হোয়াটসঅ্যাপ, ফেসবুক, মেসেঞ্জারের আগে চিঠিই ছিল যোগাযোগের সহজ মাধ্যম। রাষ্ট্রীয়, প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত যোগাযোগের জন্য সবাই ছিলেন চিঠির ওপর নির্ভরশীল। আজ বিশ্ব চিঠি লেখা দিবসে প্রখ্যাত ব্যক্তিদের লেখা কিছু বিখ্যাত চিঠি সম্পর্কে জানব।
মিসরের শাসকের প্রতি মহানবীর (সা.) চিঠি
মহানবী (সা.) হুদাইবিয়ার সন্ধির পরে (৬২৮ খ্রিস্টাব্দ) ইসলাম গ্রহণের জন্য বিশ্বের অনেক শাসকের কাছে চিঠি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন। মুহাম্মদ (সা.) মিসর, ইথিওপিয়া, সিরিয়া, বাহরাইন, ওমানসহ বিভিন্ন অঞ্চলের শাসকদের কাছে এই চিঠি পাঠান। মিসরের শাসক আল-মুকাকিসকে লেখা চিঠিটি এখনো সংরক্ষিত আছে। তিনি চিঠিতে আল-মুকাকিসকে শান্তি প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে ইসলাম গ্রহণ করে আল্লাহ প্রবর্তিত আইন অনুসারে রাজ্য পরিচালনার আহ্বান জানান। চিঠিতে তিনি আল-মুকাকিসকে আল্লাহর ইবাদত করার দাওয়াত দেন এবং আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করতে নিষেধ করেন। মিশরের শাসক চিঠি গ্রহণ করে যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করেন। আল-মুকাকিস মহানবীর (সা.) চিঠির উত্তরও পাঠান। এই ফিরতি চিঠি তিনি আল্লাহর নামে শুরু করেন।
নার্গিসকে লেখা কবি নজরুলের চিঠি
কবি কাজী নজরুলের জীবনে প্রথম প্রেমাস্পদ ছিলেন সৈয়দা খাতুন। নজরুল তার নাম রাখেন নার্গিস। নার্গিসের মামার মাধ্যমে তার সঙ্গে নজরুলের পরিচয় হয়। তাদের আকদও সম্পন্ন হয়। কিন্তু বিবাহের কাবিননামায় নার্গিসের মামা আলি আকবরের জুড়ে দেওয়া শর্তে ক্ষিপ্ত হয়ে কবি ওইদিন রাতেই নার্গিসকে রেখে চলে আসেন। পরে নার্গিস কবিকে অসংখ্য চিঠি দিলেও অভিমানী কবি তার সরাসরি উত্তর দেননি। বিভিন্ন গীতিকবিতায় নার্গিসের চিঠির জবাব দিলেও সরাসরি চিঠি লেখেন দীর্ঘ ১৫ বছর পর। চিঠির প্রথম বাক্যে তিনি লেখেন, ‘তোমার পত্র পেয়েছি সেদিন নব বর্ষার নবঘন-সিক্ত প্রভাতে।’ চিঠিতে তিনি নার্গিসের সুখ এবং শান্তি কামনা করেন। এই চিঠিতেই কবি লেখেন, ‘তুমি ভুলে যেওনা আমি কবি, আমি আঘাত করলেও ফুল দিয়ে আঘাত করি।’
রবীন্দ্রনাথের চিঠি
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠিও কবিতার মতো মাধুর্যময়। তার চিঠিগুলোর সংকলনও প্রকাশিত হয়েছে। তার চিঠি সংকলন ‘ছিন্নপত্রে’ প্রকাশিত হয়েছে তৎকালীন পূর্ব বাংলার রূপলাবণ্য। তিনি লিখেছেন মৃণালিনী দেবী, মৈত্রেয়ী দেবী, রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথ চৌধুরী, অন্নদাশঙ্কর রায়, জগদীশচন্দ্র বসু, বলাইচাঁদ মুখোপাধ্যায় প্রমুখকে। রবীন্দ্রনাথকে লিখেছিলেন স্বয়ং বিজ্ঞানী আইনস্টাইন। জার্মান ভাষায় লেখা তার দুটি চিঠি শান্তিনিকেতনের রবীন্দ্রভবন সংগ্রহশালায় সংরক্ষিত আছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে অসংখ্য চিঠি লিখেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ তার চিঠিতে অধিকাংশ সময় মৃণালিনীকে ‘ভাই ছুটি’ নামে সম্বোধন করেছেন। ভ্রমণপথে যাত্রার সময় আঙুলের চোট থেকে শুরু করে মশার যন্ত্রণা, দূর দেশ থেকে সন্তানদের প্রতি ভালোবাসাসহ নানা দিক উঠে এসেছে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠিতে।
আইনস্টাইনকে সত্যেন বোসের চিঠি
সতে্যন্দ্রনাথ বোস ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক। গবেষণা করেছেন বিজ্ঞানী ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের বিকিরণ তত্ত্ব নিয়ে। তার গবেষণা আর্টিকেলে রূপান্তর করেন। তা প্রকাশের জন্য চিঠি লিখেন বিজ্ঞানী আইনস্টাইনকে। তিনি আইনস্টাইনকে অনুরোধ করেন তার গবেষণাটি যাতে জার্মান ভাষায় অনুবাদ করে প্রকাশ করা হয়। আইনস্টাইন চিঠি পেয়ে গবেষণাটি অনুবাদ করেন এবং সত্যেন বোসের পছন্দের জার্নালেই প্রকাশের ব্যবস্থা করেন। তারপর আইনস্টাইন তাকে ইউরোপে আমন্ত্রণ জানান। আইনস্টাইনের সঙ্গে দেখা করার আগে প্যারিসে বিজ্ঞানী মারি কুরির ল্যাবে তিনি কাজ করেছিলেন ছয় মাস। দুবছর পর দেশে ফিরে তিনি আইনস্টাইনের রিকোমেন্ডেশন লেটারের ফলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিজিক্স ডিপার্টমেন্টের প্রধানের দায়িত্ব দেন তৎকালীন ভিসি। বিজ্ঞানী সত্যেন বোসের সেই চিঠির কারণে জন্ম হয় কোয়ান্টাম স্ট্যাটিস্টিকসের।
হিটলারকে মহাত্মা গান্ধীর চিঠি
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ না করার জন্য নাৎসি বাহিনীকে চিঠি দিয়েছিলেন অহিংস আন্দোলনের পুরোধা পুরুষ মহাত্মা গান্ধী। কিন্তু সেসব চিঠি পৌঁছায়নি হিটলারের কাছে। চিঠিতে তিনি হিটলারকে বন্ধু বলে সম্বোধন করেন। তিনি লেখেন, ‘আমি আপনাকে সৌজন্যের খাতিরে বন্ধু সম্বোধন করছি না। আমি আপনার শত্রু নই। আমি আমার জীবনের ৩৩ বছর ব্যয় করেছি ধর্ম, বর্ণ, জাতি নির্বিশেষে সব মানুষের মধ্যে বন্ধুত্ব সৃষ্টির প্রচেষ্টায়।’ তিনি ১৯৩৯ এবং ১৯৪০ সালে মোট দুটি চিঠি লেখেন হিটলারকে। চিঠিতে তিনি যুদ্ধ বন্ধ করার আহ্বান জানান। তিনি হিটলারকে লেখেন, ‘আপনার নৃশংসতা দেখে মনে হচ্ছে, এই সমস্ত কাজ আপনি ধর্ম বলে জ্ঞান করেন।’ তিনি হিটলারকে যুদ্ধ বন্ধ করার এবং মানবতাকে বাঁচানোর আহ্বান জানান। তিনি ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে তার নিরস্ত্র যুদ্ধ সম্পর্কেও লেখেন। যদিও ব্রিটিশদের হস্তক্ষেপের কারণে সে চিঠি পৌঁছায়নি হিটলারের কাছে। গান্ধীর প্রথম চিঠি লেখার ৩৯ দিন পর পোল্যান্ড আক্রমণ করে জার্মান। ফলে শুরু হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। যার ভয়াবহ ফল আজও ভোগ করে চলেছে গোটা বিশ্ব।