প্রথমেই বলি, ডাক্তারদের বিষয় কিন্তু শুধুই ডেঙ্গু না। ডেঙ্গু দমাতে চাইলে, প্রথমত মশার লার্ভা বিনাশ করতে হবে। যাতে মানুষ ডেঙ্গু আক্রান্ত না হয়। ডেঙ্গু হওয়ার পরে হাসপাতালে যে জায়গা দরকার, যে ধরনের অবকাঠামো দরকার, ওষুধপত্রের দরকার আগে তা নিশ্চিত করতে হবে। মনে রাখতে হবে, সব কিছুরই সহজপ্রাপ্যতা দরকার। এটা যেন কোনোভাবেই বাধাগ্রস্ত না হয়। সেইক্ষেত্রে দেখতে হবে, আমাদের সীমিত সম্পদের মধ্যে চিকিৎসকরা যেভাবে চিকিৎসা দিচ্ছেন, তা তুলনাহীন। তারা দায়িত্বশীলতার সঙ্গেই কাজ করছেন। আসলে যাদের যা করার দায়িত্ব, তা যদি হতো তাহলে ডাক্তারদের দিনরাত পরিশ্রম করতে হতো না।
আমি মনে করি না, কারও মধ্যে কোনো অসন্তোষ রয়েছে। ইতিমধ্যে সরকারের নির্দেশে বিভিন্ন হাসপাতালে ‘ডেঙ্গু কর্নার’ করা হয়েছে। এরপরও কিছু জায়গায় রয়েছে, স্যালাইনের সংকট। এটা সাময়িক। এটা যাতে দ্রুত দূর করা যায়, তার জন্যও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। প্রয়োজনে স্যালাইন আমদানি করা হবে। তবু কোনো সংকট হবে না। এরপর কোনো অসন্তোষ থাকবে বলে মনে হয় না।
যে সমস্ত জায়গায় স্যালাইন পাওয়া যাচ্ছে না, তারও সমাধান দ্রুতই হবে। এখন কোনো কোনো জায়গায় স্যালাইন পাওয়া যাচ্ছে না। যে সমস্ত জায়গায় স্যালাইন পাওয়া যাচ্ছে না, মনে রাখতে হবে, সেখানে সিন্ডিকেট করে অসাধু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট তৈরির চেষ্টা করছেন। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। এই কাজ করতে হবে অনতিবিলম্বে। এ বিষয়ে কালক্ষেপণের সুযোগ নেই। তখন দেখা যাবে, আর কোনো সংকট নেই। দেশের মানুষ নির্বিঘেœই উপযুক্ত চিকিৎসা পাবেন।
এটা দুঃখজনক যে, আমাদের দেশে একটা শ্রেণি রয়েছে, যারা মজুদদারি করে। তারা কোনো সময় দেখেন না। শুধু দেখেন, তাদের কী করলে লাভ হবে? মরিচ-পেঁয়াজের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দিয়েছেন, আমদানি করার। সঙ্গে সঙ্গেই কিন্তু মরিচ-পেঁয়াজের দাম কমে গেল। এখানেও এরকম সহজপ্রাপ্যতা দরকার। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, এই সমস্যা কিন্তু খুবই সাময়িক। মাসখানেকের মধ্যেই বিষয়টি থাকবে না। আসলে স্যালাইন আমদানি করলেই সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। তখন দেখা যাবে, যারা স্টক করেছেন তারাই সম্মুখীন হয়েছেন ব্যবসায়িক ক্ষতির। এ বিষয়ে সরকার যথেষ্ট সতর্ক। পাশাপাশি ডেঙ্গু রোগের চিকিৎসা সর্বজনীন করার যত ধরনের উদ্যোগ নেওয়া দরকার, তা করা হয়েছে।
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে এ পর্যন্ত ৮৫০ জনের মতো রোগী চিকিৎসা নিয়েছে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে দুই কি তিন জন মারা গেছেন। এছাড়া চিকিৎসা সেবা সবাই পাচ্ছেন। অনেক ভিআইপি এখানেই ডেঙ্গুর চিকিৎসা নিচ্ছেন। সাধারণ মানুষ তো নিচ্ছেনই, ভিআইপিরাও নিচ্ছেন। এখানে অবশ্যই সবাই আসছেন একটি আস্থার কারণে। তাদের মধ্যে একটা বিশ^াস তৈরি হয়েছে, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বিশ^বিদ্যালয়ে আধুনিক প্রযুক্তিতে উন্নত মানের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে, আন্তরিকভাবেই।
চিকিৎসা দেওয়ার ক্ষেত্রে সবাইকে কিন্তু রোগী হিসেবেই দেখা হচ্ছে। যে কারণে, এই রোগে আক্রান্ত রোগীদের এমনটি ভাবার কারণ নেই যে, আমি সাধারণ মানুষ, তাই আমার চিকিৎসাও হবে সাধারণ। কোনোভাবেই তা নয়।
আমি মনে করি, সব হাসপাতালেই ডাক্তাররা আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। তাদের মধ্যে কোনো ধরনের কোনো অসন্তোষ নেই। এছাড়া হাসপাতালগুলোও এ ব্যাপারে যথেষ্ট প্রস্তুত। যারা বলেন হাসপাতালের ঠিকমতো প্রস্তুতি নেই, অবকাঠামোগত দুর্বলতা অথবা ডাক্তারদের মধ্যে আন্তরিকতার অভাব তারা বিষয়টি না জেনেই বলেন। এটি একেবারেই সঠিক নয়। কারণ ডাক্তাররা সবসময় সেবার মানসিকতা নিয়েই কাজ করেন, সেখানে নিজস্ব কোনো চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন নেই। তারা এ ব্যাপারে অত্যন্ত সংবেদনশীল। কোনো সাধারণ মানুষ যদি সরাসরি এসে বিষয়টি দেখতেন, তাহলে তিনিই বলতেন ডাক্তাররা খুবই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছেন। এখানে কোনো ধরনের ফাঁকি নেই।
আসলে ডেঙ্গুর প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে হলে, কয়েকটা মন্ত্রণালয়কে একত্রে কাজ করতে হবে। যার যতটুকু দায়িত্ব, তা পালন করতে হবে। এককভাবে আমি কোনো পক্ষকে দায়ী করতে চাই না। পাশাপাশি জনগণকেও সচেতন হতে হবে। এর সঙ্গে জড়িত অনেকগুলো মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব রয়েছে। আমাদের বাইরে এখানে এলজিআরডি রয়েছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয় রয়েছে। এমনকি ওয়াসারও দায়িত্ব রয়েছে।
এ ক্ষেত্রে শুধু চিকিৎসকের ওপর দায় চাপালে সঠিক হবে না। যখন হাসপাতালে কোনো রোগী আসেন, তখন তাদের কোনোভাবেই ফেরত পাঠানো ঠিক না। জেলা, উপজেলা পর্যায়ে একটি নির্দেশনা দেওয়া রয়েছে। কীভাবে তাদের কাজ করতে হবে। এ ব্যাপারে কোনো দ্বিধার সুযোগ নেই। সমস্ত দেশেই নিয়মানুযায়ী, প্রয়োজনানুযায়ী রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এরপর আর কোনো পক্ষের এ বিষয়ে ভুল বোঝার সুযোগ নেই।
ডেঙ্গু আক্রান্ত সব রোগীর ঢাকা শহরে আসার প্রয়োজন নেই। দেশের প্রত্যেকটি জেলা-উপজেলায়ই ডেঙ্গু মোকাবিলা করা জন্য যথেষ্ট প্রস্তুতি রয়েছে।
আমাদের একটা গাইড লাইন রয়েছে, সেটা অনুসরণ করেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বেশি বেশি ফ্লুইড খাওয়ানো হয় রোগীকে। সেই অনুযায়ীই তারা কাজ করছেন। এর বাইরে কোনো কিছুই হচ্ছে না। প্রটোকল ফলো করলে, কোনো আতঙ্কের কারণ নেই। একইসঙ্গে কারও মধ্যেই কোনো অসন্তোষ তৈরি হবে না। ডাক্তাররা ঠিকমতো চিকিৎসা সেবা দিতে পারবেন।
দেশব্যাপী হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো এ বিষয়ে সতর্ক রয়েছে। উদ্দেশ্যমূলকভাবে শুধু শুধু আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে এ ব্যাপারে সরকার সময়োপযোগী পদক্ষেপ নিয়েছে। যারা মনে করছেন, এ বিষয়ে কারও কোনো মাথাব্যথা নেই তা ঠিক নয়। ডাক্তার, নার্সসহ স্বাস্থ্যসেবার সঙ্গে জড়িত সবাই এ ব্যাপারে যথেষ্ট আন্তরিক। সরকারসহ সমস্ত পক্ষই, ডেঙ্গু আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা যাতে কমে আসে, ক্রমাগত সেই চেষ্টাই করছে। আমি নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি, সরকারিভাবে যে ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে তা যথেষ্ট সময়োপযোগী এবং আধুনিক। দেশে ডেঙ্গু বিষয়ে আদৌ কোনো সমস্যা নেই। যা শোনা যাচ্ছে, বা কেউ কেউ বলছেন তা একবারেই অযৌক্তিক। এসব কথার কোনো ভিত্তিই নেই।
আমরা যথেষ্ট প্রস্তুতি রেখেছি, এই রোগের চিকিৎসার ব্যাপারে। কেউ কোনো ধরনের অবহেলা করছে না, বিশেষ করে চিকিৎসাসেবার সঙ্গে যারা জড়িত রয়েছেন। সমস্ত হাসপাতাল, ক্লিনিক এবং স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোতে তারা সবসমসয় সতর্ক অবস্থানেই রয়েছেন। যখনই কোথাও ডেঙ্গু আক্রান্ত কোনো রোগী আসছেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি প্রয়োজনীয় চিকিৎসা পাচ্ছেন।
এ ব্যাপারে কোনো পক্ষের অবহেলা আমি প্রত্যক্ষ করিনি। যদি কেউ তা বলে থাকেন, তাহলে বলব, বিষয়টি উদ্দেশ্যমূলক। আগে বুঝতে হবে এটি কোন ধরনের রোগ, এর চিকিৎসার কী নিয়ম এরপর আমাদের কথা বলতে হবে। যারা এ বিষয়ে অভিজ্ঞ, কেবল তারাই জানেন, বাস্তবতা কী? খোঁজ নিলে দেখা যাবে, ডেঙ্গু নিয়ে বাইরে যতটুকু আতঙ্ক ছড়ানো হচ্ছে, তা একেবারেই হাস্যকর। প্রকৃত সত্য একেবারেই উল্টো। পরিস্থিতি পুরোপুরি সরকারের নিয়ন্ত্রণে। চিকিৎসা পেশার সঙ্গে যুক্ত সবাই, অত্যন্ত দায়বদ্ধতার সঙ্গেই দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
আমি কখনোই এককভাবে কোনো সিটি করপোরেশনকে দায়ী করব না। এখানে বেশ কয়েকটি মন্ত্রণালয় জড়িত রয়েছে। সমন্বিতভাবে এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়তে হবে। তখন দেখা যাবে, এ বিষয়ে আর কোনো সমস্যা হচ্ছে না।
অনেকেই বলছেন, হাসপাতালের বিভিন্ন অবকাঠামোগত সমস্যা রয়েছে, ডাক্তারদের সমস্যা রয়েছে যা আদৌ ঠিক নয়। যদি কেউ এ ব্যাপারে ঠিকমতো খোঁজখবর নেন, তখন দেখতে পারবেন হাসপাতালের প্রকৃত চিত্র। কত আন্তরিকতার সঙ্গে সবাই কাজ করছেন। হাসপাতাল, জনগণসহ সবাইকেই সচেতনভাবে এ বিষয়ে কাজ করতে হবে।
লেখক: উপাচার্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়
