নোবেল শান্তি পুরস্কারের ‘রাজনৈতিক ব্যবহার’

আপডেট : ০৯ অক্টোবর ২০২৩, ১২:৫৪ এএম

বলা হয়, শান্তিতে নোবেলপ্রাপ্তি সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পুরস্কার। একে রাজনৈতিক পুরস্কার হিসেবেও অভিহিত করেন অনেক সমালোচক। এ পুরস্কার ঘোষণার পর পাল্টাপাল্টি প্রতিক্রিয়া দেখায় বিভিন্ন পরাশক্তি। কেন নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে এত হইচই, তা নিয়ে লিখেছেন সালাহ উদ্দিন শুভ্র

চলতি বছর শান্তিতে নোবেল পেয়েছেন ইরানের নার্গিস মোহাম্মদী। বলা হচ্ছে, ইরানে নারীদের ওপর নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াই এবং সবার মানবাধিকার ও স্বাধীনতার জন্য আপসহীন সংগ্রামের স্বীকৃতি হিসেবে নোবেল কমিটি তাকে বেছে নিয়েছে। নোবেল কমিটি তাকে বলছে, ‘ফ্রিডম ফাইটার।’ তিনি ইরানে মৃত্যুদণ্ড বিলোপের জন্য সংগ্রাম করেছেন। বিশ্বের সর্বোচ্চ মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা দেশ হলো ইরান।

বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, ৫১ বছর বয়সী নার্গিস মোহাম্মদী ১৩ বার গ্রেপ্তার হয়েছেন। পাঁচ মামলায় তিনি দোষী সাব্যস্ত হয়েছেন এবং মোট ৩১ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত। তিনি বর্তমানে ‘অপপ্রচার ছড়ানোর’ দায়ে কারাবন্দি রয়েছেন। তার স্বামী তাগি রহমানি একজন রাজনৈতিক কর্মী। তিনি তাদের দুই সন্তানসহ প্যারিসে নির্বাসিত জীবনযাপন করছেন। স্ত্রী নার্গিসের সঙ্গে গত কয়েক বছরেও তার দেখা হয়নি।

স্ত্রীর নোবেল পাওয়ার খবরে তাগি রহমানি বিবিসিকে বলেন, আমরা খুব খুশি হয়েছি। এ পুরস্কার ইরানের চলমান নারী, জীবন, স্বাধীনতা আন্দোলনেরই অর্জন।

জেলে বসেও নার্গিস তার সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছেন। তিনি তেহরানের কারাগারে বসে গ্রেপ্তার সরকারবিরোধী নারী অধিকারকর্মীদের ওপর যৌন নিপীড়নের অভিযোগ আনেন। একই সময়ে ইরানে চলছিল পুলিশি হেফাজতে কুর্দি তরুণী মাসা আমিনির মৃত্যু নিয়ে তীব্র আন্দোলন। নার্গিসের লেখা ওই আন্দোলনে স্ফুলিঙ্গের কাজ করে।

হিজাব ‘ঠিকমতো’ না পরার অভিযোগে ২০২২ সালের সেপ্টেম্বরে মাশা আমিনি নামের ২২ বছর বয়সী এক তরুণী নীতি পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হন। পরে পুলিশ হেফাজতেই তার মৃত্যু হয়। এ ঘটনা নিয়ে গোটা ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে বিক্ষোভ। আরও স্বাধীনতার দাবি থেকে বিক্ষোভ শুরু হয়ে তা ক্রমশই পরিণত হয় সরকারবিরোধী বিক্ষোভে। যার এক বছর পর ইরানের নার্গিস শান্তিতে নোবেল পেলেন।

এ সময়ে নার্গিসকে নোবেল পুরস্কার দেওয়ার ঘটনাকে স্বাগত জানিয়েছেন ইরানের নারী অধিকারকর্মীরা। মাসা আমিনির মৃত্যুর পর নারী স্বাধীনতার আন্দোলনে ভাটা পড়ে। ইতিমধ্যে ইরান সরকার হিজাব নীতি ঘোষণা করেছে। এ অবস্থায় প্রগতিশীল নারীদের জন্য প্রয়োজন ছিল সমর্থন ও সাহস। নার্গিসের নোবেলপ্রাপ্তি যা তাদের জন্য উজ্জীবন হয়ে এসেছে। জো বাইডেনের যে নীতি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গণতন্ত্র ও উদারতার বার্তা পৌঁছে দেওয়া। নার্গিসের পুরস্কারপ্রাপ্তিকে সে হিসেবে দেখছেন অনেকে।

নার্গিসের সঙ্গে একই কক্ষে বন্দি ছিলেন নাজনিন জাগফারি। তিনি রবিবার রয়টার্সকে বলেন, ‘নার্গিসকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া ইরানের নারীদের লড়াইয়ের একটি বড় স্বীকৃতি এবং আমি মনে করি নার্গিস ইরানে এবং ইরানি নারীদের ওপর যে সমস্ত অন্যায় চলছে তার প্রতীক’।

ব্রিটিশ-ইরানি নাগরিক জাগফারিকে ইরানের কারাগার থেকে মুক্তি দেওয়া হয় গত বছর। তিনি তখন লন্ডনে ফিরে আসেন। বাবা-মাকে দেখতে যাওয়ার পথে তেহরান বিমানবন্দরে গ্রেপ্তার হয়েছিলেন।

ইরানের আরেক মানবাধিকারকর্মী শিরিন এবাদি ২০ বছর আগে শান্তিতে নোবেল পান। নার্গিস মোহাম্মদী এবাদির প্রতিষ্ঠিত ইরানের ডিফেন্ডার অফ হিউম্যান রাইটস সেন্টারের ভাইস-প্রেসিডেন্ট।

সেবারের মতো এবারও ইরান সরকার এই নোবেল পুরস্কারকে বলছে ‘রাজনৈতিক’।

মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ইরান সরকারের কাছে আহ্বান জানান নার্গিস মোহাম্মদীকে মুক্ত করে দেওয়ার। নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ের পর নার্গিসের ‘অদম্য সাহস’কে স্বাগত জানান বাইডেন।

তিনি এক বিবৃতিতে বলেন, ‘এ পুরস্কারটি একটি স্বীকৃতি যেÑ বিশ্ব এখনো স্বাধীনতা ও সমতার আহ্বান জানিয়ে নার্গিস মোহাম্মদীর কণ্ঠস্বর শুনতে পায়। আমি ইরানের সরকারকে অবিলম্বে তাকে এবং তার সহকর্মী লিঙ্গ সমতার প্রবক্তাদের বন্দিদশা থেকে মুক্তি দেওয়ার জন্য অনুরোধ করছি’।

বাইডেনের বিবৃতির প্রতিক্রিয়ায় ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অভিযোগ করেÑ নার্গিস মোহাম্মদীকে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান রাজনৈতিক পক্ষপাতদুষ্ট।

ওই মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র নাসের কানানি বলেন, ‘নোবেল শান্তি কমিটির পদক্ষেপ ইরানবিরোধী নীতির সঙ্গে সংগতিপূর্ণ রাজনৈতিক পদক্ষেপ।’

তারা বলেন, নোবেল শান্তি কমিটি বারবার আইন লঙ্ঘন এবং অপরাধমূলক কাজের জন্য দোষী সাব্যস্ত ব্যক্তিকে পুরস্কার দিয়ে আসছে। আমরা এটিকে পক্ষপাতদুষ্ট এবং রাজনৈতিকভাবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে নিন্দা জানাই।

নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। বিভিন্ন সময়ে পশ্চিমা শক্তি বিরোধী সরকারগুলো যে পুরস্কার নিয়ে বিতর্ক উত্থাপন করে তা এই নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে। অন্য ক্ষেত্রে নোবেল নিয়ে এত বিতর্ক দেখা যায় না। কেউ কেউ বলছেন, নোবেল শান্তি পুরস্কার নিয়ে যে রাজনীতি তা শুধু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তার বৈরী সম্পর্কের দেশগুলোর ভেতরই ঘটে না। বরং পূর্বের ওপর পশ্চিমের রাজনীতির একটি ‘টুল’ হলো এ নোবেল।

ইকোনমিক টাইমসের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, যদিও অরাজনৈতিক বলে আখ্যায়িত করা হয়, তবে বিশেষ করে শান্তি ও সাহিত্য পুরস্কার মাঝে মাঝে অত্যধিক রাজনৈতিক হওয়ার জন্য সমালোচনার মুখে পড়ে। সমালোচকরা বলে থাকেন, এ দুই ক্ষেত্রে বিজয়ীদের তাদের কাজের প্রকৃত শ্রেষ্ঠত্বের কারণে না বিচারকদের রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গির সঙ্গে খাপ খায় বলে নির্বাচিত হয়েছেন তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। যেমন ২০০৯ সালে প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা নোবেল শান্তি পুরস্কার পেয়েছিলেন ক্ষমতা গ্রহণের এক বছরেরও কম সময়ে। যা নিয়ে কঠোর সমালোচনা হয়। নরওয়েজিয়ান সরকার বা সংসদের সদস্যরা নোবেল কমিটিতে কাজ করতে পারেন না। এ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে এ ধারণা এড়াতে যে, নোবেল পুরস্কার নরওয়ের রাজনৈতিক নেতাদের দ্বারা প্রভাবিত। তারপরও, অন্যান্য অনেক দেশ নোবেল কমিটিকে নিরপেক্ষ বলে মনে করে না।

শান্তিতে নোবেল পুরস্কারের গুরুত্ব বুঝতে হলে অবশ্য কিছুটা পেছনে যেতে হবে। সংক্ষেপে বলতে হয়, তখন বিশ্বে চলছিল ‘ঠা-া যুদ্ধ’। এ সময়ে যুক্তরাষ্ট্রসহ তার ইউরোপীয় মিত্ররা গণতন্ত্রকে উপজীব্য করতে থাকে। অপরদিকে নোভিয়েত ইউনিয়ন, চীন এমন কিছু দেশ সমাজতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নেয়। সমাজতন্ত্র মানে গণতন্ত্র নয়, বিশ্বরাজনীতিতে এ বিষয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। গণতান্ত্রিক দেশগুলো পরস্পরের প্রতি বন্ধুভাবাপন্ন হয় এবং মানবাধিকার প্রতিষ্ঠাকে গুরুত্ব দেয়। গণতান্ত্রিক মানসিকতা কখনো যুদ্ধ ডেকে আনে না। অন্যদিকে সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোর কর্র্তৃত্ববাদী চরিত্র প্রকাশ পায়। যার বিপরীতে গণতন্ত্র, মানবাধিকার, উদারতাবাদের তত্ত্ব প্রচার করতে থাকে পশ্চিমা বিশ্ব। এ সময়ে অর্থনৈতিক বিধিনিষেধ আরোপকে একটি প্রক্রিয়া হিসেবে অবলম্বন করে পশ্চিম। তবে অর্থনৈতিক বিধিনিষেধই একমাত্র উপায় হতে পারে না। সেজন্য গুরুত্ব পেতে থাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার।

সমালোচকদের মতে, পশ্চিম বিশ্বাস করে যে তাদের সবকিছুই শান্তি উৎপন্ন করে; যেমন খ্রিস্টধর্ম, বাণিজ্য, পশ্চিমা প্রতিষ্ঠান, খেলাধুলা, ইংরেজির মতো ভাষা। তারা এসব একত্র করে এবং ‘শান্তির জন্য উপনিবেশবাদ’ কায়েম করে।

যেমন ২০১৪ সালে মালালা ইউসুফজাই এবং কৈলাশ সত্যার্থীকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়। ওই সিদ্ধান্তকে অত্যন্ত রাজনৈতিক এবং উচ্চাকাক্সক্ষী বলে অভিহিত করেন বিশ্লেষকরা। দ্য গার্ডিয়ানে ওই বছর লেখিকা লিপিকা পেহলাম লেখেন, এই পুরস্কারটি ‘একজন পাকিস্তানি মুসলিম এবং একজন ভারতীয় হিন্দুর’ মধ্যে ভাগ করা হয়েছে।

এ লেখিকার মতে, নোবেল কমিটির উদ্দেশ্য ছিল জঙ্গি আইএস, পাকিস্তান-আফগানিস্তানসহ ওই এলাকার চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে মালালার যে সংগ্রাম তার পক্ষ নেওয়া। অপরদিকে কৈলাস সত্যার্থীকে নোবেল দেওয়া হয় দরিদ্র, অধিকারবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য। লিপিকা পেহলাম বলতে চেয়েছেন, একদিকে উগ্রবাদ অপরদিকে অমানবিকতাÑ দুটোকেই চলমান বিশ্বের অন্যতম সংকট হিসেবে দেখিয়েছে নোবেল কমিটি। এর বিরুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যেতে ওই দুজনকে নোবেল দেওয়া হয়।

এ পর্যন্ত কারাবন্দি পাঁচ ব্যক্তিকে শান্তিতে নোবেল দেওয়া হয়। তারা হলেনÑ১৯৩৫ সালে শান্তিতে নোবেল পান জার্মান সাংবাদিক ও শান্তিবাদী কার্ল ভন ওসিয়েৎস্কি। তিনি নাৎসি কারাগারে বন্দি ছিলেন। ১৯৯১ সালে দেওয়া হয় মিয়ানমারের নেত্রী অং সান সু চিকে। তখন তিনি বার্মায় গৃহবন্দি ছিলেন। নোবেল শান্তি পুরস্কারে সবচেয়ে আলোচিত লিউ জিয়াওবো। তিনি ২০১০ সালে জেলে থাকা চীনা ভিন্নমতাবলম্বী। নোবেল পুরস্কার গ্রহণের জন্য তিনি হাজির হতে না পারলে একটি চেয়ারকে তার প্রতীকী হিসেবে পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।

বেলারুশের মানবাধিকারকর্মী অ্যালেস বিয়ালিয়াৎস্কি নোবেল পান ২০২২ সালে। ২০২১ সালের জুলাই থেকে যিনি কারাগারে ছিলেন।

 ২০১০ সালের শান্তিতে নোবেল নিয়ে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানায় চীন। চীন জানায়, লিউ জিয়াওবোকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া আবারও চীনের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় পশ্চিমা দেশগুলোর হস্তক্ষেপের জোরালো প্রচেষ্টার প্রতিফলন। চীনকে দুর্বল করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, তার মিত্র এবং কোম্পানিগুলোর ধারাবাহিক পদক্ষেপের অংশ। চীন এই শান্তি পুরস্কারকে ‘পশ্চিমা হাতিয়ার’ হিসেবে অভিহিত করে। তারা বলে, যুক্তরাষ্ট্র এর মাধ্যমে চীনের বিচারব্যবস্থা, গণতান্ত্রিক নীতিকে অবজ্ঞা করেছে।

লিউ জিয়াওবো ২০০৮ সালের শেষের দিকে চীনে গণতান্ত্রিক সংস্কারের আহ্বান জানান। তিনি কমিউনিস্ট শাসনের অবসান দাবি করেন। তাকে বন্দি করা হয় এবং ১১ বছরের কারাদণ্ড দেয় চীনের আদালত। তার স্ত্রী লিউ জিয়া বেইজিংয়ে গৃহবন্দি হন।

বিশ্বজুড়ে সমালোচনা রয়েছে যে, ফিলিস্তিনে নিজেদের জমি ফিরে পাওয়ার সংগ্রামে নিয়োজিত যে ব্যক্তি ইসরায়েলের কারাগারে বন্দি রয়েছেন অথবা হিরোশিমার মেয়র যিনি শান্তি স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছিলেন তাকে কেন নোবেল দেওয়া হয়নি। এ ক্ষেত্রে আলোচনা করা হয় নরওয়ের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা আরনে ট্রেহোল্টকে নিয়ে।

নোবেল পুরস্কার নিয়ে এত আলোচনার একটি কারণ বিশাল অঙ্কের পরিমাণে নগদ অর্থ। নোবেল ফাউন্ডেশন এ বছর পুরস্কারের অর্থ ১০ শতাংশ বাড়িয়ে ১১ মিলিয়ন ক্রোনার (প্রায় ১ মিলিয়ন ডলার) করেছে। অর্থ ছাড়াও, বিজয়ীরা ডিসেম্বরে এক অনুষ্ঠানে তাদের নোবেল পুরস্কার সংগ্রহ করার সময় একটি ১৮ ক্যারেটের স্বর্ণপদক পান।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত