আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলো নানামুখী চাপ দিচ্ছে। দেশগুলো নির্বাচন নিয়ে বিভিন্ন সবক ও পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যেই ঢাকা সফরে আসছেন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় চরম বৈরী সম্পর্কের দেশ রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ। সবকিছু ঠিকঠাক থাকলে আগামী ৭ সেপ্টেম্বর দুদিনের সফরে তিনি বাংলাদেশে আসবেন। রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এখান থেকে সরাসরি যোগ দেবেন দিল্লিতে অনুষ্ঠেয় জি-২০ সম্মেলনে।
স্বাধীনতার পর এই প্রথমবারের মতো কোনো রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর সফর ঘিরে একদিকে যেমন প্রস্তুতি চলছে, অন্যদিকে তেমনি কিছুটা রাখঢাকও করতে চাচ্ছে সরকারপক্ষ। কারণ পশ্চিমা দেশগুলো এ সফর নজরের মধ্যে রাখছে। এমনিতেই বাংলাদেশের নির্বাচন নিয়ে চীনের মন্তব্য এবং গত কয়েক বছরে দেশে চীনের অর্থায়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নসহ চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন ওয়াশিংটন ও পশ্চিমাদের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই মনে করা হচ্ছে, হঠাৎ করে ল্যাভরভের এ সফর নতুন কোনো বার্তা হয়ে আসতে পারে। পশ্চিমারা বিষয়টি নজরে রাখছে বলে মনে করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ল্যাভরভের সফরের বিষয়টি চূড়ান্ত। রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘ সময়ের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের পাশাপাশি স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। আবার চলমান ভূরাজনৈতিক মেরূকরণে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এমন পরিস্থিতিতে ঢাকা নিজেদের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো নিয়ে কাজ করছে।
ল্যাভরভের সফরের বিষয়ে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন সম্প্রতি সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, ‘রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাংলাদেশ সফরের সম্ভাবনা রয়েছে। আমরা টাইমিং নিয়ে কাজ করছি। তার সঙ্গে দক্ষিণ আফ্রিকার জোহানেসবার্গে ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে দেখা হয়েছে। তবে আলোচনার মতো প্রেক্ষাপট হয়নি। এখনো সময় চূড়ান্ত হয়নি।’
কূটনৈতিক একাধিক সূত্র বলেছে, বৈশ্বিক সংকটময় পরিস্থিতি এবং বাংলাদেশের ওপর পশ্চিমাদের খড়গের মধ্যে এ সফরটি হবে ‘হাইলি পলিটিক্যাল’। ইউক্রেন যুদ্ধের ফলে রাশিয়াকে ঘিরে যে পশ্চিমা বিরোধ তৈরি হয়েছে এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোর মধ্যে যে শক্ত অবস্থান দেখা যাচ্ছে, তাদের কাছে বাংলাদেশও এখন গুরুত্বপূর্ণ। কাজেই ঢাকা ও মস্কোর জন্য এ সফরটি সময়ের দিক দিয়ে ঐতিহাসিক বিবেচিত হলেও রাজনৈতিক ও ইন্দোপ্যাসিফিক কৌশলের কারণে আরও বেশি ঐতিহাসিক হতে পারে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাশিয়ার পক্ষ থেকেই এ সফরের প্রস্তাব এসেছে। এর আগেও ঢাকায় রাশিয়ার দূতাবাস থেকে যোগাযোগ করা হচ্ছিল। এবারও রুশ দূতাবাস থেকেই উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ঢাকাও ইতিবাচক সাড়া দিয়েছে। যদিও সফরের সময়সূচি এখনো ঠিক হয়নি। সফরটি নিয়ে পশ্চিমাদের উদ্বেগ দেখা দেওয়া স্বাভাবিক। যদিও বাংলাদেশ নিজেদের স্বার্থের বিষয়গুলোই বিবেচনা করছে। তবে দীর্ঘ সময়ের বন্ধু ও উন্নয়ন সহযোগী দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর প্রথম সফরকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে বাংলাদেশ। এর পাশাপাশি দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক, রূপপুর বিদ্যুৎ প্রকল্প এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগ পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। আর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে রোহিঙ্গা ইস্যু আলোচনায় প্রাধান্য দেওয়া হবে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর থেকেই তা বন্ধে শান্তি আলোচনার আহ্বান জানিয়ে আসছেন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ল্যাভরভের সফরেও বিষয়টি আলোচনায় আসবে। এ যুদ্ধের ফলে বৈশ্বিক অর্থনীতি ও ভূরাজনৈতিক ইস্যুতে যেসব নেতিবাচক বিষয় তৈরি হয়েছে তাও আলোচনা করবে বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে এ সফরটি ঢাকা ও রাশিয়ার জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
কূটনৈতিক পর্যবেক্ষক ও কূটনৈতিক সূত্রগুলো মনে করছে, স্বাধীনতার পর এই প্রথমবারের মতো কোনো রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ঢাকা সফর অবশ্যই মাইলফলক হয়ে থাকবে। যদিও ঢাকা প্রকাশ্যে বিষয়টা সাদামাটাভাবেই নিচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ও সাবেক রাষ্ট্রদূত ওয়ালিউর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাশিয়া বরাবরই বাংলাদেশের মিত্র। আমাদের দেশে তো প্রায় সব দেশেরই শীর্ষ পর্যায়ের প্রতিনিধিরা সফর করছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মতো বড় দেশের শীর্ষ ব্যক্তিরা আসছেন। যেকোনোভাবেই হোক রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের ঢাকা সফর অবশ্যই একটি বড় খবর। আবার তিনি জি-২০ সম্মেলনে যোগ দিতে দিল্লি যাবেন ঢাকা হয়ে। আমি মনে করি ল্যাভরভের এ সফর ঘিরে অবশ্যই সরকারপক্ষের প্রস্তুতির বিষয় থাকতে হবে। কারণ মিত্র দেশ হলেও বাংলাদেশের স্বার্থ সবার আগে দেখতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘ঢাকা সফরের পর রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি যাবেন এবং সেখানে বিশ্বনেতাদের সঙ্গে বৈঠক হবে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে তৈরি বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতির শিকার সবাই।’
মুক্তিযুদ্ধের সময় তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে জাতিসংঘে সোচ্চার ছিল উল্লেখ করে ওয়ালিউর রহমান বলেন, ‘তাদের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে স্বাধীনতা ত্বরান্বিত হয়েছে। এটা মনে রাখতে হবে এবং মূল্যায়ন করতে হবে। তবে এখন প্রেক্ষাপট পরিবর্তন হয়েছে। একটি স্বাধীন সার্বভৌম দেশ ইউক্রেনকে রাশিয়া যেভাবে আক্রমণ করল তা মানার মতো নয়। আমি মনে করি রাশিয়াকে এটা আনুষ্ঠানিকভাবে বলা উচিত। কোনো বন্ধুরাষ্ট্র যদি ভুল করে তা তো ধরিয়ে দেওয়া যেতেই পারে।’
সরকারের ওপর আগামী নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা দেশগুলোর চাপ এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে রাশিয়ার বৈরী সম্পর্কের মধ্যে এ সফরকে চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে সাবেক এ রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমি তা মনে করি না। বাংলাদেশ তার স্বার্থই দেখবে।’
এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘প্রথম থেকেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী যুদ্ধ বন্ধের তাগিদ দিয়ে আসছেন। আমি মনে করি ল্যাভরভের সফরেও যুদ্ধ বন্ধের উদ্যোগ নেওয়ার ওপর জোর দেওয়া যায়। কীভাবে যুদ্ধ বন্ধ করা যায়, তা নিয়ে আলোচনা করা উচিত। কারণ রাশিয়া-বাংলাদেশের বন্ধুত্ব পরীক্ষিত। নতুন করে এখানে পরীক্ষা দেওয়ার কিছু নেই। আর যুক্তরাষ্ট্র কী মনে করল, কী নজরদারি করল, সেটাও বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কিছু আমি দেখছি না।’
তিনি আরও বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যুতে জোরালো আলোচনা হতে হবে। কারণ ইদানীং রাশিয়ার সঙ্গে মিয়ানমারের সম্পর্ক বেশ জোরালো হচ্ছে। নেপিদোর উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তারা মস্কো ঘুরে এসেছেন। রাশিয়াকে রোহিঙ্গা ইস্যুতে চাপ দিতে হবে। কারণ ভূরাজনৈতিক কারণে রাশিয়ারও বাংলাদেশকে প্রয়োজন। সেটা রাশিয়াও জানে। ফলে নিজেদের স্বার্থ নিয়ে জোরালো আলোচনা হতে পারে।’
জানা গেছে, এ সফরে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রী ল্যাভরভ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন। এ ছাড়া পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেনের সঙ্গে বৈঠক করবেন।
