বাবা-মা-বোনকে হারিয়ে বেঁচে আছে ৭ মাসের শিশু

আপডেট : ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ০২:১৭ এএম

রাজধানীর মিরপুরে বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধ সড়কের ফুটপাত ধরে বাসার পথে হেঁটে যাচ্ছিল এক পরিবারের তিন সদস্য। তাদের সঙ্গে ছিল পরিবারটির আরেক সদস্য সাত মাস বয়সী শিশু হোসাইন। কিন্তু বিদ্যুতের ছেঁড়া তার পড়েছিল ওই পথে। সেখানে আচমকাই বিদ্যুতায়িত হন তারা। এ সময় তাদের সাহায্যে এগিয়ে আসেন এক তরুণ। তিনিও বিদ্যুতায়িত হয়ে প্রাণ হারান। তবে ভয়াবহ এ দুর্ঘটনায় সবাইকে অবাক করে প্রাণে বেঁচে গেছে শিশু হোসাইন। জানা গেছে, বিদ্যুতায়িত হওয়ার পর হোসাইনের মা যখন পানিতে পড়ে যান তখন হোসাইন মায়ের কোল থেকে ছিটকে কিছুটা দূরে পড়ে যায়। তা দেখে তাদের সাহায্য করতে আসা ওই তরুণ হোসাইনকে উদ্ধার করে এক নারীর কাছে রেখে আবার এগিয়ে গিয়ে প্রাণ হারান।

গত বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে মিরপুরে কমার্স কলেজসংলগ্ন ঝিলপাড় বস্তির বিপরীত পাশের রাস্তায় ভয়াবহ এ দুর্ঘটনা ঘটে। নিহতরা হলেন মিজান হাওলাদার (৩৫), তার স্ত্রী মুক্তা (২৫) ও মেয়ে লিমা (৭) এবং তাদের উদ্ধারে এগিয়ে যাওয়া তরুণ মোহাম্মদ অনিক (১৮)।

শিশু হোসাইনকে নিয়ে গতকাল শুক্রবার সকালে মিরপুর মডেল থানায় হাজির হন আমেনা বেগম নামে এক নারী। তিনি ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বলেন, ‘হোসাইনকে অনিকের মাধ্যমে আল্লাহ বাঁচিয়েছেন। না হলে একই ঘটনায় তার মা-বাবা ও বোন এবং অনিক মারা গেছে, তার তো বাঁচার কথা ছিল না। হোসাইনের মা যখন পানিতে পড়ে যায় তখন হোসাইন মায়ের কোল থেকে ছিটকে পড়ে যায়। এ সময় অনিক হোসাইনকে পানি থেকে তুলে আমার কোলে দেয়। তাকে কারেন্ট (বিদ্যুতায়িত) ধরেনি। পরে আমি তাকে আমার বাসায় নিয়ে প্রথমে শরীরে গরম তেল দিই। এরপর সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যাই। সেখান থেকে ডাক্তার ঢাকা মেডিকেলে নিয়ে যেতে বলেন। সেখানে চিকিৎসার পর পরিবারের কাছে হোসাইনকে দিতে থানায় এসেছি।’

জানা গেছে, নিহত মিজানের গ্রামের বাড়ি বরিশালে। তিনি ঢাকায় শরবত, ঝালমুড়িসহ বিভিন্ন খাবার বিক্রি করে সংসার চালাতেন। স্ত্রী-সন্তান নিয়ে থাকতেন মিরপুরের ঝিলপাড় বস্তিতে। তার বাবা নাসির হাওলাদার বলেন, ‘গতকাল (বৃহস্পতিবার) সকালেই মিজান পরিবারসহ বরিশাল থেকে লঞ্চে করে ঢাকায় ফিরেছে। এরপর যায় শ্বশুরবাড়িতে। সেখান থেকে সন্ধ্যার পর বাসায় ফেরার পথে বিদ্যুৎস্পর্শ হয়ে মারা যায়। হোসাইনের হাত ও পিঠে আঘাত লেগেছিল। সে এখন তার নানির কাছে আছে।’

মিজানের শ্বশুর মো. মফিজ বলেন, ‘আমার মেয়ে ও জামাই নাতি-নাতিনকে নিয়ে রাতে বাসা থেকে খেয়ে বের হয়। এই বের হওয়া যে শেষ তা জানলে তাদের কোনোদিন ছাড়তাম না। এই মৃত্যু মানতে পারছি না। আমার নাতিটার কী হবে? মাত্র সাত মাস বয়সে সে মা-বাবাকে হারাল।’

এ দুর্ঘটনায় নিহত তরুণ মোহাম্মদ অনিকের বাবা বাবুল মিয়া বলেন, ‘মিজান যখন বিদ্যুতায়িত হন, তখন তার কাঁধে ছিল হোসাইন। তিনি হোসাইনকে বাঁচানোর জন্য একদিকে ছুড়ে মারেন। অনিক পানির মধ্য থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করতে গিয়ে বিদ্যুতায়িত হয়ে মারা যায়।’

এদিকে এলাকাবাসী অভিযোগ করে বলেছে, ঝিলপাড় বস্তির বিপরীত পাশের রাস্তার বিদ্যুতের খুঁটি থেকে অনেক অবৈধ সংযোগ বস্তিতে গেছে। এসব অবৈধ সংযোগের কারণেই এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। স্থানীয় বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগের কারণেই ঘটেছে। বস্তিতে অনেক অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ রাস্তার এখান থেকে নেওয়া হয়েছে। এসব অবৈধ সংযোগ লাইনের মধ্যে থেকে একটি ছিঁড়ে পানিতে পড়ে যায়।’

মিরপুর মডেল থানার ওসি মোহাম্মদ মহসীন বলেন, ‘শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে একটি মামলা করা হয়েছে। বিদ্যুতের ছেঁড়া তার আমরা দেখতে পাইনি। কীভাবে ওখানে তারা বিদ্যুতায়িত হয়েছেন তা জানতে কর্র্তৃপক্ষের সহযোগিতা নেব। এরপর আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’

এ দুর্ঘটনায় দুঃখ প্রকাশ করেছে বিদ্যুৎ বিভাগ। প্রতিষ্ঠানটি নিহতদের পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়ে বিদেহীদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেছে। গতকাল গণমাধ্যমকে পাঠানো এক বার্তায় বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কোম্পানি লিমিটেড (ডেসকো) বৃহস্পতিবার রাত ১০টা ২৫ মিনিটে ফায়ার সার্ভিস থেকে এই দুর্ঘটনার খবর পায়। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে রূপনগর রূপালী হাউজিং ও রূপনগরে বিদ্যুতের ফিডার বন্ধ করে দেয়। পরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে রাত ১১ টা ২৭ মিনিটে বন্ধ ফিডার পুনরায় চালু করা হয়।  বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা ও বস্তি এলাকা হওয়ায় আশপাশে ছয়টি বিদ্যুতের ট্রান্সফরমার বন্ধ রাখা হয়। পরে প্রতিটি ট্রান্সফরমারে লাইন পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে রাত সাড়ে ১২টায় সব ট্রান্সফরমার চালু করা হয়। গ্রাহকের ইন্টারনাল সার্ভিসের ওয়্যারিং ত্রুটির কারণে এ দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত