৮৫ টাকা কেজির তেলাপিয়া পাঙ্গাশ বাজারে ২৫০ টাকা

আপডেট : ০৭ অক্টোবর ২০২৩, ০৬:১৮ এএম

বাজারে মাছের দাম বাড়ার তিনটি কারণ জানা গেছে বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কথা বলে। কিন্তু অস্বাভাবিক হারে বাড়ার পেছনে ওই সব কারণকে দায়ী করা যায় না চাষিদের সঙ্গে কথা বলে।

চাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তেলাপিয়া ও পাঙ্গাশ উৎপাদনে বর্তমানে তাদের খরচ হচ্ছে ৬৫-৭৫ টাকা। তারা আড়তে বিক্রি করছেন ৭৫-৮৫ টাকায়। কিন্তু সেই মাছ খুচরা বাজারে বিক্রি হচ্ছে ২৫০ টাকায়।

অন্যদিকে প্রাকৃতিক উৎস সাগরের লইট্টা মাছের দামও এখন ২৩০-২৪০ টাকা।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈরী আবহাওয়ার জন্য দুই বছর ধরেই নীরবে মাছ উৎপাদনে ভাটা পড়েছে। কিন্তু মাছের দাম বাড়ার পেছনে এর থেকে বড় কারণ ফড়িয়ারাদের দৌরাত্ম্য।

এক দশকে বিপুলসংখ্যক মানুষ মাছে চাষে যুক্ত হয়েছে। ফলস্বরূপ স্বাদুপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ বিশ্বে তৃতীয় অবস্থানে উঠে এসেছে। এতে প্রতি বছর গড়ে ৪৬ লাখ মেট্রিক টন মাছ উৎপাদন হচ্ছে। কিন্তু দেশের একশ্রেণির মানুষ ইলিশ বা রুই, কাতলার মতো দামি মাছ কিনতে পারছে। আর বেশিরভাগ মানুষকেই নির্ভর করতে হয় কম দামি চাষের সিলভার কার্প, পাঙ্গাশ ও তেলাপিয়া কিংবা সাগরের লইট্টা ও অন্যান্য মাছের ওপর।

তবে মূল্যস্ফীতি বাড়ায় নিম্ন আয়ের মানুষ ভরসার কম দামি সিলভার কার্প, তেলাপিয়া, পাঙ্গাশ বা লইট্টা মাছ কেনার সক্ষমতা হারিয়েছে। এতে করে শ্রমজীবী জনগোষ্ঠী পর্যাপ্ত আমিষ গ্রহণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৭-০৮ অর্থবছরে চেয়ে ৮৫ শতাংশের বেশি মাছ উৎপাদন হয়েছে ২০২১-২২ অর্থবছরে। এই ১৫ বছরে মাথাপিছু দৈনিক মাছ গ্রহণের পরিমাণ ৬০ গ্রাম থেকে বেড়ে হয়েছে প্রায় ৬৮ গ্রাম; অর্থাৎ চাহিদার পুরোটাই পূরণ হচ্ছে দেশের উৎপাদিত মিঠাপানির মাছ দিয়ে। কিন্তু একই সময়ে দেশের বাজারে উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে মাছের দাম। কোনো কোনো মাছে দাম এক-দুই গুণ বেড়েছে।

খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, বৈরী আবহাওয়ার জন্য দুই বছর ধরেই নীরবে মাছ উৎপাদনে ভাটা পড়েছে। কিন্তু মাছের দাম বাড়ার পেছনে এর থেকে বড় কারণ ফড়িয়ারাদের দৌরাত্ম্য।

মাছচাষিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ঘের কিংবা পুকুরে রেণু পর্যায় থেকে খাবার উপযোগী করা পর্যন্ত খাদ্য, ওষুধসহ এক কেজি মাছ উৎপাদন করতে ৬৫-৭৫ টাকা খরচ হয়। ১০-১৫ টাকা লাভে তারা আড়তে বিক্রি করেন কেজিপ্রতি ৭৫-৮৫ টাকা দরে।

বরিশাল জেলার মাছচাষি সুজন শরিফ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ২৩০ বিঘা ঘেরে তিনি ৬ বছর ধরে মাছ চাষ করছেন। প্রথম দিকে তেমন একটা খরচ না হলেও এখন দ্বিগুণ খরচ হচ্ছে। এক বছরে মাছের খাদ্যের দাম বেড়ে গেছে। সেটাও স্থির থাকছে না। ৪৫০-৫৫০ টাকা বস্তার খাদ্য কখনো কখনো ৭০০-৮০০ টাকা বা তারও বেশি দিয়ে কিনতে হয়। অন্যান্য খরচসহ এক কেজি তেলাপিয়া উৎপাদনে গড়ে খরচ হয় ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং পাঙাশ ৬০ থেকে ৭০ টাকা। চাষিরা আড়তে বিক্রি করেন ৭৫-৮৫ টাকায়। স্থানীয় পাইকার বা চাষির কাছ থেকে ঢাকার আড়ত পর্যন্ত খরচ ও লাভসহ পাঙাশ ও তেলাপিয়ার কেজিপ্রতি দাম ৯০-৯৫ টাকা। ঢাকার আড়ত থেকে ফড়িয়ারাও মাছ কিনে স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করে। আবার খুচরা বিক্রেতারা আড়ত থেকেও মাছ কেনে। খুচরা বাজার পর্যন্ত এই দুই জাতের এক কেজি মাছের দাম আকারভেদে সর্বোচ্চ ১৫০-১৭০ টাকা হতে পারে। খুচরা বাজারে আকারভেদে এই দুই মাছের দাম কেজিপ্রতি ২২০-২৫০ টাকা পর্যন্ত।

বাজার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ২০২১-২৩ সময়ে মাছের দাম সবচেয়ে বেশি বেড়েছে। বাজারে গড়ে সব ধরনের মাছে বেড়েছে ৩৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত। এর মধ্যে কেবল পাঙাশ মাছের দাম বেড়েছে ৯০ থেকে ১০০ শতাংশ, তেলাপিয়ায় ৬৬ থেকে ৯৮ শতাংশ ও লইট্টা মাছের কেজিতে বেড়েছে ১৩০ শতাংশ।

বাজার ঘুরে দেখা যায়, প্রতি কেজি তেলাপিয়া মাছ বিক্রি হচ্ছে ২৪০-২৫০ টাকায়; যা দুই বছর আগেও বিক্রি হয়েছে ১২০-১৫০ টাকার মধ্যে। প্রতি কেজি পাঙাশ বিক্রি হচ্ছে ২১০-২২০ টাকায়; যা দুই বছর আগেও বিক্রি হয়েছে ১০০-১২০ টাকায়। তবে লইট্টা মাছের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম দেখা গেছে। ৮০-১০০ টাকা কেজির লইট্টা বিক্রি হচ্ছে ২৩০-২৪০ টাকায়।

দেশের বাজারে হঠাৎ করে মাছের দাম বৃদ্ধির জন্য বৈরি আবহাওয়া, খাদ্য ও অন্যান্য সরঞ্জামের অস্বাভাবিক মূল্য বৃদ্ধিকে দায়ী করেছেন গবেষকরা। তারা বলছেন, সাধারণত এপ্রিল-জুনে বৃষ্টি হলে পানি বাড়ে। এ সময় দেশীয় মাছ খাল-বিলের পানিতে ডিম ছাড়ে ও প্রজনন করে। আর মে-আগস্ট সময়ে মাছের বৃদ্ধি ঘটে। শীতকালে মাছের খুব বেশি বৃদ্ধি হয় না। কিন্তু এ বছর এপ্রিল-জুলাই অনেকটা বৃষ্টিহীন ছিল। খাল-বিলগুলোয় পর্যাপ্ত পানি ছিল না। আবার আগস্ট থেকে যখন বৃষ্টিপাত শুরু হয়, তখন মাছের প্রজনন মৌসুম প্রায় শেষ। এটি যে কেবল চলতি বছর হয়েছে তা নয়। বিশ^জুড়ে প্রাকৃতিক বৈরী পরিস্থিতি চলছে দুই বছর ধরে। ফলে দেশের সামগ্রিক মৎস্য খাত নীরবে ঝুঁকির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান ও হালদা রিভার রিসার্চ ল্যাবরেটরির সমন্বয়ক অধ্যাপক ড. মনজুরুল কিবরিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশের বাজারে মাছের মূল্য বৃদ্ধির প্রধান কারণ মওসুমের শুরুতে চাষিদের পানি না পাওয়া। দ্বিতীয়ত, মাছের প্রজনন সময়ে ডিম ছাড়তে না পারা, তৃতীয়ত, দেশের বাজারে খাদ্যের দাম বেশি।

সময়মতো পানি না পাওয়ার বিষয় উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, বোয়াল, শোল, টাকিসহ দেশীয় প্রজাতির মাছ প্রথম বর্ষায় খালে-বিলে, পুকুর-ডোবায় ডিম ছাড়ে। দেশে প্রথম বর্ষণ শুরু হয় মার্চ-এপ্রিল-মে মাসের দিকে। কিন্তু গেল দুই বছর এ সময় বলতে গেলে বৃষ্টি হচ্ছেই না। এ কারণে দেশীয় প্রজাতির মাছের প্রজননকাল ব্যাহত হয়ে প্রাকৃতিক উৎসে মাছের সংকট দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া, চাষিরা সময়মতো পানি না পাওয়ায় তারাও বাণিজ্যিকভাবে মাছ উৎপাদন করতে পারেননি। প্রাকৃতিক উপায়ে চাষিদের রেণু উৎপাদনেরও একই সময়; অর্থাৎ দেশের মাছের চাষ মৌসুম শুরু হয় মে-জুন মাস থেকে। কিন্তু চলতি মৌসুমে মৌসুম শেষ হওয়ার এক মাস পরে চাষিরা পানি পেয়েছে; অর্থাৎ জুলাই থেকে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে, যা মাছ চাষের জন্য উপযুক্ত সময় নয়।

সমস্যা থেকে উত্তরণের উপায় হিসেবে এই গবেষক বলেন, ‘মৌসুম পরিবর্তন হওয়ায় হালদা নদীতেও মাছের উৎপাদন কমেছে। এর জন্য আমাদের কৃত্রিম পদ্ধতিতে এগিয়ে যেতে হবে। আমাদের গবেষণা চলমান রয়েছে। চাষিরা যেন সংকট থেকে উত্তরণের উপায়গুলো জানতে পারেন, সে জন্য সংশ্লিষ্টদের প্রযুক্তি উন্নয়নে নজর দিতে হবে।’

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত