ইউনূসবিরোধী বিবৃতিতে না ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেলের

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০১:৫৬ এএম

নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসের বিরুদ্ধে চলমান মামলার বিচার কার্যক্রম স্থগিতের অনুরোধ জানিয়ে বিশ^নেতাদের খোলাচিঠির বিষয়ে পাল্টা প্রতিবাদ বিবৃতিতে স্বাক্ষর করবেন না বলে জানিয়েছেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া। বিচারের নামে ড. ইউনূসকে বিচারিক হয়রানি করা হচ্ছে বলে মনে করছেন রাষ্ট্রপক্ষের এই আইন কর্মকর্তা। তিনি বলেছেন, ড. ইউনূসের মামলা নিয়ে বিশ্ব নেতাদের উদ্বেগ ও বিবৃতি সঠিক। তাই বিবেকের তাড়নায় এর পাল্টা বিবৃতিতে স্বাক্ষর করবেন না। তবে পাল্টা বিবৃতি বা এতে স্বাক্ষরের বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেলের কার্যালয় থেকে আইন কর্মকর্তাদের কোনো নির্দেশনা দেওয়া হয়নি বলে দেশ রূপান্তরকে জানান অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন। অন্যদিকে সাধারণ আইনজীবীদের ব্যানারে বিবৃতিতে স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন একাধিক আইন কর্মকর্তা। এদিকে গ্রামীণ টেলিকমের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ড. মুহাম্মদ ইউনূসের বিরুদ্ধে শ্রম আইন লঙ্ঘনের মামলায় কল কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের পক্ষে আরেকজন আইনজীবী নিযুক্ত করায় শুনানি না করার ঘোষণা দিয়েছিলেন এই মামলায় প্রথম নিযুক্ত আইনজীবী মো. খুরশীদ আলম খান। গতকাল সোমবার তিনি দেশ রূপান্তরকে এ কথা বললেও পরে নতুন করে শুনানিতে অংশ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘কলকারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমি একক আইনজীবী হিসেবে আগামীকাল (মঙ্গলবার) থেকে শুনানি করব।’

শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জ্যেষ্ঠ প্রসিকিউটর সৈয়দ হায়দার আলীকে গত সপ্তাহে নিযুক্ত করে বলে গত রবিবার দেশ রূপান্তরকে তিনি (হায়দার আলী) জানান। তবে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এ সিদ্ধান্ত বহাল থাকলে এ মামলায় শুনানিতে অস্বীকৃতি জানান অ্যাডভোকেট খুরশীদ। ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালতে মামলাটিতে সাক্ষ্য গ্রহণ চলছে। 

২০১৭ সালের ৪  জানুয়ারি ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল হিসেবে নিয়োগ পান এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া। রাষ্ট্রের প্রধান আইন কর্মকর্তা (অ্যাটর্নি জেনারেল) ছাড়াও এই মুহূর্তে উচ্চ আদালতে তিনজন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল, ৬০ জন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ও ১৪৯ জন সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেলসহ রাষ্ট্রপক্ষে ২১৩ জন আইন কর্মকর্তা মামলা পরিচালনা করছেন। রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, গত রবিবার তিনি অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ের আইন কর্মকর্তাদের হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে বিবৃতিতে স্বাক্ষরের নির্দেশনা পান। এ জন্য গতকাল বিকেল ৪টা পর্যন্ত সময় বেঁধে দেওয়া হয়। তবে তিনি স্বাক্ষর না করে নিজেকে বিরত রাখেন। বিবেকের তাড়নায় এবং ব্যক্তিগতভাবে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বলে জানান। এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া বলেন, ‘১০৭ জনের বেশি নোবেল বিজয়ী, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট, পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা উদ্বেগ প্রকাশ করে যে বিবৃতি দিয়েছেন, তাদের সঙ্গে আমি একমত। আমার কাছে মনে হয়েছে এটা (ড. ইউনূসের বিচার) একধরনের বিচারিক হয়রানি। তাই আইনজীবীদের এ ধরনের প্রতিবাদ বিবৃতি সঠিক মনে হয়নি।’

রাষ্ট্রপক্ষের এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘শ্রম আদালতে প্রচুর পুরাতন মামলা বিচারাধীন আছে। এটার (ড. ইউনূসের) আগেও অনেক মামলা আছে। কিন্তু এই মামলা দ্রুতগতিতে চলছে। এটা নিয়ে আমার প্রশ্ন রয়েছে। যে কারণে বিবৃতিতে স্বাক্ষর করিনি।’

এ প্রসঙ্গে অ্যাটর্নি জেনারেল এ এম আমিন উদ্দিন বলেন, ‘আমরা কোনো বিবৃতি দিইনি। তৈরিও করিনি। এটা উনি (এমরান আহম্মদ ভূঁইয়া) কেন করেছেন তা উনিই বলতে পারবেন। তার হয়তো কোনো উদ্দেশ্য থাকতে পারে। কিন্তু তাকে কি কেউ বলেছে যে স্বাক্ষর করতেই হবে? তিনি বিবৃতিটা দেখাক না। তাহলেই তার বক্তব্য সঠিক কি না, জানা যাবে। অ্যাটর্নি জেনারেল কার্যালয়ে কেউ তো বিবৃতিই তৈরি করেনি।’

সাধারণ আইনজীবীদের ব্যানারে বিবৃতিতে স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে কি না, তা তার জানা নেই বলেও জানান এ এম আমিন উদ্দিন। তবে রাষ্ট্রপক্ষের একাধিক আইন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ড. ইউনূসের মামলা নিয়ে বিশ্বনেতাদের বিবৃতির প্রতিবাদে সাধারণ আইনজীবীদের ব্যানারে বিবৃতিতে স্বাক্ষর নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে অনেক আইনজীবী তাতে স্বাক্ষর করেছেন।

ড. ইউনূসের মামলায় আইনজীবী নিয়োগের বিষয়ে অ্যাডভোকেট খুরশীদ আলম খান গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, দুই বছর আগে এই মামলার শুরু থেকে বাদীপক্ষে তাকে আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। মামলাটি এখন সাক্ষ্যগ্রহণের পর্যায়ে রয়েছে। এই পর্যায়ে এসে মামলায় একপক্ষে যদি দুজন আইনজীবী থাকেন তাহলে তিনি শুনানি করবেন না। নিজেকে প্রত্যাহার করে নেবেন।

এই আইনজীবী আরও বলেন, ‘শুনেছি মন্ত্রণালয় থেকে একজন আইনজীবী দেওয়া হয়েছে। এখন যদি দুজন আইনজীবী থাকেন, তাহলে আমি মামলা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। ইতিমধ্যে বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে অবহিত করেছি। তারা কী সিদ্ধান্ত দেয়, সেটি দেখব। যদি ওই সিদ্ধান্তই (দুজন আইনজীবী) বহাল থাকে, তাহলে আমি শুনানি করব না।’

গ্রামীণ টেলিকমের শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনে নির্দিষ্ট লভ্যাংশ জমা না দেওয়া, শ্রমিকদের চাকরি স্থায়ী না করা এবং গণছুটি নগদায়ন না করাসহ শ্রম আইনের সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ধারায় অভিযোগ এনে ড. ইউনূস, প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আশরাফুল হাসান, দুই পরিচালক নুরজাহান বেগম ও মো. শাহজাহানের বিরুদ্ধে ২০২১ সালের ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকার শ্রম আদালতে মামলা করে কল কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন অধিদপ্তর। গত ৬ জুন ঢাকার তৃতীয় শ্রম আদালত অভিযোগ গঠন করে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরুর আদেশ দেয়। অভিযোগ গঠনের আদেশ বাতিল চেয়ে হাইকোর্টে আবেদন করেন ড. ইউনূস। গত ২৩ জুলাই অভিযোগ গঠন বাতিল প্রশ্নে রুল দেয় হাইকোর্ট।

হাইকোর্টের এ আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে আবেদন করে রাষ্ট্রপক্ষ। গত ৩ আগস্ট আপিল বিভাগ মামলার কার্যক্রম বাতিল প্রশ্নে রুলের শুনানি করতে বিচারপতি এস এম কুদ্দুস জামানের নেতৃত্বাধীন বেঞ্চ নির্ধারণ করে দিয়ে দুই সপ্তাহের মধ্যে রুল নিষ্পত্তি করতে আদেশ দেয়। ১৭ আগস্ট হাইকোর্ট রুল খারিজ করে রায় দেয়। ২২ আগস্ট ড. ইউনূসসহ চারজনের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। ড. ইউনূস ও শাহজাহানকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দিয়েছে আদালত।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত