ব্রিকসকে হতে হবে বহুমুখী বিশ্বের বাতিঘর : প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৫ আগস্ট ২০২৩, ০২:২৪ এএম

ব্রিকসকে বহুমুখী বিশ্বের বাতিঘর হিসেবে আবির্ভূত হতে হবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বলেছেন, ‘আমাদের এ বহুমুখী বিশ্বে ব্রিকসকে একটি বাতিঘর হিসেবে প্রয়োজন। আমরা আশা করি, আমাদের প্রতি প্রতিক্রিয়ার সময় এটি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে আবির্ভূত হবে। আমাদের শিশু ও যুবকদের কাছে অবশ্যই প্রমাণ করতে হবে যে আমাদের জাতিগুলো সংকটে পড়তে পারে, কিন্তু কখনই পরাজিত হবে না।’

গতকাল বৃহস্পতিবার প্রধানমন্ত্রী জোহানেসবার্গের স্যান্ডটন কনভেনশন সেন্টারে ৭০টি দেশের প্রতিনিধিদের নিয়ে ফ্রেন্ডস অব ব্রিকস লিডারস ডায়ালগ (ব্রিকস-আফ্রিকা আউটরিচ অ্যান্ড দ্য ব্রিকস প্লাস ডায়ালগ) ‘নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক অব ব্রিকস’-এর সদস্য হিসেবে বাংলাদেশের পক্ষে ভাষণ প্রদানকালে এ কথা বলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসাও এ সংলাপে বক্তব্য রাখেন।

ব্রিকস প্লাস ডায়ালগের ফাঁকে ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসি ও ইন্দোনেশিয়ার প্রেসিডেন্ট জোকো উইদোদো বাংলাদেশ প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কুশল বিনিময় করেন। জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস, উগান্ডার ভাইস প্রেসিডেন্ট, দক্ষিণ আফ্রিকার উপপ্রধানমন্ত্রী, রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রী কুশল বিনিময় করেন।

প্রধানমন্ত্রী ১৫তম ব্রিকস সম্মেলনে যোগ দিতে জোহানেসবার্গে আসা রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সঙ্গে একটি ফটোসেশনেও যোগ দেন।

গ্লোবাল সাউথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া তথাকথিত পছন্দ ও বিভাজনকে “না” বলা উচিত। সার্বজনীন নিয়ম ও মূল্যবোধকে অস্ত্রে পরিণত করার প্রচেষ্টাকে আমাদের অবশ্যই প্রত্যাখ্যান করতে হবে। আমাদের নিষেধাজ্ঞা ও পাল্টা নিষেধাজ্ঞার চক্র বন্ধ করতে হবে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, সবাইকে একসঙ্গে অবশ্যই আন্তর্জাতিক অর্থায়ন ও প্রযুক্তির জন্য প্রত্যেকের প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে এবং জলবায়ু, ন্যায়বিচার, অভিবাসীদের অধিকার, ডিজিটাল ইক্যুইটি এবং ঋণ স্থায়িত্বের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি বলেন, আমাদের নিজস্ব মুদ্রা ব্যবহারের সুযোগসহ নিয়মভিত্তিক বহুপক্ষীয় বাণিজ্য ব্যবস্থা সংরক্ষণ করতে হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বর্তমান ব্রিকস চেয়ারম্যান ও দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার আমন্ত্রণে ১৫তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে ২২ আগস্ট জোহানেসবার্গে পৌঁছান।

প্রধানমন্ত্রী রামাফোসাকে তার আমন্ত্রণের জন্য ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট ম্যান্ডেলার স্নেহ ও আশীর্বাদ উপভোগ করার জন্য আমি দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ব্যক্তিগত সংযুক্তি অনুভব করছি। আমি ১৯৯৭ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার ২৫তম বার্ষিকীতে আমাদের উদযাপনে তার যোগদানের কথা স্মরণ করছি।’

তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর উত্তরাধিকার অনুসরণ করে ‘গ্লোবাল সাউথের সঙ্গে আমাদের সংহতি পুনঃনিশ্চিত করতে আমরা এখানে ব্রিকস আউটরিচে এসেছি। আমরা বিশ্বের সব জাতির সঙ্গে বন্ধুত্বের মনোভাব বজায় রাখি, কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়।’

দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রেখেছে, এ কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকে বাংলাদেশের শেয়ারের যথেষ্ট যোগ্যতা রয়েছে।

প্রধানমন্ত্রীর কন্যা ও ক্লাইমেট ভালনারেবল ফোরামের থিম্যাটিক অ্যাম্বাসাডর এবং অটিজম অ্যান্ড নিউরো ডেভেলপমেন্টাল ডিজঅর্ডার জাতীয় উপদেষ্টা কমিটির চেয়ারপারসন সায়মা ওয়াজেদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মাসুদ বিন মোমেন এ সময় উপস্থিত ছিলেন।

নারীদের পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে গড়তে প্রধানমন্ত্রীর পাঁচ প্রস্তাব :  প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নারী ও বালিকাদের পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে গড়ে তুলতে অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টির প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব আরোপ করে এ লক্ষ্যে পাঁচ দফা প্রস্তাব পেশ করেছেন। ব্রিকস সম্মেলন উপলক্ষে গতকাল জোহানেসবার্গের স্যান্ডটন কনভেনশন সেন্টারে আয়োজিত এক মধ্যাহ্নভোজে ভাষণদানকালে তিনি এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘গ্লোবাল সাউথে, আমাদের নারী ও বালিকাদের পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এসডিজি ৫ অর্জনের জন্য আমাদের সবার হাতে হাত রেখে চলা উচিত।’ ব্রিকসের বর্তমান চেয়ারম্যান এবং দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা ১৫তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে জোহানেসবার্গে আসা রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের সম্মানে এ মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করেন। কর্মসূচিতে শেখ হাসিনা এ অঞ্চলের নারী ও বালিকাদের পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি গ্লোবাল সাউথ নেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী তার প্রথম প্রস্তাবে বলেন, আমাদের নারী ও মেয়েদের পুষ্টি, স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চলমান খাদ্য, শক্তি ও আর্থিক সংকটের বিরূপ প্রভাব প্রশমিত করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, তিনি মেয়েদের স্কুলে রাখতে, তাদের সাইবার অপরাধ থেকে সুরক্ষিত রাখতে ও তাদের ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল বিভাজন কমানোর জন্য প্রচেষ্টা চালানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, অনেক মেয়েই এ সমস্যার সম্মুখীন হয়।

শেখ হাসিনার তৃতীয় প্রস্তাবে নারীদের লাভজনক কর্মসংস্থান, শালীন কাজ, মজুরি সমতা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির সুযোগ বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে।

চতুর্থ ও পঞ্চম প্রস্তাবে প্রধানমন্ত্রী একটি সক্রিয় এবং টেকসই রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের জন্য নারীদের জন্য লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড তৈরির পাশাপাশি জলবায়ুর প্রভাবের কারণে নারীদের সুরক্ষা ও টিকে থাকার ব্যবস্থা গ্রহণে প্রয়োজনীতার ওপর গভীরভাবে নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন।

এ সময় প্রধানমন্ত্রীর কন্যা সায়মা ওয়াজেদ, পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন, প্রধানমন্ত্রীর বেসরকারি শিল্প ও বিনিয়োগ উপদেষ্টা সালমান ফজলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব মো. তোফাজ্জল হোসেন মিয়া ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জ্যেষ্ঠ সচিব মাসুদ বিন মোমেন উপস্থিত ছিলেন। পাশাপাশি তানজানিয়ার প্রেসিডেন্ট সামিয়া সুলুহুও অনুষ্ঠানে ভাষণ দেন।

চার প্রেসিডেন্টের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর বৈঠক : ১৫তম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনের ফাঁকে গতকাল জোহানেসবার্গে চার দেশের প্রেসিডেন্টের সঙ্গে বৈঠক করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

শেখ হাসিনার সঙ্গে ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট লুইজ ইনাসিও লুলা দা সিলভা, মোজাম্বিকের প্রেসিডেন্ট ফিলিপে জ্যাকিন্টো নিউসি, তানজানিয়ার প্রেসিডেন্ট ড. সাইমা সুল্লুহু, ইরানের প্রেসিডেন্ট ইব্রাহিম রাইসির আলাদা আলাদা দ্বিপক্ষীয় বৈঠক স্যান্ডটন কনভেনশন সেন্টারে অনুষ্ঠিত হয়েছে। বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী পারস্পরিক স্বার্থে দ্বিপক্ষীয় ও বাণিজ্য সম্পর্ক বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়ে দেশগুলো থেকে ব্যাপক বিনিয়োগের আহ্বান জানিয়েছেন।

একই স্থানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে নিউ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের প্রেসিডেন্ট দিলমা ভানা রুসেফের দ্বিপক্ষীয় বৈঠকও অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাসস

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত