লৌকিক চাঁদ অলৌকিক চাঁদ

আপডেট : ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১০:৪৯ পিএম

২০২৩ সালের ২৩ আগস্ট ভারতের চন্দ্রযান-৩ চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে অবতরণ করে। ভারত চাঁদের দক্ষিণ মেরুতে সফল সফট ল্যান্ডিং করার জন্য প্রথম দেশ এবং চাঁদের পৃষ্ঠে সফল সফট ল্যান্ডিং করা চতুর্থ দেশ হয়ে ওঠার পর, ২৬ আগস্ট বিদেশ সফর সেরে ফিরেই সোজা বেঙ্গালুরু গিয়ে ইসরোর বিজ্ঞানীদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে তাদের অভিনন্দন জানান প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তখনই বেঙ্গালুরুতে ওঝঞজঅঈ সদর দপ্তরে এসে তিনি বলেন, যেখানে ল্যান্ডার অবতরণ করেছে, সেই বিন্দুটি শিবশক্তি পয়েন্ট নামে পরিচিত হবে।

হিন্দু চাঁদ

নিঃসন্দেহে চন্দ্রযান-৩ প্রেরণের সফলতা ভারতের মহাকাশ গবেষকদের যে কেবল বাড়তি সাফল্য এনে দিয়েছে তা নয়, আপামর ভারতবাসী এর জন্য গর্ব অনুভব করছে। কিন্তু যখনই স্থানটিকে ‘শিবশক্তি পয়েন্ট’ নামকরণে ভূষিত করা হলো তখনই চাঁদ হয়ে গেল হিন্দুত্ববাদীদের তুরুপের তাস।

স্বামী চক্রপাণি মহারাজ, যিনি নিজেকে অখিল ভারতীয় হিন্দু মহাসভার সভাপতি বলে দাবি করেছেন। তার কথায়, ‘সংসদে চাঁদকে হিন্দু সনাতন রাষ্ট্র বলে ঘোষণা করা হোক। চন্দ্রযান ৩-এর অবতরণের স্থান শিবশক্তি পয়েন্টে সেই দেশের রাজধানীরূপে গড়া হোক।’ অন্য ধর্মের তরফে এ ধরনের দাবি করার আগেই সংসদে এই সংক্রান্ত বিল পাস করানোর আরজি মহারাজের।

মুসলিম চাঁদ

এখন কথা হচ্ছে, চাঁদ হিন্দু হলেই মুসলিম চাঁদ হওয়া বিচিত্র কিছু নয়। যেখানে অনেক আগে থেকেই বেশির ভাগ মুসলিম অধ্যুষিত দেশগুলোর জাতীয় পতাকায় চাঁদের অবস্থান রয়েছে। তুরস্ক, আজারবাইজান, উত্তর সাইপ্রাস, আলজারিয়া, তিউনেশিয়া, লিবিয়া, পাকিস্তান, উজবেকিস্তান, মালয়েশিয়া, তুর্কমেনিস্তান, মালদ্বীপ, ইরান, মৌরিতানিয়া, কমোরোস এসব দেশের জাতীয় পতাকায় কোথাও অর্ধেক চাঁদ কোথাও বা পূর্ণ চন্দ্রের অবস্থান রয়েছে। কেবল সৌদি আরব এবং আরব উপসাগরীয় রাজতন্ত্রের পতাকায় চাঁদ নেই। তবে কিছু অমুসলিম দেশের পতাকাতেও চাঁদের ছবি লক্ষ্য করা যায়; যেমন নেপাল, লাওস, সিঙ্গাপুর, পালাউ, মঙ্গোলিয়া। এ ছাড়াও কিছু জাতিগত পতাকাতেও চাঁদের অবস্থান লক্ষণীয়।

পৌরাণিক চাঁদ

পুরাণে চাঁদ নিয়ে নানা কাহিনির অবতারণা হয়েছে। চন্দ্র সেখানে একজন অতি রূপবান দেব চরিত্র। এই চন্দ্র ও সূর্য ছদ্মবেশে অমৃত চুরি করে পান করে, কিন্তু বিষ্ণুর কাছে বলে রাহু এবং কেতুর নাম। ফলে বিষ্ণুর চক্রে রাহু ও কেতুর মস্তক এবং ধর আলাদা হয় আর তাতেই চাঁদ ও সূর্যের গ্রহণ হয়ে থাকে।

এ ছাড়াও পৌরাণিক মান্যতা অনুযায়ী বিষপানের প্রভাবে ভগবান ভোলানাথের শরীরে অত্যন্ত উষ্ণতা অনুভব হচ্ছিল। তার শরীরে শীতলতার প্রয়োজন ছিল। বিষের কারণে তার শরীরে জ¦লন অনুভব হচ্ছিল। তখন চন্দ্র এবং সব দেবতারা তাকে শীতলতা দেওয়ার জন্য চাঁদ মাথায় ধারণ করার পরামর্শ দেন। শারদ পূর্ণিমার রাতে চাঁদের রশ্মি অমৃত বৃষ্টি নিয়ে আসে বলে বিশ্বাস করা হয়। এই দিন থেকে আবহাওয়ার পরিবর্তন হয় এবং শীত শুরু হয়। শারদ পূর্ণিমা কোজাগরী পূর্ণিমা নামেও পরিচিত। এই রাতে চাঁদ, তার ১৬টি কলায় সম্পন্ন হয়ে অমৃত বর্ষণ করে।

লৌকিক চাঁদ

চাঁদের বুড়ি চরকা কাটে, সেই সুতোয় সে লক্ষ্য তারা ধরে ফেলবে এমন গল্প কে না ছোটবেলায় শুনেছে? তাই তো কবি বলেছেন, এক যে ছিল চাঁদের কোনায়/ চরকা-কাটা বুড়ি/ পুরাণে তার বয়স লেখে/ সাতশো হাজার কুড়ি।/ সাদা সুতোয় জাল বোনে সে,/ হয় না বুনোন সারা/ পণ ছিল তার ধরবে জালে/ লক্ষ কোটি তারা।

কিন্তু এখন কথা হচ্ছে যে, পুরাণে যাই লেখা থাক আর চাঁদ নিয়ে যা কিছুই লৌকিক গল্পের প্রচলন থাক না কেন, এতটা কালো চাঁদ নিয়ে নানা বিস্ময় ও আগ্রহ যাই থাকুক না কেন এমন প্রশ্ন কখনোই ওঠেনি চাঁদ হিন্দুর নাকি মুসলমানের। এমনকি চাঁদ নিয়ে যত আগ্রহই থাক না কেন, চাঁদে যত দেশের বৈজ্ঞানিকরা তাদের দেশের পতাকাই পুঁতে আসুন না কেন এতদিন চাঁদের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠতে কেউ শুনেছে নাকি?

চন্দ্রযান ৩-এর সাফল্য ভারতের মহাকাশ গবেষকদের উৎসাহিত করবে এ কথা অনস্বীকার্য, তবে এটি যে বর্তমানে অনেক প্রশ্নের সম্মুখীন করেছে, এটা দুর্ভাগ্যজনক হলেও স্বীকার করে নিতেই হয়।

যুগ যুগ ধরে চাঁদ নিয়ে পৃথিবীর মানুষের আগ্রহের শেষ নেই। কবি-সাহিত্যিকরা যেমন চাঁদকে তাদের খেয়াল তরী বানিয়ে নিয়ে যত খুশি ঘুরে বেরান। তেমনি ব্যবসায়ীরাও পিছিয়ে নেই। তারা চাঁদের জমি বিক্রির ব্যবস্থা নাকি একেবারেই পাকা করে ফেলেছে। তবে চাঁদে কি সত্যিই জমি কিনতে পারবেন আপনিও? চাঁদের ওপর কারও মালিকানা হতে পারে? কিন্তু তা সত্ত্বেও অনেক কোম্পানি আছে, যারা চাঁদে জমি বিক্রির দাবি করে এবং তাদের মাধ্যমে চাঁদে জমি কিনেছেন অনেকেই। জমি বিক্রির দাবি কিছু মিডিয়া রিপোর্ট বলছে যে, লুনা সোসাইটি ইন্টারন্যাশনাল এবং ইন্টারন্যাশনাল লুনার ল্যান্ডস রেজিস্ট্রি হলো এমনই দুটি কোম্পানি, যারা চাঁদে জমি বিক্রি করার দাবি করে। তাদের মাধ্যমে অনেকেই চাঁদে জমি কিনেছেন।

আসুন দেখে নেওয়া যাক আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইন কী বলে? বস্তুত পৃথিবীর কোনো দেশের মহাকাশের ওপর কোনো অধিকার নেই। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইনও করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক মহাকাশ আইন অনুযায়ী, পাঁচটি চুক্তি এবং বেশ কিছু কনভেনশন রয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে, মহাকাশ কিংবা চাঁদ ও অন্য গ্রহ-উপগ্রহে অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ, তথ্য অনুসন্ধানের স্বাধীনতা, মহাকাশে কোনো বস্তুর ক্ষতির দায়বদ্ধতা, মহাকাশযান এবং নভোশ্চরদের নিরাপত্তা ও সুরক্ষা দেশগুলোর ওপর বর্তায়।

এসব জানা সত্ত্বেও কীভাবে চাঁদের ওপর অধিকার কায়েম করার জন্য, চাঁদের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর কব্জা করার অপচেষ্টা কেন? বিশেষজ্ঞদের ধারণা, চাঁদের ধর্মীয় মেরুকরণের চেষ্টাও এর অন্যথা নয়। মানুষ বিজ্ঞানের জয়যাত্রা অব্যাহত রাখুক, কিন্তু মানুষের বিজ্ঞান সাধনা যদি পৃথিবীর মতোই মহাবিশ্বকে আগ্রাসনের দিকে ঠেলে দেয় তাহলে বিজ্ঞানীদের এই দীর্ঘ গবেষণাকে কালিমালিপ্ত করা হয়। মহাকাশ গবেষণার পথ আরও প্রশস্ত হোক, আর বিজ্ঞানের সেই উজ্জ্বল আলোয় কলঙ্কের এ মেঘ কেটে যাক। মনে রাখতে হবে, চাঁদ হিন্দুর নয়, মুসলমানের নয়। ভারতের যেমন নয়, তেমনই আমেরিকা, চীন বা রাশিয়া কারোরই একচ্ছত্র অধিকার নেই, এই মায়াবিনী জ্যোতিষ্কের ওপর।

লেখক : ভারতীয় লেখক

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত