সিঙ্গাপুরে বিএনপি জাপা দেশে গুঞ্জন কৌতূহল

আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৩, ০৪:৪৯ এএম

সরকার পতনের এক দফার চূড়ান্ত আন্দোলনের মধ্যে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, দলটির স্থায়ী কমিটির একাধিক জ্যেষ্ঠ সদস্য সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন। সেখানে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপির নেতাদের বৈঠকের গুঞ্জন ছড়িয়েছে রাজনীতিতে। বিএনপি নেতারা সিঙ্গাপুরে থাকাবস্থায় জাতীয় পার্টির এক শীর্ষ নেতা সিঙ্গাপুরে গেছেন, যিনি বিগত কয়েক মাস ধরে সরকারবিরোধী নানা বক্তব্য দিয়ে যাচ্ছেন। এর আগে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ভারত সফর করে এসেছেন। ফলে বিএনপি নেতাদের সঙ্গে জাতীয় পার্টির ওই নেতার বৈঠকের গুঞ্জন ডালপালা ছড়াচ্ছে।

এমনও গুজব ছড়িয়েছে যে, বাংলাদেশে সব দলের অংশগ্রহণে আগামীতে যে সরকার আসতে যাচ্ছে, সে সরকারে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা জিএম কাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনা করে ভারত সরকার তাকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। সরকারের ভিত কাঁপাতে বিএনপি-জাতীয় পার্টির এ যৌথ ‘বিদেশ মিশন’ এমন গুজবও রয়েছে। এ নিয়ে আওয়ামী লীগ নেতাদের কয়েকজন কথা বললেও বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না সরকার।

অবশ্য বিএনপি নেতারা বলছেন, সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকে সরকার পতনের এক দফা দাবিতে রাজপথে রাজনৈতিক কর্মসূচিকেন্দ্রিক ব্যস্ততা বাড়বে। এরই ফাঁকে জ্যেষ্ঠ নেতারা আগেভাগেই শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নিতে চান। এ কারণেই নেতাদের সিঙ্গাপুর-যাত্রা।

এর বাইরে রাজনৈতিক অঙ্গনে আরও গুঞ্জন রয়েছে যে, সিঙ্গাপুরে তারেক রহমানের বিশেষ প্রতিনিধির সঙ্গে বৈঠক করবেন সেখানে চিকিৎসার জন্য যাওয়া বিএনপি নেতারা। এমনও গুঞ্জন চলছে যে, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শর্মিলা রহমানের সঙ্গে বিএনপি নেতারা বৈঠক করছেন।

আপাতত এসব গুঞ্জন চললেও হয়তো সময়ের ব্যবধানে পরিষ্কার হবে বিএনপির বৈঠকের গুঞ্জন ‘নেতাদের সিঙ্গাপুর গমন স্রেফ চিকিৎসা নাকি কোনো ষড়যন্ত্রের মিশন’।

গত ২৪ আগস্ট চিকিৎসার জন্য মির্জা ফখরুল তার স্ত্রী রাহাত আরা বেগম ও তার ছোট মেয়েসহ সিঙ্গাপুরে যান। সেখানে ন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি হাসপাতালে তার চিকিৎসা হয়। সিঙ্গাপুরের র‌্যাফেলস হাসপাতালে রাহাত আরা বেগমের অস্ত্রোপচার হয়েছিল। ফলোআপের জন্য তাকেও ওই হাসপাতালে যেতে হয়।

এরপর ২৬ আগস্ট সিঙ্গাপুরে যান বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস ও তার স্ত্রী আফরোজা আব্বাস। তার আগে হঠাৎ করে মস্তিষ্কে টিউমার ধরা পড়ায় গত ২৭ জুন সিঙ্গাপুর যান বিএনপির স্থায়ী কমিটির জ্যেষ্ঠ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন। সেখানে তার অস্ত্রোপচার হয়েছে। এখন চলছে রেডিওথেরাপি। সবার আগে চিকিৎসার জন্য থাইল্যান্ড যান স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু। সেখান থেকে লন্ডন হয়ে বর্তমানে সিঙ্গাপুরে অবস্থান করছেন তিনি। তার চিকিৎসা চলমান থাকায় আপাতত দেশে ফেরার সম্ভাবনা খুবই কম।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির সদস্য আবদুল আউয়াল মিন্টু বর্তমানে থাইল্যান্ডে অবস্থান করছেন। দলের বেশ কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা চেকআপের জন্য সিঙ্গাপুরে যাওয়ার পর গুঞ্জনের বিষয়ে জানতে চাইলে ফোনে দেশ রূপান্তরকে তিনি বলেন, ‘মানুষের অসুস্থতা ও চিকিৎসা নিয়ে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যা করছে তা নোংরামি ও অপকৌশল। খুন, গুম, হামলা, মামলা, শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের পর এখন সরকার বিএনপি নেতাদের চরিত্র হননে নেমেছে।’

ভারতের ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের সঙ্গে বিএনপি নেতাদের বৈঠকের বিষয়ে জানতে চাইলে মিন্টু বলেন, ‘এখন পুরো বিশ্ব হাতের মুঠোয়। আমরা যে মোবাইল ফোন ব্যবহার করি তার মাধ্যমে সারা বিশে^র সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব। এজন্য বিদেশে যেতে হয় না। দেশে বসেই ভার্চুয়ালি আলোচনা করা সম্ভব। তাছাড়া ভারতসহ বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো ও আন্তর্জাতিক সংস্থার ঢাকায় অফিস রয়েছে। তাদের সঙ্গে আমাদের নিয়মিত বৈঠক হয়। তারা তাদের সরকারের হয়ে বিএনপির মনোভাব জানতে চান। আমরা তাদের সর্বশেষ পরিস্থিতি অবহিত করি। বন্ধুপ্রতিম দেশগুলো আগামী নির্বাচন নিয়ে তাদের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন স্পষ্টভাবে।’

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের হয়ে ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রক্ষাকারী প্রবাসী বিএনপির এক নেতা ফোনে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আলোচনা হতেই পারে। কিন্তু আগামী সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভারত তাদের অবস্থান পরিষ্কার করেছে। তাই তাদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ কিংবা জাতীয় পার্টির মতো বিদেশে বৈঠক করার প্রয়োজন নেই। তাছাড়া ঢাকায় ভারতীয় হাইকমিশনার রয়েছেন। আগামী নির্বাচন নিয়ে ভারতের অবস্থানের বিষয়ে ভারতীয় হাইকমিশনার প্রণয় ভার্মা বিএনপি নেতাদের দাওয়াত দিয়ে পরিষ্কার করেছেন।’

এরই মধ্যে এক অনুষ্ঠানে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘আজকে বিএনপি নেতারা দল বেঁধে গেছেন সিঙ্গাপুরে। আবার শুনেছি জাতীয় পার্টির এক গ্রুপও গেছে। ভালো, আলাপ-আলোচনা করুক। রাজনৈতিক আলোচনা দেশে হোক, বিদেশে হোক করবে এটা তাদের অধিকার। তবে ২০১৩-১৪ সালের মতো আগুন নিয়ে বাস পোড়ানো, মানুষ পোড়ানো, রাস্তা পোড়ানো, গাছ পোড়ানো এ রাজনীতি থেকে বিরত থাকুন।’ আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ও তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ বলেছেন, বিএনপি নেতারা কি আদৌ চিকিৎসা নিতে গেলেন নাকি আবার কোনো ষড়যন্ত্র করতে একসঙ্গে সিঙ্গাপুর গেলেন এটি এখন অনেকের প্রশ্ন।

আওয়ামী লীগের দুই নেতার এ বক্তব্যের জবাবে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মো. শাহজাহান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জনবিচ্ছিন্ন আওয়ামী লীগ গত ১৪ বছর ধরে বিরোধী নেতাকর্মীদের খুন, গুম, হামলা, মামলাসহ নানা শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন করেছে। এখন অসুস্থ নেতাদের চরিত্র হননে নেমেছে। আমি নিজেও অসুস্থ। গত কয়েক দিন আগে ভারতে চিকিৎসার জন্য গিয়েছিলাম সস্ত্রীক।’ সরকার শিগগিরই মিথ্যাবাদী রাখালের পরিণতি ভোগ করবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

‘সিঙ্গাপুরে জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গে বিএনপি নেতাদের বৈঠক হয়েছে’ আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের এমন মন্তব্যের জবাবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘উনি যদি জেনেই থাকেন সিঙ্গাপুরে জাতীয় পার্টির নেতাদের সঙ্গে আমাদের বৈঠক হয়েছে; তাহলে কখন, কোথায়, কার কার সঙ্গে বৈঠক হয়েছে তা স্পষ্ট করুক। ছবি প্রকাশ করুক।’

এদিকে মুজিবুল হক চুন্নুসহ জাতীয় পার্টির দুই নেতা সিঙ্গাপুর গেছেন। সেখানে তাদের সঙ্গে বিএনপি নেতাদের বৈঠক হয়েছে বলে গুঞ্জন রয়েছে। তবে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের ঘনিষ্ঠ এক নেতা বলছেন, চুন্নু সস্ত্রীক থাইল্যান্ড গিয়েছিলেন। সোমবার তিনি চলে এসেছেন। অবশ্য এ বিষয়ে যোগাযোগের চেষ্টা করে চুন্নুর বক্তব্য জানা যায়নি।

সরকার ও আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারকরা মনে করেন, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির কূটনৈতিক সম্পর্ক এখনো এত শক্তিশালী হয়ে ওঠেনি যে, চাইলেই সরকারকে বেকায়দায় ফেলে দিতে পারবে। কূটনীতি বোঝা ও বিদেশ লবি মেইনটেইন করার নেতারও অভাব রয়েছে দল দুটিতে। তারা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাতারাতি পরিস্থিতি বদলে দিতে পারে যে কেউ, সেই দুর্বল পরিস্থিতিতেও নেই সরকার। তারা মনে করেন, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির বিদেশ সফর ঘিরে মূলত বিভিন্ন মহল গুজব ছড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে। দল দুটির বিদেশ সফর এর বাইরে আর কিছুই নয়।

আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারক পর্যায়ের একাধিক নেতা বলেন, সরকারবিরোধী সব মহলের কর্মকা-ের ওপর সরকারের সতর্ক দৃষ্টি রয়েছে।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের ভারত সফর নিয়ে দলটির গুরুত্বপূর্ণ একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভারত সফর শেষে দেশে ফিরে এসে সফরসংক্রান্ত কোনো আলোচনা রাজনৈতিক সহকর্মীদের সঙ্গে করেননি কাদের। তবে তাকে যে মুডে দেখা যাচ্ছে তাতে তিনি যে খুবই ভালো মেজাজে আছেন সেটা বোঝা যায়।

দলটির ওই নেতারা বলেন, তারা যতটা বুঝতে পারছেন, দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের ব্যাপারে রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও জাতীয় পার্টির অবস্থান নিয়ে ভারত সরকারের প্রতিনিধির সঙ্গে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়েছে। জাতীয় পার্টি আগামী নির্বাচনে অংশ নেবে জিএম কাদের এ নিশ্চয়তা দিয়ে গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য সরকারের যেসব পদক্ষেপ নেওয়া দরকার, সেটা ভারত সরকারকে অবহিত করেছেন।

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের ভারত সফর সম্পর্কে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারাও মনে করেন, প্রতিবেশী দেশের সরকার বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতেই জিএম কাদেরকে আমন্ত্রণ জানিয়েছে। পাশাপাশি সংসদের বিরোধী দল হিসেবে জাতীয় পার্টির দায়িত্ব-কর্তব্য পালনে ভারত পরামর্শ দিয়েছে তাকে।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, জাতীয় পার্টিকে নির্বাচন প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতেও পরামর্শ দিয়েছে ভারত সরকার। তিনি বলেন, এটি সরকারের জন্য ইতিবাচক।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ও আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো দলের নেতা বিদেশ সফরে যেতেই পারেন। তবে সব সফরই যে অর্থবহ, এটা আমি মানি না। ফলে কারা কোথায় গেল তা নিয়ে সরকার ততটা কৌতূহলী বলে মনে করি না।’

তিনি বলেন, ‘সরকার তো এত দুর্বল নয় যে, কেউ বিদেশ গেল আর দেশে ফিরে সব ওলটপালট করে দিল। বিএনপির নেতাদের সিঙ্গাপুর সফর ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যানের ভারত সফর কোনোটাকে গুরুত্বপূর্ণ সফর ভাবে না আওয়ামী লীগ।’

দলটির আন্তর্জাতিকবিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ সফর কেন, কী, কিছুই জানি না। জানতে চাইও না।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত