কালাজ্বর নির্মূলে বিশ্বে প্রথম দেশ বাংলাদেশ

আপডেট : ০১ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:১০ এএম

কালাজ্বর নির্মূলে বিশ্বের প্রথম কোনো দেশ হিসেবে বাংলাদেশ স্বীকৃতি পেয়েছে। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ভারতের দিল্লিতে ডব্লিউএইচওর ৭৬তম দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক সম্মেলনে বাংলাদেশকে এ স্বীকৃতি দেয় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও)। স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেকের হাতে এই স্বীকৃতির সনদ তুলে দেন ডব্লিউএইচওর দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালক পুনম খেত্রপাল। এ সময় ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক উপস্থিত ছিলেন। এর আগে গত এপ্রিলে ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগ এবং তারও আগে পোলিও নির্মূলে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার স্বীকৃতি পায় বাংলাদেশ।

এই অর্জনকে ‘জাতিগত প্রশংসিত অর্জন’ বলে অভিহিত করেছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, এই অর্জনে দেশের স্বাস্থ্য খাতসহ আমরা সবাই গর্বিত। স্বাস্থ্যমন্ত্রী এই অর্জনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ পরামর্শ ও নির্দেশনার কথা উল্লেখ করেন। পাশাপাশি তিনি ডব্লিউএইচওর মহাপরিচালক ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার আঞ্চলিক পরিচালকের প্রতি বিশেষ কৃতজ্ঞতা জানান।

কালাজ্বর নির্মূলে লেগেছে ১৬ বছর : এ ব্যাপারে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সহকারী পরিচালক এবং ফাইলেরিয়াসিস ও কালাজ্বর নির্মূল কর্মসূচির প্রোগ্রাম ম্যানেজার ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান গতকাল মঙ্গলবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেলেমাছির কামড়ে এই রোগ হয়। পরজীবী-ঘটিত রোগগুলোর মধ্যে এটি দ্বিতীয় প্রাণঘাতী রোগ, ম্যালেরিয়ার পরেই এর স্থান। রোগটি নির্মূলে সব মিলে ১৫-১৬ বছর সময় লাগল।

ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান বলেন, রোগটির প্রাদুর্ভাব অনেক পুরনো। যশোর যখন ভারতের পশ্চিম বাংলার অংশ ছিল, তখন থেকেই এই রোগের প্রাদুর্ভাব। যখন কোনো দেশে কোনো রোগে প্রতি ১০ হাজার জনসংখ্যার মধ্যে একজনেরও কম রোগী পাওয়া যায়, তখনই সেটাকে ‘পাবলিক হেলথ এলিমিনেশন’, অর্থাৎ রোগটি নির্মূল বলে ধরে নেওয়া হয়। ২০১৭ সাল থেকে বাংলাদেশে ১০ হাজার জনগোষ্ঠীতে রোগীর সংখ্যা ১-এর নিচে।

এই বিশেষজ্ঞ কর্মকর্তা বলেন, বিশ্বের ৭০-৮০ দেশে এই রোগ রয়েছে। আমাদের পাশর্^বর্তী দেশ ভারত, শ্রীলঙ্কা, ভুটান, নেপাল, থাইল্যান্ডে আছে। সারা বিশ্বে কোনো দেশ এই স্বীকৃতি পায়নি। এ বছরের গত ১২ অক্টোবর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার পর্যবেক্ষক দলের কাছে এ ব্যাপারে আমরা সব তথ্য উপস্থাপন করি। এর আগে আমি প্রথমে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার কান্ট্রি অফিসে আবেদন করি। তারপর টিম আসে পর্যালোচনা করার জন্য। ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন জেলায় যাই। তারা সেগুলো যাচাই-বাছাই করে। এই টিম ডব্লিউএইচওর আঞ্চলিক পরিচালককে রিপোর্ট করে। পরে এই স্বীকৃতি পায় বাংলাদেশ।

এই কর্মকর্তা আরও বলেন, এ রোগটি এখন শূন্যের কোঠায়। বাংলাদেশে এই রোগের চিকিৎসাব্যবস্থা এত উন্নত যে একটি সিঙ্গেল ডোজ ইনজেকশন দিলে রোগী ভালো হয়ে যায়। আর যদি রোগটার ডায়াগনসিস ও চিকিৎসা না হয় তাহলে ৯০ শতাংশ রোগী মারা যাবে।

এর আগে বাংলাদেশ গোদ রোগ নির্মূলের স্বীকৃতি পেয়েছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ৬ মাসের মধ্যে দুটি রোগ নির্মূল করতে সক্ষম হলো। কালাজ্বরের আগে গোদ রোগ নির্মূলের স্বীকৃতি পেয়েছি। এই রোগ বহু পুরনো। এটি ক্রান্তীয় অঞ্চলের সংক্রামক রোগ, যা সুতার মতো একজাতের গোলকৃমি দ্বারা সংঘটিত হয়। বাংলাদেশের ২০০০ থেকে ২০২৩ সাল ২৩ বছর লেগেছে এই রোগ নির্মূল করতে।

ডা. এম এম আক্তারুজ্জামান আরও বলেন, ২০০১ সাল থেকে রোগটি নির্মূলে কাজ শুরু করে সরকার। সে বছর দেশের ৬৪ জেলার মধ্যে ১৯টি জেলায় ফাইলেরিয়া রোগের সংক্রমণের হার ছিল সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ। জেলাগুলো হলো পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বরিশাল, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর ও চুয়াডাঙ্গা। এসব জেলায় ২০০১ সাল থেকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নিয়মানুযায়ী, বছরে একবার করে ধারাবাহিকভাবে কমপক্ষে ৫ বছর সার্বিক জনগোষ্ঠীকে গণ-ওষুধ সেবন করানো হয়। একপর্যায়ে ২০২২ সালে সংক্রমণের হার ১ শতাংশের নিচে নেমে আসে। সে বছর বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে এ-সংক্রান্ত তথ্য পাঠানো হয়। পরে এ বছরের ৫ মে বাংলাদেশকে ফাইলেরিয়ামুক্ত বা নির্মূল ঘোষণা করে সংস্থাটি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত