বিশ্বকাপে এ কোন অস্ট্রেলিয়া!

আপডেট : ১৬ অক্টোবর ২০২৩, ১০:৪৩ পিএম

হলুদ জার্সিটা আছে ঠিকই। কিন্তু সেই অদম্য ঔদ্ধত্য, সেই অপরাজেয় থাকার অহম উধাও! অস্ট্রেলিয়া মানেই ছিল বিশ্বমঞ্চে হার না মানা, অস্ট্রেলিয়া মানেই শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়ে যাওয়া, খাদের কিনারা থেকে ফিরে আসা। সেই অস্ট্রেলিয়ার এ কী বেহাল দশা। ২০১৯ সালের ২৯ জুনের পর বিশ্বকাপে টানা চার হারের পর গতকাল দেখেছে জয়ের মুখ। অথচ বিশ্বকাপে সবচেয়ে বেশি ম্যাচ অপরাজেয় থাকার রেকর্ড অস্ট্রেলিয়ারই। ২৩ মে, ১৯৯৯ বিশ্বকাপের গ্রুপ ম্যাচে পাকিস্তানের কাছে হারার পর অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে পরের ম্যাচটা হেরেছিল ২০১১ সালের ১৯ মার্চ। প্রায় ১২ বছর, ৩২ ম্যাচ অপরাজিত থাকা অস্ট্রেলিয়া বিশ্বকাপে টানা ৪ ম্যাচ হেরেছে (গতকালের আগ পর্যন্ত)।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচটা অস্ট্রেলিয়ার বিশ্বকাপেই ৯৮তম ম্যাচ। এর আগে ৮৭ ম্যাচে ৬৮ জয়, ২৫ হার আর একটি করে ম্যাচ হয়েছে টাই এবং পরিত্যক্ত। বিশ্বকাপের সফলতম দল, পাঁচটা শিরোপা যাদের ঘরে সেই অস্ট্রেলিয়াকে এবারের বিশ্বকাপে মনে হচ্ছে অতীতের ছায়া। শুধু বিশ^কাপেই নয়, বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয়ের পর অ্যাশেজে প্রথম দুই টেস্ট জেতার পর যেভাবে প্যাট কামিন্সের দল পিছু হটল তার রেশ দেখা গেছে দক্ষিণ আফ্রিকা সফরেও। ৫ ওয়ানডের সিরিজে, প্রথম ২ ম্যাচ জেতার পর টানা ৩ ওয়ানডেতে হার। বিশ্বকাপের আগে ভারতের বিপক্ষে ওয়ানডে সিরিজে ২-১ ব্যবধানে হার। বিশ^কাপে ভারত এবং দক্ষিণ আফ্রিকা, দুই দলের বিপক্ষে খেলে কোনো ম্যাচেই ২০০ রানও করতে পারেনি অস্ট্রেলিয়া। অথচ দলে ডেভিড ওয়ার্নার, স্টিভ স্মিথ, মারনাস লাবুশেন, মিচেল মার্শ, গ্লেন ম্যাক্সওয়েলরা সবাই আছেন।

এ বছর শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ম্যাচের আগ পর্যন্ত অস্ট্রেলিয়া খেলেছে ১৫টি ওয়ানডে, জিতেছে মাত্র ৫ ম্যাচে আর হেরেছে ৯ ম্যাচে। এ বছর অস্ট্রেলিয়ার ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং কোনোটাই ভালো হচ্ছে না। আগে ব্যাট করে অস্ট্রেলিয়া ৪ বার ২০০ রানের নিচে অলআউট হয়েছে। মার্চে ওয়াংখেড়েতে ভারতের বিপক্ষে ১৮৮ রানে অলআউট, সেপ্টেম্বরে জোহানেসবার্গে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ১৯৩ রানে অলআউট। এরপর বিশ্বকাপে ভারতের বিপক্ষে ১৯৯ রানে অলআউট ও প্রোটিয়াদের বিপক্ষে ১৭৭ রানে অলআউট।

অন্যদিকে বোলাররা রান বিলিয়েছেন দেদার । কাল শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে পরের দিকে ঘুরে দাঁড়ালেও শুরুতে অস্ট্রেলিয়ার বোলারদের সহজেই খেলছিলেন কুশল পেরেরা ও পাথুম নিশাঙ্কা। উদ্বোধনী জুটিতে তারা জুড়েছিলেন ১২৫ রান। এ বছর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৮ বার কমপক্ষে ১০০ রানের জুটি হয়েছে, যার ভেতর দুটো আছে ২০০ রানের। হেইনরিখ ক্লাসেন আর ডেভিড মিলারের ৯৪ বলে ২২২ রানের দানবীয় কীর্তি যেমন আছে, তেমনি ২ রানে ৩ উইকেট পতনের পর বিরাট কোহলি আর লোকেশ রাহুলের ঘুরে দাঁড়ানোর সাক্ষী ১৬৫ রানও আছে। এই বিশ^কাপে অস্ট্রেলিয়া খেলেছে ৩ ম্যাচ। প্রতি ম্যাচেই প্রতিপক্ষ কমপক্ষে ১০০ রানের একটা জুটি গড়েছে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। কোহলি-রাহুল, টেম্বা বাভুমা-কুইন্টন ডি কক এবং সবশেষ কাল পেরেরা-নিশাঙ্কা। অন্যদিকে প্রথম দুই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার ১১ ব্যাটসম্যান মিলেও রানটা ২০০তে নিতে পারেননি।

ফিল্ডিংয়ের অবস্থাও করুণ। ভারতের বিপক্ষে মিচেল মার্শ কোহলির ক্যাচটা ধরতে পারলে হয়তো বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার এ চেহারাই দেখতে হয় না। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে পড়েছে ৬টা ক্যাচ।

একটা সময় অস্ট্রেলিয়া দলে জায়গা পেতে হলে অনেক কাঠখড় পোড়াতে হতো। মাইক হাসি, ড্যারেন লেহম্যানরা ঘরোয়া ক্রিকেটে বছরের পর বছর ভূরি ভূরি রান করেও দলে আসতে পারতেন না। অন্যদিকে এখন চার বছর ধরে ওয়ানডেতে কোনো হাফসেঞ্চুরি না করেও দিব্যি খেলে যাচ্ছেন অস্ট্রেলিয়া দলে। মার্কাস স্টয়নিসের সবশেষ ওয়ানডে হাফসেঞ্চুরি ২০১৯ সালের মার্চে। ৪০ ইনিংস আগে হাফসেঞ্চুরি করা একজন অলরাউন্ডার দিব্যি খেলে যাচ্ছেন অস্ট্রেলিয়া দলে, যেটা স্টিভ ওয়াহ জমানায় তো দূরে থাক, মাইকেল ক্লার্ক আমলেও ভাবা যেত না।

সাবেক অধিনায়ক এবং বিশ্বকাপজয়ী ক্লার্ক মনে করেন, প্যাট কামিন্স অধিনায়ক হিসেবে যথেষ্ট আক্রমণাত্মক নন। উইকেট তোলার বদলে রান আটকানোতে আগ্রহী, ‘রান আটকানোর সহজতম উপায় হচ্ছে উইকেট নেওয়া। ওয়ানডে এবং টি-টোয়েন্টি, দুই খেলাতেই তবুও আমরা রান আটকানোর চেষ্টা করে যাচ্ছি। কামিন্স নিজে কেন প্রথম ১০ ওভারে বোলিংয়ে আসে না?’ বলছিলেন ক্লার্ক।

আইসিসির সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলো বিশ্বকাপে দারুণ সরব। খেলোয়াড়দের নিয়ে তারা তৈরি করছে নানান কনটেন্ট। সেসবে বিরাট কোহলি আর রোহিত শর্মাকে নিয়ে অস্ট্রেলিয়ান ক্রিকেটারদের যে মুগ্ধতা, সেরা ফরমের শচিন টেন্ডুলকারকে নিয়েও অমনটা করেননি সেই সময়ের অস্ট্রেলিয়া দলের কেউ। তাহলে কি আইপিএলই যুদ্ধংদেহী মনোভাবটা মুছে দিল অস্ট্রেলিয়ার? একসঙ্গে খেলার সুবাদে রোহিত আর ক্যামেরন গ্রিন, কোহলি আর ম্যাক্সওয়েলরা অন্তরঙ্গ। ডেভিড ওয়ার্নার তো ভারতের প্রেমেই পড়ে গেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভারতীয় গানের সঙ্গে সপরিবারে নাচের ভিডিও দেন কদিন পরপরই। শেষ পর্যন্ত কি তাহলে টাকার কাছেই হেরে গেল হলুদ জার্সির অহম। নাকি হলুদের নতুন নাম চেন্নাই সুপার কিংস, অস্ট্রেলিয়া বাদ।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত