মেডিকেলের প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় জড়িত খুলনার থ্রি ডক্টরস মেডিকেল ভর্তি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক, সাবেক শিক্ষার্থীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। সিআইডির একটি দল রবিবার রাতে খুলনা থেকে তাদের গ্রেপ্তার করে। পরে গতকাল সোমবার সন্ধ্যায় এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
গ্রেপ্তারকৃতরা হলেন ডা. মো. ইউনুচ উজ্জামান খান তারিম (৪০), ডা. লুইস সৌরভ সরকার (৩০), ডা. শর্মিষ্ঠা মন্ডল (২৬), ডা. মুসতাহিন হাসান লামিয়া (২৬) ও ডা. নাজিয়া মেহজাবিন তিশা (২৪)। তাদের মধ্যে চিকিৎসক শর্মিষ্ঠা খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইন্টার্ন চিকিৎসক। অন্যরা বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখেন।
এর আগে সাতজন চিকিৎসকসহ মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ১২ জনকে গ্রেপ্তার করে সিআইডি। তাদের মধ্যে আটজন দায় স্বীকার করে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিও দিয়েছেন। এ নিয়ে মেডিকেল কলেজ ভর্তি পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ১২ চিকিৎসকসহ ১৭ জনকে গ্রেপ্তার করেছে সিআইডি।
সিআইডি জানায়, ডা. ইউনুচ উজ্জামান খান তারিম একসময় খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ডাক্তার ছিলেন। স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদ (স্বাচিপ) খুলনা জেলার সাংগঠনিক সম্পাদক। ডাক্তারি পেশা বাদ দিয়ে জড়ান কোচিং ব্যবসায়। খুলনায় তৈরি করেন ‘থ্রি ডক্টরস’ মেডিকেল ভর্তি কোচিং সেন্টার। এখানে ভর্তি হলেই পাওয়া যায় মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় সুযোগ। তারিম ‘থ্রি ডক্টরস’ মেডিকেল ভর্তি কোচিং সেন্টারকে ডাক্তার তৈরির কারিগর হিসেবে পরিচয় দিতেন। তিনি মেডিকেল প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে অবৈধভাবে শত শত শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি করিয়েছেন। হাতিয়ে নিয়েছেন কোটি কোটি টাকা।
জানা গেছে, ইউনুচ উজ্জামান খান তারিম মেডিকেল প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে অবৈধভাবে শত শত শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন সরকারি মেডিকেল কলেজে ভর্তি করিয়েছেন। তারিম ও তার স্ত্রীর অ্যাকাউন্টে প্রায় ২৫ কোটি টাকার লেনদেন পেয়েছে সিআইডি। এ ছাড়া হাসপাতাল, ফ্ল্যাট, জমি, মাছের ঘের, হোটেল শেয়ারসহ গড়েছেন বিপুল সম্পদ। তারিমের বিরুদ্ধে একাধিক গোয়েন্দ প্রতিবেদনে এর আগেও প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠেছে বলে জানায় পুলিশ।
সিআইডি আরও জানায়, ডা. মুসতাহিন হাসান লামিয়া ২০১৫-১৬ সেশনের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় জাতীয় মেধায় ১১তম স্থান অর্জন করেন। তিনি খুলনা থ্রি ডক্টরস কোচিং সেন্টারের পরিচালক তারিমের স্পেশাল ব্যাচের শিক্ষার্থী ছিলেন। তাকে বাসায়ও পড়াতেন তারিম। কম মেধাবী হওয়ার পরও তারিমের কাছ থেকে প্রশ্ন পেয়ে তিনি মেডিকেলে ভর্তি হয়েছেন। তারিমের ঘনিষ্ঠজন ও তৎকালীন কোচিংয়ের তিন শিক্ষক তার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য দিয়েছেন। জাতীয় মেধায় ১১তম হওয়ার পরও তিনি চারটি ফাইনাল প্রফেশনাল এক্সামিনেশনের সব সাবজেক্টেই ফেল করেন। একাধিকবারের চেষ্টায় তিনি পাস করেছেন। লামিয়ার প্রশ্ন পেয়ে চান্স পাওয়ার বিষয়টি খুলনার চিকিৎসক মহলে ওপেন সিক্রেট। লামিয়ার ভর্তির জন্য তার স্বামী শেখ ওসমান গনি ও ডা. তারিমের মাঝে প্রায় ১৫ লাখ টাকা লেনদেন হয়েছে বলে জানা যায়।
সিআইডি জানায়, ডা. শর্মিষ্ঠা মন্ডল ও ডা. নাজিয়া মেহজাবিন তিশা উভয়েই ২০১৫-১৬ সেশনের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় ডা. তারিমের কাছ থেকে অর্থের বিনিময়ে ফাঁস হওয়া প্রশ্নপত্র কিনে খুলনা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। এ ছাড়া ডা. লুইস সৌরভ সরকার খুলনা মেডিকেল কলেজের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। তিনি মেডিকেল ভর্তি কোচিং সেন্টার থ্রি ডক্টরসের শিক্ষক। বর্তমানে একটি বেসরকারি এনজিওতে মেডিকেল অফিসার হিসেবে কর্মরত।
