ দিয়ে রাজস্ব আয় করেছে ৪ দশমিক ৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি। তার সরকার ৮ হাজার ৮৪৩টি ডিজিটাল সেন্টার এবং ৮ হাজার ৫০০টি পোস্ট ই-সেন্টার স্থাপন করেছে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত অপটিক্যাল ফাইবার সম্প্রসারণ করা হয়েছে। এ ছাড়া সরকার ৩৫ হাজার ২৫৬টি ওয়েবসাইট সংবলিত বিশ্বের বৃহত্তম ওয়েব পোর্টাল ‘তথ্য বাতায়ন’ চালু করেছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
প্রধানমন্ত্রী এ সময় ১৯৫৬ সালে মন্ত্রী থাকাকালীন জাতির পিতার হাতেই এ দেশে চলচ্চিত্র শিল্পের গোড়াপত্তন হয়েছে উল্লেখ করে জানান, তার মায়েরও এতে ভূমিকা ছিল। সে সময় এ দেশে কলকাতাভিত্তিক বাংলা ছবির প্রদর্শনী হতো। একটি ছায়াছবি দেখে রিকশায় ফেরার পথে তার মা (বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন নেছা মুজিব) বাবার কাছে কথা তুলেছিলেন, বাংলাদেশেও কি এমন চলচ্চিত্র নির্মাণ করা যায় না? পরে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৫৭ সালের ৩ এপ্রিল তৎকালীন প্রাদেশিক পরিষদে এক বিল উত্থাপনের মাধ্যমে এফডিসি প্রতিষ্ঠা করেন। জাতির পিতা গাজীপুরে ফিল্মসিটির জন্য জায়গাও বরাদ্দ দিয়ে গিয়েছিলেন।
শেখ হাসিনা বলেন, ২০০৯ সালে সরকার গঠনের পর ২০১২ সালের ৩ এপ্রিল গেজেট বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে চলচ্চিত্রকে ‘শিল্প’ হিসেবে তার সরকার ঘোষণা দেয়। সরকার ‘চলচ্চিত্র সংসদ নিবন্ধন আইন ২০১১’, ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট (সংশোধন) আইন-২০১৯’ প্রণয়ন করেছে। প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র ও টেলিভিশন ইনস্টিটিউট’। অসচ্ছল শিল্পী ও কলাকুশলীদের আর্থিক সহায়তার লক্ষ্যে ‘শিল্পী কল্যাণ ট্রাস্ট’ গঠন করা হয়েছে।
তিনি আরও জানান, পাশাপাশি সিনেমা হল মালিকদের দীর্ঘমেয়াদি ও স্বল্পমেয়াদি ব্যাংক ঋণ প্রদান করা হচ্ছে। সুস্থ ধারার চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য সরকারি অনুদান বৃদ্ধি করা হয়েছে। ইতিমধ্যে প্রণীত হয়েছে চলচ্চিত্র নীতিমালা।
যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলা করে বাংলাদেশের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখার কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণ আমাদের বারবার নৌকা মার্কায় ভোট দিয়ে তাদের সেবা করার সুযোগ দিয়েছেন বলেই এ কাজগুলো আমরা করতে পেরেছি। বাংলাদেশে ২০০৯ থেকে আজকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিক গণতান্ত্রিক পদ্ধতির সরকার চলছে, দেশে স্থিতিশীলতা বজায় রয়েছে। যদিও এর মধ্যে আমাদের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, মনুষ্য সৃষ্ট দুর্যোগ এবং অগ্নিসন্ত্রাসÑ এমন অনেক কিছুই মোকাবিলা করতে হয়েছে। কিন্তু তারপরও বাংলাদেশ এগিয়ে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রা যেন অব্যাহত থাকে সেটাই আমরা চাই।’
তিনি আরও বলেন, ‘আজকে ডিজিটাল বাংলাদেশ করেছি এবং ২০৪১ সালের মধ্যে এ বাংলাদেশকে আমরা “স্মার্ট বাংলাদেশ” হিসেবে গড়ে তুলতে চাই। সেখানে আমাদের স্মার্ট জনগোষ্ঠী হবে, স্মার্ট ইকোনমি হবে, স্মার্ট সোসাইটি হবে, স্মার্ট গভর্নমেন্ট তথা প্রতিটি ক্ষেত্রই স্মার্ট হবে।’
শেখ হাসিনা তার সরকারের চালু করা সর্বজনীন পেনশন স্কিমের প্রসঙ্গ টেনে বলেন, ‘আগে অবসর ভাতা শুধু সরকারি কর্মকর্তারাই পেত, সেটাকে আমরা এখন সর্বজনীন করে দিয়েছি। কেননা যখন তাদের (অবসরে যাওয়া বেসরকারি কর্মজীবী) কাজ করার সুযোগ থাকবে না তখন তাদের জীবনটা যেন অর্থবহ থাকে এবং প্রত্যেক মানুষের জীবনটা যেন নিরাপদ হয়।’
বিএফডিসি কমপ্লেক্সের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপনের পাশাপাশি এক একর জমিতে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন বিটিআরসি ভবন এবং শূন্য দশমিক ৩৫ একর জমিতে তথ্য কমিশন ভবন উদ্বোধনের পর তিনি বলেন, ‘আমরা যখনই কোনো উন্নয়নের উদ্যোগ নিই, তখনই দেখতে পাই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর ভিত্তি প্রদান করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর হাতে গড়া ভিত্তির ওপর নির্ভর করেই আজকের বাংলাদেশ উন্নয়নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।’ অনুষ্ঠানে বিটিআরসি ভবন, তথ্য কমিশন ভবন এবং বিএফডিসি কমপ্লেক্স (তেজগাঁও) সংযুক্ত ছিল।
তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, ডাক ও টেলিযোগাযোগ মন্ত্রী মোস্তাফা জব্বার অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করেন। প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের (পিএমও) সচিব মোহাম্মদ সালাহ উদ্দিন অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন। অনুষ্ঠানে নবনির্মিত বিটিআরসি ও তথ্য কমিশন ভবন এবং বিএফডিসি কমপ্লেক্সের ওপর একটি অডিও-ভিডিও তথ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়। বাসস
