কে হচ্ছেন বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ অভিভাবক। দেশের ২৪তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ পাচ্ছেন কে—ক’দিন ধরে এমন আলোচনা আইন ও বিচারঙ্গনে চলছে। ২৩তম প্রধান বিচারপতি হিসেবে ইতিমধ্যে বিচারিক কর্মদিবস শেষ করেছেন বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। ২৫ সেপ্টেম্বর তিনি অবসরে যাচ্ছেন। কিছুদিনের মধ্যে নতুন প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হবে। সঙ্গত কারণেই সর্বত্র আলোচনা, কৌতূহল বিচার বিভাগের অভিভাবক ও রাষ্ট্রীয় পদক্রম অনুযায়ী চতুর্থ শীর্ষ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ নিয়ে।
আইনবিদেরা মনে করেন, বিচারপ্রত্যাশীর দ্রুত ও ন্যায়বিচার প্রাপ্তিতে সবচে বড় অন্তরায় ও ভোগান্তির কারণ হয়ে উঠছে অসহনীয় মামলার জট ও আদালতগুলোর কতিপয় কর্মচারীদের দুর্নীতি। এ নিয়ে গত কয়েকবছর ধরে আইন ও বিচারসংশ্লিষ্ট ঊর্ধ্বতনরা বিস্তর বলে আসছেন। সঙ্গত কারণেই নিয়োগ পেতে যাওয়া প্রধান বিচারপতির সামনে ৪২ লাখের বেশি ফৌজদারি ও দেওয়ানি মামলার জট নিয়ন্ত্রণের চ্যালেঞ্জ থাকবে। একই সঙ্গে তাকে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে দুর্নীতিবাজদের। দায়িত্ব নেওয়ার পর এসব বিষয়ে তাকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে বলে মনে করেন আইনজীবীরা।
সুপ্রিম কোর্ট প্রশাসনের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত মার্চ পর্যন্ত উচ্চ ও অধস্তন আদালতে অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা ৪২ লাখ ৫০ হাজারের বেশি। এর মধ্যে অধস্তন আদালতে বিচারাধীন ফৌজদারি মামলার সংখ্যা ২১ লাখ ৬৪ হাজার ৩৭ এবং বিচারাধীন দেওয়ানি মামলা ১৫ লাখ ৬৭ হাজার ৩৩৪। অধস্তন আদালতে এখন পর্যন্ত ফৌজদারি ও দেওয়ানি অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা ৩৭ লাখ ৩১ হাজারের বেশি। অন্যদিকে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগে গত মার্চ পর্যন্ত ফৌজদারি অনিষ্পন্ন মামলা ৪ হাজার ৯৬৪ এবং দেওয়ানি বিচারাধীন মামলা ১১ হাজার ৭৮১ সহ সর্বোচ্চ আদালতে ১৬ হাজার ৮৫১ মামলা বিচারাধীন। অন্যদিকে হাইকোর্টে এই সময় পর্যন্ত বিচারাধীন ফৌজদারি মামলা রয়েছে ৩ লাখ ১৯ হাজার ৪৮৩, একই বিভাগে বিচারাধীন দেওয়ানি মামলা ৮৮ হাজার ৪৪৬ মামলা। এখন পর্যন্ত উচ্চ আদালতে বিচারাধীন মামলা রয়েছে ৫ লাখ ২১ হাজার ৯৯৯।
পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, বছরের পর বছর মামলা কেবলই বাড়ছে। যদিও গত দেড় বছরে বিচার নিষ্পত্তিতে গতি এসেছে। কিন্তু জটের লাগাম টানা যাচ্ছে না। মামলা দায়ের ও নিষ্পন্ন মামলার সংখ্যায় ফারাক থেকে যাচ্ছে। আর জটের এ চক্র ও আদালতের কিছু কর্মচারীদের দুর্নীতিতে ভুক্তভোগী হচ্ছেন বিচারপ্রত্যাশী মানুষ।
অবসরের প্রস্তুতিতে রয়েছেন প্রধান বিচারপতি হাসান ফয়েজ সিদ্দিকী। সুপ্রিম কোর্টের অবকাশ (৩ সেপ্টেম্বর থেকে ৭ অক্টোবর) কারণে গত ৩১ আগস্ট বিচারিক জীবনের শেষ কর্মদিবস ছিল তার। ওই দিন তিনি বিদায়ী বক্তব্যে তার উত্তরসূরীর সামনে চ্যালেঞ্জের বিষয়টির অবতারণা করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমার মনে হয়, আমার উত্তরাধিকারী গুরুতর চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হবেন এবং আমি এটাও মনে করি মহান আল্লাহতায়ালা তাকে সে চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করার অধিকারী করবেন এবং বিচার বিভাগকে আরও গতিশীল করবেন।’ দুই বছরের কিছু কম সময়ে দায়িত্ব পালনকালে বিভিন্ন সেমিনার ও আলোচনা সভাতেও প্রধান বিচারপতির কণ্ঠে মামলাজট ও আদালতে দুর্নীতি নির্মূলের প্রসঙ্গ বার বার এসেছে। আইনজীবীরা বলেন, মূলত বিচারাঙ্গনে প্রধান এই সমস্যাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করেই প্রধান বিচারপতি ওই দিন এমন কথা বলেছেন।
জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও আইন সাময়িকী ডিএলআরের সম্পাদক অ্যাডভোকেট মো. খুরশীদ আলম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিচারপ্রত্যাশী মানুষ চায় দ্রুত এবং ন্যায়বিচার। কিন্তু মামলাজট ও আদালতের কিছু অসৎ লোকের কারণে সেটি অনেক সময় হয়ে ওঠে না। নতুন প্রধান বিচারপতির কাছে আমাদের অনেক প্রত্যাশা। তার সামনে কিছু চ্যালেঞ্জও থাকবে। কোথায় সমস্যা আছে, বিচারকদের কিভাবে মামলা পরিচালনায় আরও দক্ষ করা যায়, সে বিষয়ে সমাধানের উদ্যোগ নেবেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘আদালত ও আইনজীবীরা একে অপরের পরিপূরক। তাই সমস্যা নির্মূলে শুধু প্রধান বিচারপতির দিকে চেয়ে থাকলে হবে না। বারগুলোর (আইনজীবী সমিতি) সহযোগীতা ছাড়া এসব সমস্যার সমাধান হবে না।’
সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দেন। এ অনুচ্ছেদে প্রধান বিচারপতি নিয়োগের বিষয়ে যোগ্যতা অযোগ্যতার বিষয়টি থাকলেও সেখানে জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করতে হবে- এমন বিধান বা বাধ্যবাধকতা নেই। সচরাচর জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে প্রধান বিচারপতি নিয়োগ হলেও কখনো কখনো এর ব্যাতিক্রমও দেখা গেছে। গত সাড়ে পাঁচ বছরে দুজন প্রধান বিচারপতি নিয়োগের এমন ব্যাতিক্রম দেখা গেছে।
সংবিধানের ৯৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, প্রধান বিচারপতিসহ উচ্চ আদালতের বিচারপতিগণ ৬৭ বছর বয়স পর্যন্ত বিচারিক দায়িত্ব পালন করে অবসরে যান। বর্তমানে আপিল বিভাগে প্রধান বিচারপতি ছাড়া আরও ছয়জন বিচারপতি রয়েছেন। জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে তারা হলেন বিচারপতি ওবায়দুল হাসান, বিচারপতি বোরহান উদ্দিন, বিচারপতি এম ইনায়েতুর রহিম, বিচারপতি মো. আশফাকুল ইসলাম, বিচারপতি আবু জাফর সিদ্দিকী ও বিচারপতি জাহাঙ্গীর হোসেন। এর মধ্যে প্রধান বিচারপতি হিসেবে এখন পর্যন্ত বেশি আলোচনা হচ্ছে বিচারপতি ওবায়দুল হাসানকে নিয়ে।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জেড আই খান পান্না দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘অধস্তন আদালতগুলোতে নানা অব্যবস্থাপনা রয়ে গেছে। যার সবচে বড় ভুক্তভোগী বিচারপ্রার্থী গরিব মানুষ। যিনি প্রধান বিচারপতি হবেন বিচার বিভাগকে রক্ষা করতে হলে তাকে অবশ্যই এগুলো নির্মূল করতেই হবে। এই ক্ষেত্রে কিছু পরিবর্তন করা উচিৎ। আমরা দেখতে চাই এবং আমাদের প্রত্যাশা নতুন প্রধান বিচারপতি সেটি করবেন। হয়তো সবকিছু রাতারাতি সবকিছু হবে না। কিন্তু একটা পরিবর্তন আমরা প্রত্যাশা করতেই পারি।’