উন্নয়নের সঙ্গে বাড়ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য

আপডেট : ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩, ১২:৫২ এএম

দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন হলেও এর ভাগ সমহারে সবাই পাচ্ছেন না। দেশ উন্নয়নের পথে যত এগিয়ে যাচ্ছে অর্থনৈতিক বৈষম্য ততই বাড়ছে। এ কারণে এখন এক দেশে দুটো ভিন্ন সমাজ দাঁড়িয়েছে, ভিন্ন বাস্তবতা বিরাজ করছে। এ ধরনের বৈষম্যের বজায় রেখে দেশের টেকসই উন্নয়ন সম্ভব না বলে হতাশা ব্যক্ত করেছেন অর্থনীতিবিদ ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা।

গতকাল সোমবার রাজধানীর কৃষিবিদ ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন আখ্যান ও সমান্তরাল বাস্তবতা : পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর ভাবনা’ শীর্ষক বইয়ের জনপ্রকাশ অনুষ্ঠান ও সংলাপে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপনকালে তারা এ কথা বলেন।

সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও অনুষ্ঠানের সভাপতি অর্থনীতিবিদ ড. রেহমান সোবহান  বলেন, ১৫ বছর ধরে একটি ভালো অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ধরে রেখেছে বর্তমান সরকার। পদ্মা সেতুর মতো প্রকল্প বাস্তবায়ন করেছে। এ সবের জন্য সরকারপ্রধানসহ সবাই সাধুবাদ পেতেই পারেন। কিন্তু অন্যান্য অবকাঠামো উন্নয়নে যে ব্যয় হয়েছে তাতে প্রান্তিক মানুষ কতটা ভাগীদার হয়েছে? সরকার উন্নয়ন বাজেটে কতটা দলিত, নারী, প্রবীণ সমাজের উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো রেখেছে তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেন।

রেহমান সোবহান আরও বলেন, নির্বাচনের সময় নাগরিকের কথা শুনবে রাজনীতিবিদরা। কিন্তু নির্বাচনই যদি সঠিকভাবে না হয় তবে ফল আসবে না। এক্ষেত্রে ‘ডেমোক্রেটিক ফেইলর’ আছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অধ্যাপক রেহমান সোবহান বর্তমান বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ব্যর্থতার দুটো দিক তুলে ধরেন। তার মতে, ব্যর্থতার একটি দিক হচ্ছে গণতান্ত্রিক ব্যর্থতা, যেখানে জনপ্রতিনিধিত্বমূলক সরকার থাকা দরকার, কিন্তু নেই, যারা মানুষের কথা শুনবে ও কাজ করবে। আরেকটি দিক হচ্ছে, ন্যায়ভিত্তিক সমাজব্যবস্থার অভাব।

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন বাস্তবায়ন করতে হলে স্বাধীনতার পাশাপাশি ন্যায়ভিত্তিক সমাজও প্রতিষ্ঠা করতে হবে উল্লেখ করে রেহমান সোবহান বলেন, যেসব সমস্যা চিহ্নিত হয়েছে, সেগুলো সমাধানযোগ্য। কিন্তু এখানে বিষয় হচ্ছে, এগুলো কতটা প্রাধান্য পাচ্ছে। এ ছাড়া বাস্তবায়নের সদিচ্ছা একটি বিষয়। দুর্নীতি, সুশাসনের মতো অনেক কিছু এখানে জড়িত।

সিপিডির বিশেষ ফেলো ও এসডিজি বাস্তবায়নে নাগরিক প্ল্যাটফর্ম বাংলাদেশের আহ্বায়ক ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য বলেন, বাংলাদেশে উন্নতি হয়েছে, কিন্তু তার ভাগীদার সবাই সমান নন। বৈষম্য বছর বছর বাড়ছে, যা শিক্ষা-স্বাস্থ্যে প্রভাব ফেলছে। দেশে ১০ শতাংশ মানুষের হাতে ৪১ শতাংশ সম্পদ। এখন অত্যন্ত বিত্তবানদের রাজনৈতিক ক্ষমতারও উদ্ভব ঘটছে, যা আগে ছিল না। অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি গ্রামীণ দারিদ্র্যও বেড়েছে।

দেশের রাশিয়ান ওলিগার্কের মতো শ্রেণি তৈরি হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, তারা সম্পদশালী ও রাজনৈতিকভাবে খুবই প্রভাবশালী। যার ফলে আয় বৈষম্য খুবই দ্রুত বাড়ছে। আর এই বৈষম্য বাড়ার পেছনে রয়েছে মূলত চারটি কারণ। সেগুলো হলো : ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি না পাওয়া, রাজস্ব আদায় অগ্রগতি না হওয়া, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে স্বল্প বরাদ্দ দেওয়া এবং সামাজিক সুরক্ষায় ঘাটতি থাকা।

তিনি বলেন, দেশে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়েনি, যেটা বেড়েছে সেটা সরকারি বিনিয়োগ। শুধু সরকারি বিনিয়োগ দিয়ে কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জন করা সম্ভব নয়। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের বরাদ্দ নিয়ে ড. দেবপ্রিয় বলেন, মধ্যম আয়ের দেশে উত্তরণের পথে একটি দেশে জিডিপির ২ শতাংশের চেয়ে কম বরাদ্দ শিক্ষা খাতে এবং ১ শতাংশের কম বরাদ্দ স্বাস্থ্য খাতে। এটা কলঙ্কজনক বিষয়। সামাজিক সুরক্ষা ও বরাদ্দের হিসাব নিয়েও তিনি প্রশ্ন তুলেন।

অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন সিপিডির সম্মানীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান। তিনিও আয় বৈষম্যের কথা তুলে ধরেন। বলেন, আমরা গড় হিসাবে অনেক ভালো করেছি, কিন্তু সমান্তরাল বাস্তবতার সৃষ্টি হয়েছে। ফলে সামগ্রিক থেকে ব্যক্তি পর্যায়ে অনেক ধরনের অসাম্য ও বৈষম্য বিদ্যমান। বর্তমানে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ আয় পাথর্ক্য ৮০ গুণ, যা ২০০৫ সালে ছিল ৩০ গুণ। এ ধরনের বৈষম্য বজায় রেখে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব না বলেও মন্তব্য করেন মোস্তাফিজুর রহমান।

আলোচনা করেন মানবাধিকারকর্মী অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, বিচারপতি মো. আবদুল মতিন, বাংলা একাডেমির সভাপতি কথাসাহিত্যিক সেলিনা হোসেন, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর প্রমুখ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত