সরকারের পদত্যাগের এক দফা দাবি আদায়ে বিএনপির নতুন কর্মসূচির ঘোষণা আসছে। বগুড়া থেকে রাজশাহী পর্যন্ত তারুণ্যের রোডমার্চ কর্মসূচি শেষ করে আজ সোমবার এই ঘোষণা দেওয়া হবে। নতুন কর্মসূচির মধ্যে ঢাকা ও আশপাশের এলাকায় ১১টি সমাবেশ ও পাঁচ বিভাগে পাঁচ রোর্ড মার্চ থাকতে পারে।
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, আগামীকাল মঙ্গলবার থেকে ১২ দিনের এই কর্মসূচি শুরু হবে। চলবে ৩ অক্টোবর পর্যন্ত। এরপরও যদি দাবি মেনে না নেয় তাহলে ঘেরাও, অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে। অক্টোবর জুড়েই এই কর্মসূচি থাকবে।
দলটির নেতারা বলছেন, ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ সরকারবিরোধী দলগুলোকে নিয়ে যা যা করেছে সব কিছুই বিএনপি করবে ধারাবাহিকভাবে। তাদের কর্মসূচি হবে শান্তিপূর্ণ। তবে সরকার বাধা দিলেও তারা মাঠ ছাড়বেন না।
নির্বাচন কমিশন আগামী জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের আভাস দিয়েছে। এর মধ্যে প্রধানমন্ত্রী গত ১৪ সেপ্টেম্বর সংসদের সমাপনী অধিবেশনের ভাষণে বলেছেন, অক্টোবরে সংসদ অধিবেশন শেষ হবে। তারপর নির্বাচন।
বিএনপি চায় নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগেই এক দফা দাবির আন্দোলন শেষ করতে। তারা দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে বর্তমান শেখ হাসিনা সরকারের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেবে না।
এক দফা দাবি আদায়ে সেপ্টেম্বরে লাগাতার কর্মসূচির ঘোষণা দিলেও তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করতে পারেনি বিএনপি। কিংবা জোরালো কোনো কর্মসূচিও দিতে পারেনি এ পর্যন্ত। সে কারণে অক্টোবরের প্রথম সপ্তাহ পর্যন্ত ১২ দিনের নতুন কর্মসূচির কঠোর আন্দোলনে নামবে বলে দলীয় সূত্রে জানা গেছে।
বিএনপির দায়িত্বশীল নেতারা বলেছেন, তারুণ্যের রোডমার্চের পর আজ সোমবার নতুন কর্মসূচি দেওয়া হবে। এর মধ্যে ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, কেরানীগঞ্জ, গাজীপুর, আমিনবাজার ও রাজধানীতে ১১টি সমাবেশ করা হবে। এর মধ্যে নারী, শ্রমিক ও পেশাজীবীদের সমাবেশ হবে। এ ছাড়া খুলনা, বরিশাল, সিলেট, ময়মনসিংহ ও চট্টগ্রাম বিভাগে পাঁচটি রোডমার্চ কর্মসূচি দেওয়া হতে পারে। শ্রমিক সমাবেশের পর পুরো অক্টোবরজুড়ে লাগাতার কর্মসূচি থাকবে। তবে দলীয় একটি সূত্র বলছে, আগামী মঙ্গলবার থেকে যে কর্মসূচি শুরু হবে তা শেষ হবে ৩ অক্টোবর কুমিল্লা-ফেনী-মিরসরাই-চট্টগ্রাম রোডমার্চের মধ্য দিয়ে।
বিএনপির একাধিক নেতার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এসব কর্মসূচির পর পুরো অক্টোবরজুড়ে কর্মসূচি থাকবে। এই কর্মসূচির মধ্যে রোর্ডমার্চ, লংমার্চ থাকবে। এসব কর্মসূচিতে কাজ না হলে ঘেরাও, অবরোধ ও হরতাল কর্মসূচি আসতে পারে।
এক দফা দাবি আদায়ের চূড়ান্ত আন্দোলনের বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির স্থায়ী কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ১৯৯৬ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে লাগাতার অবরোধ কর্মসূচি দিয়েছিল। তখন বিএনপি বাধ্য হয়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের হাতে ক্ষমতা তুলে দিতে বাধ্য হয়েছিল। আজ বিএনপি একই পথে হাঁটবে।’
তিনি বলেন, প্রাথমিক চিন্তা হিসেবে কোনো ধরনের আক্রমণাত্মক পথে না গিয়ে একের পর এক কর্মসূচির মাধ্যমে তারাও একই পরিস্থিতি তৈরি করবেন দাবি আদায়ের জন্য, যাতে করে তার ভাষায় সরকার গ্রহণযোগ্য নির্বাচন প্রশ্নে সমঝোতায় বাধ্য হয়। তবে বাধ্য করলে কোনো ছাড় নয়। বাধ্য করতে যা লাগে তাই করবে বিএনপি।
ওই নেতা আরও বলেন, ‘বিএনপি এক দফার দাবি আদায়ে পুরো অক্টোবরজুড়ে বিরতিহীন কর্মসূচিতে যাবে। কর্মসূচির শুরু হতে পারে ঢাকার আশপাশের জেলাগুলোতে সমাবেশ দিয়ে। এরপর রাজধানী ঢাকা থেকে বিভিন্ন জেলায় রোডমার্চ, লংমার্চের কর্মসূচি আসবে। সারা দেশে তৃণমূল নেতাকর্মীদের উজ্জীবিত করে ঢাকায় আসবে কর্মসূচি। এসব কর্মসূচি হবে শান্তিপূর্ণ। শান্তিপূর্ণ এসব কর্মসূচিতে সরকারের টনক না নড়লে পুরো অক্টোবরজুড়ে দেশব্যাপী লাগাতার ঘেরাও, অবরোধের মতো কর্মসূচির ঘোষণা আসবে। তাতেও কাজ না হলে সরকার বাধ্য করলে সর্বশেষ হরতালের মতো কঠোর কর্মসূচি আসতে পারে। বিশেষ করে রাজধানী ঢাকার প্রবেশপথে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালন করে পুরো ঢাকা শহর অচল করে দেওয়া হতে পারে।
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল আউয়াল মিন্টু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আগামী তিন মাস খুবই গুরুত্বপূর্ণ। রাজপথে আমরা নেমে এসেছি বিজয় অর্জন না করে আমরা ঘরে ফিরে যাব না। আগামী প্রজন্মের জন্য একটি নতুন বাংলাদেশ তাদের উপহার হিসেবে দিয়ে যেতে চাই।’
বিএনপি সূত্রগুলো বলছে, সরকারের ওপর বিদেশিদের চাপের কারণে সরকার এখন নমনীয়। কিন্তু কঠোর আন্দোলন শুরু হলে সে-রকম নাও থাকতে পারে। বিএনপির কর্মসূচিকে ঘিরে সহিংসতা হলে সরকারের ওপর বিদেশিদের চাপ বাড়বে। অন্যদিকে বিএনপির নেতাকর্মীরা রাস্তায় নেমে আসবেন বলে তারা মনে করেন।
ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশে সুষ্ঠু নির্বাচনের প্রত্যাশা জানিয়ে নতুন ভিসানীতি ঘোষণা করেছে। অন্যদিকে বাংলাদেশে মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে ইউরোপীয় পার্লামেন্টে প্রস্তাব গ্রহণ করেছে।
নতুন কর্মসূচির বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘১২ জুলাই সরকার পতনের এক দফা ঘোষণার পর থেকে ধাপে ধাপে কর্মসূচি পালন করে আসছি আমরা। আন্দোলনের গতি-প্রকৃতি সব সময় একরকম থাকে না। সরকারের আচরণের ওপর নির্ভর করবে কী ধরনের কর্মসূচির ঘোষণা আসবে।’
তিনি বলেন, ‘ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যে আন্দোলন আমাদের করতে হচ্ছে তা স্বাধীনতার গত ৫০ বছরের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক দলকে করতে হয়নি। কারণ ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন এবং সর্বশেষ বিচার বিভাগকে পুরোপুরি দলীয়করণ করেছে। এখন এক ব্যক্তির ইচ্ছা ও নির্দেশে দেশ চলছে। এই রেজিমের পরিবর্তন করতে হলে ভেবেচিন্তে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি সামাজিক, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে সম্পৃক্ত করতে হবে। সে প্রক্রিয়া চলছে।’
ফখরুল বলেন, ‘সরকারকে সরে যেতে হবে কারণ আমাদের পিঠ দেয়ালে ঠেকে গেছে। হামলা হলে আন্দোলনের গতিপথ পাল্টে যাবে। কঠোর কর্মসূচির দিকে যাব আমরা।’
গত শুক্রবার নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল বলেছেন, ‘রংপুর ও রাজশাহী অঞ্চলে দুদিনের ‘তারুণ্যের রোডমার্চ’ শেষে সোমবার নতুন কর্মসূচির ঘোষণা দেওয়া হবে। এক দফার দাবি আদায়ে যে আন্দোলন শুরু হয়েছে, এই আন্দোলনে সবাই ঐক্যবদ্ধ।’
দায়িত্বশীল নেতারা বলেন, ‘নতুন কর্মসূচির মধ্যে ঢাকার জেলার কেরানীগঞ্জে দলীয় কার্যালয়ের সামনে, গাজীপুর মহানগর ছাড়াও গাবতলীর আমিনবাজার, ঢাকা মহানগর উত্তর উত্তরায় একটি সমাবেশের আয়োজন করবে। এছাড়া শ্রমিক দলের কর্মসূচি রয়েছে ৩০ সেপ্টেম্বর।’
শ্রমিক দলের দায়িত্বশীল নেতারা বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধ, নব্বইয়ে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে শ্রমিকরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন। এবারের আন্দোলনেও শ্রমিকরা রাজপথের আন্দোলন-সংগ্রামের নেতৃত্বে থাকবেন।’ তারা জানান, কর্মসূচি সফল করতে ফরিদপুর ছাড়া ঢাকা বিভাগের সব জেলা নেতাদের নিয়ে গতকাল নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে প্রস্তুতি সভা করেছেন। সরকার পতন আন্দোলনে সারা দেশের শ্রমজীবী মানুষকে সম্পৃক্ত করতে এ কর্মসূচি।
গত বছরের ১০ ডিসেম্বর বিএনপি রাজধানীর গোলাপবাগে সরকার পতনে ১০ দফা দাবি ঘোষণা করে। এরপর সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে ৩০ ডিসেম্বর থেকে রাজপথে আন্দোলন শুরু করে। সর্বশেষ গত ১২ জুলাই নয়াপল্টনে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে অনুষ্ঠিত এক সমাবেশ থেকে সরকার পতনের এক দফার কর্মসূচি ঘোষণা করে বিএনপিসহ সরকারবিরোধী রাজনৈতিক দলগুলো।
আন্দোলন-সংগ্রাম নিয়ে তৃণমূল নেতাকর্মীদের শঙ্কা ও বিভিন্ন বক্তব্যের বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বিগত কয়েকটি আন্দোলন পর্যালোচনা করে কোথায় কোথায় ঘাটতি আছে তা বিশ্লেষণ করে কঠোর কর্মসূচির ঘোষণা আসবে। ইতিমধ্যে সাবেক প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের (সাবেক আমলা) ব্যবহার করা শুরু হয়েছে। সাবেক সেনা কর্মকর্তাদের একটা অংশ যারা বিএনপিতে যোগদান করেছেন তারাসহ অন্য যারা আছেন তাদের সবাইকে সক্রিয় করা হচ্ছে।’
