সেই থেকে ‘কালো’ চঞ্চল মাহমুদ

আপডেট : ১৫ আগস্ট ২০২৩, ০৩:২১ এএম

১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার ঘটনায় মুষড়ে পড়েন ১৮ বছরের এক যুবক। এই হত্যাকান্ডের প্রতিবাদে যুবকটি কালো কাপড় পরার সিদ্ধান্ত নেন। সেই থেকে ৪৮ বছর ধরে তিনি কালো কাপড় পরিধান করে আছেন। পঁচাত্তরের সেই টগবগে প্রতিবাদী যুবকটিই এখন দেশের প্রখ্যাত আলোকচিত্রী চঞ্চল মাহমুদ। গ্ল্যামার, মডেল ও ফ্যাশন ফটোগ্রাফার হিসেবে এ দেশের মানুষ তাকে একনামে চেনে।

কেন এই প্রতিবাদ জানতে গত ১০ আগস্ট দুপুরে তার গ্রিন রোডের বাসায় গিয়ে হাজির হই। দুপুরের খাওয়ার পর তার সঙ্গে এক নিবিড় আলাপে যোগ দিই। এই আলাপে বেরিয়ে আসে অজানা অনেক ঘটনা। আমাদের এই দীর্ঘ আলাপে মাঝে মধ্যে এসে সঙ্গ দেন তার স্ত্রী রায়না মাহমুদ। স্বাধীনতার পর চঞ্চল মাহমুদ তার বাবার ইয়াসিকা ক্যামেরাটা নিয়ে প্রায় ধানমন্ডির ৩২ নম্বরের বাসায় যেতেন। তখন তিনি এইটে পড়েন। বঙ্গবন্ধু ফটোগ্রাফারদের খুব পছন্দ করতেন, প্রশ্রয় দিতেন। আর শিশুদের প্রতি তার মমতার অন্ত ছিল না। কম বয়সী আলোকচিত্রী চঞ্চল মাহমুদকে প্রথম দেখেই বঙ্গবন্ধু ‘তুই’ বলে ডাকলেন। সেই ‘তুই’ ডাকটা চঞ্চল মাহমুদের মনে চিরদিনের মতো গেঁথে যায়।

একদিন চঞ্চল মাহমুদ ৩২ নম্বরে গিয়ে দেখেন বঙ্গবন্ধু ভাত খাচ্ছেন। দূর থেকে ছবি তুলতে দেখে বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘এই ভাত খাইতাছি, গেঞ্জি পরে ভাত খাই; আর তুই ছবি তোলস? বয় এইখানে। ওই ওরে ভাত দে। কই মাছ দে।’ উনি কই মাছ খুব পছন্দ করতেন। এই ঘটনায় চঞ্চল মাহমুদ অবাক হয়ে গেলেন। তিনি অবাক হয়ে ভাবতেন, কী সুন্দর একটা মানুষ, কী সুন্দর চুল-গোঁফ, চুলগুলো হাত দিয়ে কী স্টাইল করে আঁচরান। এমনভাবে পাইপটা ধরাতেন সেই দৃশ্য ভুলতে পারেন না চঞ্চল মাহমুদ। মাঝে মাঝে বলতেন, ‘এই খাড়া, ঠিক করে লই; এইবার তোল।’ বঙ্গবন্ধু এভাবেই কথা বলতেন। তার বলার মধ্যে কোনো ভণিতা ছিল না। মাঝে মাঝে বকাও খেয়েছেন। সকালে কবুতরের খোয়াড়গুলো যখন খোলা হতো তখন কবুতরগুলো উনার মাথায় এসে বসত, দুই কাঁধে বসত। উনি কথা বলতেন কবুতরগুলোর সঙ্গে। কবুতররা চিনত উনাকে।

বঙ্গবন্ধু তখন প্রধানমন্ত্রী। একদিন দেখলেন, ৩২ নম্বরে যে পাহারাদার থাকত তাকে তিনি ঘাড়ে ধরে বললেন, ‘আয়, তোর মুখটা শুকায়ে গেছে।’ পাহারাদার তো কাচুমাচু হয়ে বলে স্যার। বঙ্গবন্ধু তাকে বেড়ে খাওয়ালেন। এই দৃশ্য দেখে চঞ্চল মাহমুদ অবাক হয়ে ভাবলেন, ইনি তো অন্য এক মানুষ। তখন রয়টার্সের রফিকুর রহমান, অবজারভারের মোয়াজ্জেম হোসেন বুলু, সংবাদের রশীদ তালুকদার বেশি যেতেন।’

পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট সকালে চঞ্চল মাহমুদ রেডিওতে শুনলেন, বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। খবরটা মুহূর্তের মধ্যে ছড়িয়ে গেল। তার আগে মিগ টুয়েন্টি ওয়ান কয়েকটি পাক মারল। শুনে তিনি অস্থির হয়ে গেলেন। দৌড়ে চলে গেলেন ৩২ নম্বরের দিকে। আশপাশে যারা ছিলেন, তারাও এলেন। দেখলেন, বাড়িটার জায়গায় জায়গায় গুলির ক্ষত। বাড়ির ভেতরে কাউকে ঢুকতে দেয়নি। প্রথমে ব্যারিকেড ছিল না। ব্যারিকেড দেওয়া হয় পরে। কয়েক ঘণ্টা লাশগুলো এমনিতেই পড়েছিল। চঞ্চল মাহমুদ এই দৃশ্য দেখে ফিরে এলেন নাখালপাড়ার রূপকার স্টুডিওতে। তার মাথা থেকে টপ টপ করে ঘাম ঝরছে। বমি শুরু হলো। রূপকারের মালিক লুৎফর বারী লাল তাকে ফার্মগেটের একটা হাসপাতালে নিয়ে গেলেন। স্যালাইন দেওয়া হলো। কিন্তু হেচকি থামছে না। ভয়ার্ত মুখ দেখে ডাক্তার বললেন, ছেলেটার মনে হয় আপন কেউ মারা গেছে। তখন লুৎফর বারী লাল ডাক্তারকে সব ঘটনা খুলে বললেন। আট দিন ছিলেন হাসপাতালে। সুস্থ হয়েও শোকে আচ্ছন্ন চঞ্চল মাহমুদ কয়েক দিন ভাত খেতে পারেননি।

এরপর তিনি প্রায় ৩২ নম্বরের উল্টোদিকের রাস্তায় চুপচাপ বসে থাকতেন। নীরবে কাঁদতেন। গোয়েন্দা বিভাগের লোকেরা তাকে দেখতেন। তারা বুঝতে পারতেন, ছেলেটা কেন কষ্ট পায়। অনেককে উঠিয়ে দিলেও তাকে দিতেন না। একজন ঝাল মুড়িওয়ালা ছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা। তার সঙ্গে বন্ধুত্ব হয়েছিল চঞ্চল মাহমুদের। তিনি চঞ্চল মাহমুদকে ঝালমুড়ি খাওয়াতেন, পয়সা নিতেন না। তার স্ত্রী দুধ মালাই চা বানিয়ে ফ্লাস্কে ভরে দিতেন। তিনি চঞ্চল মাহমুদকে না দিয়ে সেই চা খেতেন না। পরবর্তী সময়ে সেই মুক্তিযোদ্ধাকে ২০ হাজার টাকা দিয়েছিলেন ব্যবসা করার জন্য। তার কথা খুব মনে পড়ে চঞ্চল মাহমুদের।

পঁচাত্তর সালেই চঞ্চল মাহমুদ সিদ্ধান্ত নিলেন, রঙিন কোনো কিছু আর পরবেন না। তার আলোকচিত্রের গুরু মনজুর আলম বেগ বলেছিলেন, কালো সব কিছু শুষে নেয়। তাই তিনিও অনেক কিছুই শুষে নিয়েছেন। শুধু পোশাকই নয়, তার স্টুডিও কিংবা বাসার প্রায় বেশির ভাগ জিনিসপত্রের রঙই কালো, এমনকি তার কাচের দরজাটাও। অনেকে তাকে বলেছেন, বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার তো শেষ হয়ে গেছে, এখন কালো পোশাক ছেড়ে দেন। চঞ্চল মাহমুদ তাদের বলেন, এটা তার নীরব প্রতিবাদ। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এটা তিনি ছাড়বেন না। এ কথা শুনলে হুজুররা হয়তো মাইন্ড করবেন। কাফনের কাপড়টা তো সাদা হবে, ওটা তো তিনি দেখতে পাবেন না। তাই মৃত্যু পর্যন্ত কালো পোশাকই পরবেন। তার এই কালো পোশাক পরা নিয়ে মানুষের প্রশ্ন কিংবা কৌতূহলেরও শেষ নেই। তার এক দাদি শাশুড়ি ছিলেন, চোখে কম দেখতেন। কালো পরেন দেখে বলতেন যে, ‘তোমার কি আর কোনো জামা-কাপড় নাই? একই ড্রেস সব সময় পরো।’ তিনি যে অ্যাপার্টমেন্টে০ থাকেন, সেখাকার লোকজনও তাকে এ রকম প্রশ্ন করতেন। পরে টেলিভিশনে তার সাক্ষাৎকার দেখে তাদের ভুল ভাঙে।

image

চঞ্চল মাহমুদ নিজেই তার পোশাক ডিজাইন করেন। এক অবসরপ্রাপ্ত আর্মি পারসন, তার গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি আছে। তিনিই তাকে এই কাপড় দেন। কোরিয়ান কাপড়। তার শার্ট ও প্যান্ট একই রঙের। এমনকি গেঞ্জিও। বিডিআর রাইফেলস স্কয়ারে জেসকো নামে একটি টেইলার্স আছে। তারাই তার জামা কাপড় বানায়। চঞ্চল মাহমুদের জামা কাপড়ের মাপ তাদের মুখস্ত। ফলে বারবার মাপ দিতে হয় না। তিনি সব সময় হাফশার্ট পরেন। হাতটা সাধারণ হাফ থেকে একটু নামানো।

তাকে প্রশ্ন করলাম, আপনি তো ছাত্রজীবনে গণবাহিনী ও জাসদের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। তারা তো বঙ্গবন্ধুকে কিছুটা অপছন্দ করতেন। জাসদ সমর্থন করেও বঙ্গবন্ধুকে ভালোবাসেন, এটা একটু কেমন হয়ে গেল না? চঞ্চল মাহমুদ বললেন, ‘আমি সমাজতন্ত্র বিশ্বাস করি। এই বিশ্বাস এখনো আমার আছে। এটা ছেড়ে যাইনি কখনো। বঙ্গবন্ধু কিন্তু শুধু আওয়ামী লীগের না; সবার। রাজনৈতিক মতাদর্শ থাকতে পারে। কিন্তু আমি তো সমাজতন্ত্রই করেছি। সেই সময়, যারা ভালো ছাত্র ছিল তাদের বেশির ভাগই কিন্তু সমাজতন্ত্র বিশ্বাস করত।

আপনি যে নীরবে এই প্রতিবাদটা করে যাচ্ছেন, আমাদের প্রধানমন্ত্রী কি জানেন ব্যাপারটা? চঞ্চল মাহমুদ বললেন, ‘আমার তো মনে হয় জানেন। উনার সঙ্গে যখন দেখা হয়েছিল, তখন বলেছিলাম। শেখ হাসিনা তখন বিরোধীদলীয় নেত্রী। ধানম-ি সুধা সদনে থাকতেন। তখন পত্রিকার জন্য তার ছবি তুলেছিলাম। আমাদের রিপোর্টার ছিলেন তার বান্ধুবী, তারা এক সঙ্গে ইডেন কলেজে পড়তেন। সাক্ষাৎকার শেষে খাওয়া-দাওয়ার পর তাকে বাগানে নিয়ে এসেছিলাম। উনি খুব বিনয়ী এবং বাগানে এসে তিনি আমার ছবি তোলার সুযোগ দিয়েছিলেন। মিতু [রায়না মাহমুদ] যখন ক্যানসারে আক্রান্ত হলো, তখন তার ফাইল নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে গিয়েছিলাম। তখনো বলেছি।

আপনার মতো আর কেউ আছে যারা নীরব প্রতিবাদ করেছে? হাসি দিয়ে বললেন, ‘আমি তো চঞ্চল মাহমুদকেই চিনি।’ কিছুক্ষণ পর বললেন, কাদের সিদ্দিকীর কথা। কাদের সিদ্দিকীর সাক্ষাৎকার নিয়েছিলেন তিনি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকা-ের পর কাদের সিদ্দিকী গরুর মাংস খেতেন না। মাংস কামড় দিলে নাকি তার মনে হতো বঙ্গবন্ধুর মাংসে কামড় দিয়েছেন। দিস ইজ অনলি পারসন অব বাংলাদেশ। আর দুজন ছিলেন সিরাজুল আলম খান আর খালেদ মোশাররফ। এই তিনজনের সঙ্গে তার ভালো যোগাযোগ ছিল।

বঙ্গবন্ধু তাকে একটা পতাকা উপহার দিয়েছিলেন। অর্ধ শতাব্দীকাল ধরে তিনি ওই পতাকাটা সযতেœ সংরক্ষণ করেছেন। একদিন তার স্ত্রী বলল, ফাঙ্গাস পড়ে গেছে, ধুয়ে দিই। চঞ্চল মাহমুদ বলছিলেন, ‘কী বলো! ধুলে তো বঙ্গবন্ধুর স্পর্শই চলে যাবে।’ আপনি যখন থাকবেন না, তখন পতাকাটার কী হবে? চঞ্চল মাহমুদ বললেন, ‘আমি যদি আমার স্ত্রীর আগে চলে যাই, তাহলে ও ওটা দেখে রাখবে। মিতু চলে গেলে এটা তুমি নিয়ে যেও।’

রায়না মাহমুদ বললেন, তুমি যে আবাহনীর অফিশিয়াল ফটোগ্রাফার ছিলে, সেটা বলো। চঞ্চল মাহমুদ বললেন, ‘আমি আবাহনীর ডাইহার্টেড সাপোর্টার ছিলাম। আবাহনী হারলে জ¦র উঠে যেত, সেই দিন ভাতই খেতে পারতাম না। আবাহনী ক্লাবে যেতাম শেখ কামাল ভাইয়ের জন্য। আবাহনীর সঙ্গে এক সময় এমন খাতির হয়ে গেল, যাতায়াত শুরু করলাম স্টেডিয়ামে। তিনজন পরিচালক পেয়েছিলাম আবাহনীতে। একজন আমার গুরু আজকের কাগজের লে. কর্নেল কাজী শাহেদ আহমেদ। তারপর ভোরের কাগজের সাবের হোসেন চৌধুরী আর অঞ্জন চৌধুরী পিন্টু; তারা তখন বিগ বস আবাহনীর। পরে পিন্টু ভাই বলে যে, তুমি বাসে যাও কেন, আমার সঙ্গে চলো। পিন্টু ভাইয়ের পাজেরোতে করে পরে স্টেডিয়ামে যেতাম। তখন ভক্তরা এত ডেসপারেট ছিল, আমি মোহামেডানের গোলপোস্টের দিকে যেতে পারতাম না। বলত, এ তো আবাহনীর ফটোগ্রাফার। ইট কিংবা গুলতি মারত। একদিন একটা পিঠে লেগেছিল, পাভেল রহমান ভাই কিন্তু আবাহনীর ফটোগ্রাফার ছিলেন, অনেক আগে, আমার আগে। আমি আবাহনীর ফটোগ্রাফি করতাম আটাশি-ঊননব্বইয়ের দিকে।

চঞ্চল মাহমুদের বাবাও মারা যান ২০১০ সালের ১৫ আগস্ট। সেই থেকে দুই শোক একসঙ্গে। তিনি ১৫ আগস্ট কোনো কাজ করেন না। রুম বন্ধ করে চুপচাপ বসে থাকেন। এক সময় অনুষ্ঠানে যেতেন। এখন ভালো লাগে না। কথা বলতে বলতে স্মৃতি হাতড়ে আবারও পেছনে চলে গেলেন। একবার বঙ্গবন্ধুর জন্মদিনের অনুষ্ঠানে গিয়েছিলেন। তার সঙ্গে তার বন্ধু বাচ্চু। এখন ইউরো হাটের মালিক। ফরিদপুরে বাড়ি। সে-ও তার মতো বঙ্গবন্ধুর জন্য পাগল ছিলেন। অনেক ছেলেমেয়ে দাঁড়িয়ে আছে। খাবারের সময় চলে যাচ্ছে। বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘আহারে আমার বাচ্চাগুলো রোদে।’ কাকে যেন বললেন, ‘আমার বাচ্চারা না খাইয়া থাকব?’ কিছুক্ষণের মধ্যে হক বিস্টুকের মালিক দুনিয়ার বিস্কুট পাঠিয়ে দিলেন। কয়েকজন বলল, ‘আপনি তো খেলেন না।’ বঙ্গবন্ধু বললেন, ‘তোরা খেলে আমার খাওয়া হয়। আহাহা...। শুনে লোম দাঁড়িয়ে গেছে। কেঁদে ফেলেছিলাম।’ চোখ মুছতে মুছতে চঞ্চল মাহমুদ বললেন, ‘আজ অনেক দিন পর আবার কাঁদলাম!’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত