ইডেন গার্ডেনসের সবুজ গালিচায় পা রেখে কিউরেটরের সঙ্গে একটু কথা বলেই সোজা উইকেটের দিকে হাঁটা দিলেন চন্ডিকা হাথুরুসিংহে। আগেই সেখানে নির্বাচক হাবিবুল বাশারকে নিয়ে হাজির ছিলেন শ্রীধরন শ্রীরাম। একটু পর যোগ দিলেন বোলিং কোচ অ্যালান ডোনাল্ড। বাংলাদেশ দলের থিংকট্যাংকরা বেশ ভালো করে চেষ্টা করছিলেন উইকেটের চরিত্র বোঝার। এই উইকেটেই আজ তাদের শিষ্যদের পেতে হবে নতুন এক অভিজ্ঞতা। টানা পাঁচ হারে বিশ্বকাপের আশা শেষ। বিশ্বকাপ মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাই বাংলাদেশ দল তাকিয়ে দূরের চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে। ২০২৫ সালে পাকিস্তানে হতে যাওয়া আট দলের আসরে সুযোগ পেতে বিশ্বকাপ শেষ করতে হবে র্যাংকিংয়ের সেরা আটে থেকে। সেই লক্ষ্য পূরণে সামনের তিন ম্যাচে জয় চাই। পাকিস্তান আয়োজক বলে, তাদের ভাবনায় বাংলাদেশের মতো চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি নেই। তাদের ভাবনায় শুধুই চলতি বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল। শেষ চার ম্যাচ হেরে তারাও খুব ভালো অবস্থানে নেই। ইডেনে আজ তারাও নামবে জয়ে ফিরতে, সেমির স্বপ্ন বাঁচিয়ে রাখতে। তাই লক্ষ্য ভিন্ন হলেও, ম্যাচের গুরুত্ব দু’দলের জন্যই অভিন্ন।
নেদারল্যান্ডসের কাছে ৮৭ রানে হারের রাতে সংবাদ মাধ্যম সামলানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে নিয়েছিলেন অধিনায়ক সাকিব আল হাসান। গতকালও তিনিই এলেন। তবে সে রাতের মতো শূন্য দৃষ্টি ছিল না। বরং ঝড়ের পরে নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন তার চোখে-মুখে। বিশ্বকাপের লক্ষ্য পূরণ হয়নি, সামনে তাই চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে জায়গা করার নতুন লক্ষ্য গড়ে এখন সদলবলে ঝাপাতে চান। আগের পাঁচ ম্যাচে কেটে যাওয়া সুরটা ফেরাতে নিজেদেরই নিতে হবে দায়িত্ব। তাই দুঃস্বপ্নের সেই হার ভুলে তাকাতে চাইছেন সামনের দিকে। যদিও কাজটা সহজ নয়। পাকিস্তানের পিঠ ঠেকে গেছে দেয়ালে। সেমিফাইনালের লক্ষ্য পূরণের পথে তাদের সামনে যে তিন ম্যাচ আছে, তাতে ঘুড়ে দাঁড়াতে হবে। ঘুড়ে দাঁড়ানোর পথে আজই তারা পাচ্ছে অপেক্ষাকৃত সহজ প্রতিপক্ষ। এরপর ম্যাচ দুটি নিউজিল্যান্ড ও ইংল্যান্ডের বিপক্ষে। বাবর আজমদের তাই বাংলাদেশকেই করতে হচ্ছে লক্ষ্যবস্তু।
এই মাঠে দু’দল একবারই মুখোমুখি হয়েছিল। সেটা অন্য ফরম্যাটে, ২০১৬ সালে টি-২০ বিশ্বকাপে। যে ম্যাচটায় পাকিস্তানের জয় সহজে, ৫৫ রানের ব্যবধানে। দু’দলের শেষ দেখায়ও জয়ের হাসি পাকিস্তানিদের। লাহোরে এশিয়া কাপে জয় ৭ উইকেটে। সেই ম্যাচে বাংলাদেশের ব্যাটাররা আগে ব্যাট করে তুলেছিল মাত্র ১৯৩ রান। যা সাড়ে ১০ ওভার হাতে রেখে টপকে যায় স্বাগতিকরা। তাছাড়া শেষ ম্যাচে দক্ষিণ আফ্রিকাকে কঠিন পরীক্ষায় ফেললেও শেষ পর্যন্ত এক উইকেটে হেরে যায় পাকিস্তান।
সাকিব নিজেদের সামনে নতুন লক্ষ্য নির্ধারণ করে বিশ্বকাপ দুঃসময়কে পেছনে ফেলতে চাইছেন। বাংলাদেশ অধিনায়কের কথায় খুব বোঝা গেল ডাচদের কাছে তিন দিন আগে সর্বস্ব খুইয়ে গোটা দল নিজেদের হারিয়ে খুঁজছে। ব্যাটিংটা কেন মনমতো হচ্ছে না, কেনই বা প্রতি ম্যাচে তাসের ঘরের মতো ঝড়ে পড়ছে ব্যাটিং অর্ডার, সেই সব প্রশ্নের উত্তর মাঠ থেকেই খুঁজে নিতে হবে। মুখের কথায় কিছু হবে না, সেটা নিজেই মনে করিয়ে দিলেন। ডাচদের কাছে হার নিয়ে সে রাতে যত প্রশ্ন হয়েছে, তার চেয়েও বেশি হয়েছে দলের দুর্দশা, বড় মঞ্চে সামর্থ্যরে অভাব নিয়ে। প্রশ্ন হয়েছে মাঠের বাইরে ঘটা অনেক ঘটনা নিয়েও। একে একে সব প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন। সাংবাদিকদের বলা অনেক কথা মেনেও নিয়েছিলেন। তবে দু’দিন পর এসে এই ম্যাচে ও পরের দুই ম্যাচ বাদে সব প্রশ্নই সাকিবের কাছে অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়েছে। বোঝা গেছে, দূর ভবিষ্যৎ ভাবনা ভুলে দলটা চাইছে ঘুড়ে দাঁড়াতে। লক্ষ্য নিয়ে জানতে সাকিবের সোজা-সাপটা উত্তর, ‘লক্ষ্য কালকের ম্যাচ খেলা এবং জয়ের চেষ্টা করা। নিজেদের সেরাটা চেষ্টা করা ও ২ পয়েন্ট পাওয়া।’ আগের পাঁচ হারের ধাক্কা কীভাবে সামলে পাকিস্তানকে হারাবেন, এমন প্রশ্নে সাকিব বলেছেন, ‘আমরা এসব নিয়ে আলোচনা করেছি টিম মিটিংয়ে। কি করে এই পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটানো যায়, এসব নিয়ে কথা হয়েছে। আমাদের আসলে মাঠেই প্রমাণ করতে হবে, মুখের কথায় কিছু হবে না।’
শেষ দু’দিনে যতটা না মাঠের প্রস্তুতি হয়েছে, তারচেয়ে বেশি হয়েছে মানসিক প্রস্তুতি। একটা দিকভ্রান্ত দলকে পথের দিশা খুঁজে নিতে যা যা দরকার তার সবকিছুই করা হয়েছে। এবার মাঠেই প্রমাণ দিতে হবে। নইলে চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে জায়গা পাওয়ার নতুন লক্ষ্যটাও পূরণ হবে না। সাকিবের কথায়, ‘আসলে আমরাই এই পরিস্থিতি পরিবর্তন ঘটাতে পারি এবং সেটা কেবল আমাদের খেলা দিয়েই। আমার চেয়েও বেশি পুরো দল তাদের করণীয় নিয়ে কথা বলছে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফি খেলতে হলে আমাদের জিততে হবে। এটা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ একটা লক্ষ্য আমাদের জন্য। সেই লক্ষ্য পূরণে জয় ছাড়া আমাদের আর কোনো বিকল্প নেই। তাই যার যার জায়গা থেকে নিজেদের মোটিভেটেড করতে হবে। আমরা নিজেরাই পারি নিজেদের ফর্মে ফেরাতে। ক্রিকেট টিম গেম হলেও ব্যক্তিগতভাবেও আপনাকে পারফর্ম করতে হয়। তারপর সমষ্ঠিগতভাবে দল পারফর্ম করে। আমাদের ব্যক্তিগতভাবে পারফর্ম করার দায়িত্ব।’ কেবল চ্যাম্পিয়নস ট্রফি নয়, একটা নিদেন পক্ষে একটা স্বস্তি নিয়ে দেশে ফিরতে মরিয়া সাকিব আরও বলেন, ‘চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি অবশ্যই লক্ষ্য, তবে যতটা ওপরে শেষ করা যায়, সেটাও চাই। আমরা বিশ্বকাপে যতটা আশা করেছিলাম, সেটা হয়নি। এখান থেকেও যদি আমরা ভালোভাবে খেলতে পারি, ভালো একটা রেজাল্ট যদি আমাদের পক্ষে আসে, তাহলেও হয়তো একটা স্বস্তি নিয়ে ফিরতে পারব। তখন হয়তো আমরা পর্যালোচনা করতে পারব কী কী করলে আরও ভালো হতো।’
সংবাদ সম্মেলনে দলের বড় মঞ্চে খেলার সামর্থ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, হয়েছে ঘরের মাঠে স্পোর্টিং উইকেট না বানানো নিয়ে প্রশ্ন। বিশ্বকাপের প্রস্তুতির ঘাটতি নিয়েও জানতে চাওয়ার ছিল সাংবাদিকদের। সাকিব এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে চাইছেন বিশ্বকাপ শেষে। এখন শুধুই তাদের ভাবনায় পাকিস্তান। যাদের হারাতে পারলে অন্তত একটা আত্মবিশ্বাস নিয়ে ধরা যাবে দিল্লির বিমান।
আছে ভালো করার বিশাল চাপ। এ রকম ম্যাচের আগেই তাই চাপমুক্ত থাকাটা জরুরি। সাকিব নিজের মতো স্থানীয় সংবাদ মাধ্যমকেও চাইলেন চাপমুক্ত রাখতে। বিশ্বকাপে পাকিস্তানের দূরাবস্থার কথা মনে করিয়ে এক সাংবাদিকের প্রশ্নে হেসে দিয়ে বললেন, ‘তারাও তো ভাবতে পারে বাংলাদেশ পাঁচ ম্যাচ হেরে এসেছে। তারাও তো সুবিধা খুঁজে নিতে পারে (হাসি)।’ সাকিবের সেই হাসি মুহূর্তে ছড়িয়ে যায় ইডেনের সংবাদ সম্মেলন কক্ষের সবার মধ্যে। সেটা দেখে আসন ছাড়তে ছাড়তে বলে উঠলেন, ‘মাঝে মাঝে হাসিরও দরকার আছে।’ সত্যি বললে ডাচরা সাকিবদের মুখের হাসি কেড়ে নিয়েছে। সেটা ফেরাতে ইডেনের উইকেটে ব্যাটে-বলে হাসতে হবে সাকিবদের।