বাংলা সাহিত্যের অন্যতম জনপ্রিয় গোয়েন্দা চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সী। প্রখ্যাত লেখক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের অমর চরিত্র ব্যোমকেশ বক্সী যদি বেঁচে থাকতেন, চাইলে তাকে এ পুনে শহরেই কাজে লাগাতে পারত বাংলাদেশ দল। পশ্চিমবঙ্গের এ জনপ্রিয় লেখকের সঙ্গে পুনের ছিল নিবিড় যোগ। শেষ জীবনটা পশ্চিম ভারতের এ শহরেই কাটিয়েছেন ব্যোমকেশ বক্সীর স্রষ্টা। ব্যোমকেশ ছিলেন সত্যসন্ধানী। চলা-বলায় বড্ড সাধারণ হলেও এ গোয়েন্দা তার পর্যবেক্ষণ, যুক্তি, বৈজ্ঞানিক দক্ষতা দিয়ে কলকাতায় ঘটে যাওয়া জটিল অনেক মামলার সমাধান করেছেন। ব্যোমকেশের স্রষ্টার শহরে এখন নিজেকে হারিয়ে খোঁজা বাংলাদেশ দল। বিশ্বকাপে চরম ব্যর্থতার কারণ অনুসন্ধানে ব্যর্থ হয়েছেন ক্রিকেটাররাও। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে দিল্লিতে জয়ের আগের টানা ছয় ম্যাচে হারের কারণ জানতে চাইলে ক্রিকেটার-কোচ-কর্তাদের সবাই শূন্য চোখে তাকিয়ে অজানা কারণের কথা বলেছেন। তাই বলে বসে থাকলে তো চলবে না, সামনে এগোতে হলে সন্ধান পেতে হবে সত্যের। তাই দলে প্রয়োজন একজন সত্যিকারের ব্যোমকেশ বক্সীর।
তবে তার আগে বিশ্বকাপটা সম্মান নিয়ে শেষ করা বড্ড জরুরি। পুনের মহারাষ্ট্র ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন (এমসিএ) স্টেডিয়ামে শনিবার পাঁচবারের বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ বাংলাদেশের। ব্যর্থতার সত্যসন্ধানের আগে তাই বাংলাদেশকে খুঁজে নিতে হবে অজিদের চ্যালেঞ্জ জানানোর দাওয়াই। এই ম্যাচে ইতিবাচক ফল না এলে ২০২৫ আইসিসি চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ভাগ্য ঝুলে যেতে পারে আবার।
দুদিনের বিশ্রাম শেষে কাল দুপুরে বাংলাদেশ দল যখন এমসিএ স্টেডিয়ামের সবুজ গালিচায় পা রাখে, ঠিক তখনই বেঙ্গালুরুতে টস হয়ে গেছে শ্রীলঙ্কা-নিউজিল্যান্ড ম্যাচের। যে ম্যাচের ওপর অনেকটাই নির্ভর করেছিল বাংলাদেশের চ্যাম্পিয়নস ট্রফি ভবিষ্যৎ। সাকিববিহীন বাংলাদেশ যখন নেটে ব্যাটে-বলে ঘাম ঝরাতে ব্যস্ত, তখন কিউই বোলারদের চাপে লঙ্কান ব্যাটসম্যানরা সাজঘরে আসা-যাওয়ার মিছিলে। শ্রীলঙ্কার বহু কষ্টে তোলা ১৭১ কিউইরা ১৬০ বল হাতে রেখে ৫ উইকেটে টপকে গিয়ে নিজেরাও যেমন সেমিফাইনালের মঞ্চে এক পা দিয়েছে, তেমনই স্বস্তির হাওয়া লেগেছে বাংলাদেশ শিবিরে। চ্যাম্পিয়নস ট্রফির লড়াইয়ে শ্রীলঙ্কা বাংলাদেশের অন্যতম প্রতিপক্ষ। বড় হারে রানরেটে আরও পিছিয়ে লঙ্কানরা নেমে গেছে পয়েন্ট টেবিলের নয় নম্বরে। এবার আটে থাকা বাংলাদেশের এই অবস্থানটা টিকিয়ে রাখতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে খেলতে হবে বদলে যাওয়া ক্রিকেট। যে বদলের শুরুটা ৬ নভেম্বর হয়েছিল দিল্লিতে এই শ্রীলঙ্কাকেই ৩ উইকেটে হারিয়ে।
পুনের চ্যালেঞ্জ জিততে ফিরিয়ে আনতে হবে ১৮ বছর আগের কার্ডিফ স্মৃতি। ২০০৫ সালে নেটওয়েস্ট ট্রফিতে আশরাফুলের মহাকাব্যিক সেঞ্চুরি (১০১ বলে ১০০) আর আফতাব আহমেদের ফিনিশিং টাচে (১৩ বলে অপরাজিত ২১) অস্ট্রেলিয়ার অহমে আঘাত হেনেছিল পুঁচকে বাংলাদেশ। প্রবল প্রতিপক্ষের ২৪৯, ৫ উইকেট হাতে রেখে টপকে গিয়েছিল বাংলাদেশ। সেটাই ছিল বিশ্বের সবচেয়ে সফল দলের বিপক্ষে ওয়ানডেতে প্রথম ও একমাত্র জয়। এর পরের ১৪ ম্যাচের ১৩টিতেই বাংলাদেশকে বড় ব্যবধানে হারায় অস্ট্রেলিয়া। একটা ম্যাচ ভেসে গিয়েছিল বৃষ্টিতে। সর্বশেষ গত বিশ্বকাপে নটিংহ্যামে বাংলাদেশ হেরেছিল ৪৮ রানে।
তবে দুই হারে শুরুর পর টানা ছয় জয়ে অস্ট্রেলিয়া ঘুরে দাঁড়িয়ে সেমিফাইনালে পা রেখেছে। বিশেষ করে আফগানিস্তানের বিপক্ষে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের ১২৮ বলে অপরাজিত ২০১ রানের ম্যাচ জেতানো ইনিংসের পর ছন্নছাড়া বাংলাদেশের ম্যাচ জয় আর মঙ্গলগ্রহ জয় করা হবে সমান কৃতিত্বের। দুদিন আগে সারা শরীরে অমানসিক যন্ত্রণা নিয়ে ম্যাক্সওয়েল খেলেন অতিমানবীয় ইনিংসটি, যা ইতিমধ্যে ঢুকে গেছে সর্বকালের সেরা ইনিংসের তালিকায়। অনেকে এটাকেই সর্বকালের সেরা দাবিও করছেন। ধকল কাটিয়ে বাংলাদেশের জন্য প্রস্তুত হচ্ছেন ম্যাক্সওয়েলও। তাকে নিয়ে বন্দনার মাঝেই অস্ট্রেলিয়াকে রুখে দেওয়ার লক্ষ্যে প্রস্তুত হচ্ছে বাংলাদেশ। চ্যালেঞ্জটা আরও বেড়েছে ছন্দে ফেরা অধিনায়ক সাকিব আল হাসান আঙুলের চোটে ছিটকে পড়ায়। সব মিলিয়ে পুনেতে আরেকটা সুনামির শঙ্কায় কাঁপছে বাংলাদেশ শিবিরে।
এই শহরে চলতি বিশ্বকাপে দ্বিতীয়বারের মতো আসা বাংলাদেশের। প্রথমটি স্বাগতিক ভারতের মোকাবিলা করতে। ১৯ অক্টোবর সেটি ছিল লিগ পর্বে বাংলাদেশের চতুর্থ ম্যাচ। আগের তিন ম্যাচের একটিতে জয়, দুটি হার, তারপরও টিকে ছিল বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল স্বপ্ন। সেই স্বপ্নে বড়সড় আঘাত হানে ভারত; বাংলাদেশকে রীতিমতো পাড়ার দলে পরিণত করে বিরাট কোহলির অসাধারণ সেঞ্চুরিতে ম্যাচটা জিতে নেয় ৭ উইকেটে। লড়াকু মনোভাবটা যেন সেই ম্যাচেই শেষ হয়ে গিয়েছিল। এরপর দক্ষিণ আফ্রিকা, নেদারল্যান্ডস ও পাকিস্তানের কাছেও বিধ্বস্ত হয়ে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিশ্চিতের পাশাপাশি শঙ্কা তৈরি হয় চ্যাম্পিয়নস ট্রফি নিয়ে। দিল্লিতে শ্রীলঙ্কাকে ৩ উইকেটে হারানোর পরও শঙ্কা রয়ে গেছে; তবে গতকাল নিউজিল্যান্ডের কাছে শ্রীলঙ্কার হারে কিছুটা কমেছে। আরও একটু নির্ভার হতে শনিবার বাংলাদেশকে সব বিভাগেই খেলতে হবে সেরাটা দিয়ে। তাতে যদি জয় নাও আসে, হারটা যাতে বড় ব্যবধানে না হয়। বড় হারে ফের শঙ্কাটা বাড়বে, তখন ১২ নভেম্বর কায়মনে প্রার্থনা করতে হবে স্বাগতিক ভারতের কাছে নেদারল্যান্ডসের বড় হার।
এত এত সমীকরণের ম্যাচে সাকিব থাকছেন না। তার জায়গায় উড়িয়ে আনা ওপেনার এনামুল হক বিজয় কাল দলের সঙ্গে পুরোদমে ট্রেনিং করেছেন। দ্বিতীয় ধাপে দীর্ঘক্ষণ নেটে ব্যাটিং প্র্যাকটিস করেছেন। দলীয় সূত্রের খবর, বিজয়ের খেলার সম্ভাবনা রয়েছে। সে ক্ষেত্রে ব্যর্থতার বৃত্তে বন্দি তানজিদ হাসান তামিমের সঙ্গে হয়তো গোড়াপত্তনে দেখা যাবে তাকে। জরুরি তলবে পুনেতে পৌঁছানো লিটন কুমার দাস তখন খেলবেন তিনে। স্বয়ংক্রিয়ভাবেই চারে খেলতে হবে সাকিবের অনুপস্থিতিতে অধিনায়কত্ব পাওয়া নাজমুল হোসেন শান্তকে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৯০ রানের সর্বোচ্চ ইনিংস খেলা শান্তর দায়িত্বটা বেড়ে যাচ্ছে বহুগুণে।
বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচ বলেই দুদিন আগে থেকেই বাজতে শুরু করেছে বিদায় সংগীত। পুরো দলের বিশ্বকাপ অভিযান শেষ হচ্ছে। আবার দলের কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটারের বিশ্ব মঞ্চে এটাই হয়তো হতে যাচ্ছে শেষ ম্যাচ। মাহমুদউল্লাহ ও মুশফিকুর রহিমের পরের ওয়ানডে বিশ্বকাপে খেলার সম্ভাবনা একেবারেই নেই। আগামীতে খেলার সুযোগ না পেলে বিজয়েরও হয়তো হবে বিশ্ব মঞ্চে শেষ ম্যাচ। আর আঙুলের ইনজুরিতে আগেই ছিটকে পড়ায় সাকিবও হয়তো তার বিশ্বকাপের শেষটা খেলে ফেলেছেন আগের ম্যাচে। বয়সের কারণে ছিটকে পড়া মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা ও বিশ্বকাপ দলে সুযোগ না পাওয়া তামিম ইকবালের এই মঞ্চ থেকে বিদায় হয়েছে চার বছর আগেই।
সব মিলিয়ে এ ম্যাচটা যেমন অনেক পাওয়ার, তেমন অনেক কিছুই হারানোরও। একটা প্রজন্মের অবসান ঘটবে পুনের মাঠে। আফসোস, সোনালি প্রজন্মের পাঁচকে অন্তত ওয়ানডে বিশ্বকাপে আর একসঙ্গে দেখা যাবে না কখনো। বিশ্ব দরবারের বাংলাদেশকে আলাদাভাবে চেনানো এ পঞ্চপান্ডবের জন্যই না হয় বাংলাদেশ ফিরিয়ে আনুক ২০০৫-এর কার্ডিফকে।
এরপর না হয় কোনো এক সত্যিকারের ব্যোমকেশ বক্সীকে নিয়োগ দিয়ে নেমে পড়া যাবে বিশ্বকাপ ব্যর্থতার সুলুকসন্ধানে।