রাজনৈতিক সমঝোতা

তৃতীয়পক্ষ উদ্যোগ নিলে আলোচনার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে

আপডেট : ০৯ নভেম্বর ২০২৩, ০১:১২ পিএম

আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট সংকট নিরসনে বিদেশিদের জোরালো চাপ আছে। দেশের ভেতরেও বিভিন্ন মহল সমঝোতার কথা বলছেন। কিন্তু সমঝোতার লক্ষ্যে সরকার ও বিরোধীপক্ষগুলোকে আলোচনার টেবিলে বসানোর উদ্যোগ দৃশ্যমান নয়।

সংকট সমাধানে সরকারের পক্ষ থেকে এগিয়ে আসা দরকার বলে মনে করছেন কেউ কেউ। আর সেটা দেশ ও দেশের জনগণের স্বার্থেই। সরকারি দল হিসেবে আওয়ামী লীগকেও এগিয়ে আসার কথা বলছেন তারা।

আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংলাপের চাপ আছে ঠিকই। কিন্তু দুই দলকে অনমনীয় অবস্থান থেকে সরিয়ে সংলাপের টেবিলে বসাতে উদ্যোগ নিতে কেউ এগিয়ে আসছে না। সেজন্যই মূলত সংলাপের জট খুলছে না। তারা বলছে,তৃতীয় কোনো পক্ষ উদ্যোগ নিলে হয়তো এই জট খুলবে।

গত ৩১ অক্টোবর ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে বৈঠকের পর শর্তহীন সংলাপে বসার জন্য সব দলের প্রতি আহ্বান জানান। ওইদিন ঢাকায় ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুকও আওয়ামী লীগের প্রতি সংলাপের তাগিদ দেন। এর আগে জুলাই মাসে মার্কিন আন্ডার সেক্রেটারি আজরা জেয়া ঢাকা সফরে সংলাপের বিষয়টি সামনে আনেন। আওয়ামী লীগের মধ্যে শর্তহীন সংলাপের ব্যাপারে নমনীয় অবস্থান দেখা গেলেও শর্তের কারণে বিএনপি সংলাপে বসতে অস্বীকৃতি জানিয়ে আসছিল।

অবশ্য পিটার হাসের আহ্বানের পর তা নাকচ করে দেন আওয়ামী লীগ সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তারপরও আওয়ামী লীগ নেতাদের কেউ কেউ এবং সরকারের দুই-একজন মন্ত্রীও নমনীয়তা প্রকাশ করে। কিন্তু ২৮ অক্টোবর বিএনপির মহাসমাবেশ ঘিরে সহিংসতা ও পরবর্তী সময়ে হরতাল ও অবরোধ কর্মসূচিতে আগুন, ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। প্রাণ হারায় একজন পুলিশ সদস্যসহ অন্তত ১০ জন। এর পরিপ্রেক্ষিতে সরকার কঠোর অবস্থান নেয়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী বিএনপির মহাসচিব ও বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গ্রেপ্তারের পাশাপাশি নিচের সারির বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে গ্রেপ্তার করে। এসব সহিংসতা ও গণগ্রেপ্তারের ঘটনায় জাতিসংঘ, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন উদ্বেগ জানায়। পাশাপাশি তারা সবপক্ষের সমঝোতার ওপর গুরুত্বারোপ করে। এসব দেশ ও সংস্থা বাংলাদেশে সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের তাগিদ দিয়ে আসছে। 

তবে বিএনপিকে সন্ত্রাসী দল আখ্যা দিয়ে তাদের সঙ্গে সংলাপের কোনো সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের।

অন্যদিকে, শর্ত জুড়ে দিয়ে আগে থেকেই সংলাপকে পাশ কাটিয়ে চলছে আন্দোলনের মাধ্যমে সমাধানের প্রত্যাশায় থাকা বিএনপি। দলটি মনে করছেন, আন্দোলনের এ পর্যায়ে বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মীকে জেলে রেখে আলোচনার টেবিলে আসা তাদের জন্য অসম্ভব।

দুই দলের একাধিক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপি যেকোনো কারণেই হোক অনমনীয় অবস্থানে চলে গেছে। রাজনৈতিক দিক থেকে সেখান থেকে দুই দলেরই আর ফেরার সুযোগ নেই। ফিরে আসতে গেলে দুই দলকেই দুর্বলতার সমালোচনা শুনতে হবে। ফলে সংলাপে বসার জন্য আগ বাড়িয়ে কোনো দলই এগিয়ে আসার কথা বলছে না।

আওয়ামী লীগের সভাপতিম-লীর সদস্য ড. আবদুর রাজ্জাক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিএনপি যেদিকে নিয়ে গেছে, তাতে সংলাপের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে।’

আওয়ামী লীগের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, বিএনপির পক্ষ থেকে সংলাপের প্রস্তাব দেওয়া হলে বসা যেতে পারে। ঠিক তেমনি বিএনপির একটি সূত্রও দাবি করেছে, সরকারের পক্ষ থেকে প্রস্তাব এলে সংলাপ হতে পারে। কিন্তু দুদলই অনমনীয় অবস্থানে চলে যাওয়ায় এ সুযোগ এখন আর নেই। ফলে তৃতীয় কোনো পক্ষের আহ্বান, চাপ এগুলো নয়, সংলাপ বসতে হলে উদ্যোগ নিতে হবে দুই দলকেই।

অন্য রাজনৈতিক দলের নেতারাও একই কথা বলছেন। দেশ রূপান্তরকে তারা বলেন, সংলাপের সুযোগ তারা দেখছেন না। সরকারের সঙ্গে থাকা একাধিক দলের নেতারা বলেছেন, নির্বাচনের আগে সংলাপের সুযোগ তারা দেখছেন না। কেন দেখছেন না তা জানতে চাইলে সেসব নেতা বলেন, দুই দলের ‘ফাইনাল খেলায়’ চলে যাওয়াই সংলাপ না হওয়ার অন্যতম কারণ। বিএনপিও অনমনীয় অবস্থানে, আওয়ামী লীগও তাই। ফলে নির্বাচনের অল্প কয়েক দিন সময় রয়েছে। আগে আর কীভাবে সংলাপ হবে।

জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের সাবেক শিক্ষক অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ নির্বাচনের দিকে ব্যস্ত। বিএনপি আন্দোলন নিয়ে। কেউ কি মধ্যবর্তী জায়গায় আছে? অনমনীয় অবস্থান মূলত জটিলতা। তাছাড়া বিএনপির আন্দোলনে বড় জনসম্পৃক্ততা ঘটছে না। ফলে সরকার কেন তাদের দাবি মানতে যাবে। এ ধরনের নানা হিসাব রাজনীতিতে থাকে।’

আওয়ামী লীগের শীর্ষ সারির তিন নেতা বলেন, আওয়ামী লীগ তো দুর্বল অবস্থানে নেই। বরং বিএনপি গত ২৮ অক্টোবর যে নাশকতার সৃষ্টি করেছে, তাতে দলটি রাজনীতি করার অধিকার হারিয়েছে। তাছাড়া বিএনপির বেআইনি দাবি, শর্তযুক্ত সংলাপের আলোচনায় আওয়ামী লীগ কেন বসবে।

বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের দুই নেতা বলেন, তারা বিশ্বাস করেন, আন্দোলনের মাধ্যমেই বিএনপি বিজয়ী হবে। সারা দেশের মানুষ দলটির সঙ্গে রয়েছে। তারা বলেন, আওয়ামী লীগ যেভাবে তাদের নেতাকর্মীদের ওপর অত্যাচার নির্যাতন করেছে, তাতে সরকারি দলের সঙ্গে আলোচনায় বসার সুযোগ বিএনপির নেই। আওয়ামী লীগকে তাদের কর্মকা-ের জন্য ক্ষমা চাইলেই শুধু বিএনপি সংলাপের ব্যাপারে নমনীয় হতে পারে। আন্দোলনের এ পর্যায়ে বিএনপির কোনো নেতাকর্মীই সরকারের সঙ্গে কোনো আলোচনাই বসতে রাজি হবে না। বিএনপি নেতারাও কর্মী-সমর্থকদের মনে কষ্ট দিয়ে বা তাদের চাওয়ার বাইরে গিয়ে সংলাপ বা আলোচনায় যেতে পারে না।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত