গাজায় ইসরায়েলি আগ্রাসনের প্রতিবাদে সরব হয়েছেন ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত মার্কিন কংগ্রেসম্যান রাশিদা তালিব। সহকর্মী এবং অন্যদের সমালোচনায়ও তিনি দমে যাননি, বরং নিজের অবস্থানে অবিচল থাকার কথা জানিয়েছেন মিশিগান অঙ্গরাজ্যের ডিয়ারবর্ন অঞ্চলের এই জনপ্রতিনিধি। তাকে সমর্থন করেছেন ডিয়ারবর্নের মেয়র আব্দুল্লাহ হামমৌদ।
রাশিদা তালিব একজন আরব আমেরিকান। তার নির্বাচনী এলাকাটিও আরব অধ্যুষিত। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে একমাত্র ফিলিস্তিনি বংশোদ্ভূত কংগ্রেসম্যান। এক মাসেরও বেশি সময় ধরে চলা ইসরায়েলি সহিংসতা নিয়ে তিনি বলেন, ‘গাজা ও পশ্চিম তীরে যুক্তরাষ্ট্রের মদদে সহিংসতা চালাচ্ছে ইসরায়েল। আমি এর বিরোধিতা করি।’ ডেমাক্রেটিক পার্টির নেত্রী রাশিদার এমন অবস্থানের পর তিরস্কার শুরু হলে তাকে সমর্থন করে আবদুল্লাহ হামমৌদ বলেন, ‘আমাদের সম্প্রদায়ের ওপর রাষ্ট্র কর্তৃক অনুমোদিত নিপীড়নের কথা ভুলবে না ডিয়ারবর্ন।
যুক্তরাষ্ট্রের আগামী বছরের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ফিলিস্তিন ইস্যুতে আরব সমর্থন বড় একটি বিষয় হয়ে উঠতে যাচ্ছে। রাশিদা তালিব জনপ্রতিনিধি, এবার তার অনুসারীরা যেখানেই রয়েছেন তারা মার্কিন রাজনীতিতে তাদের মত তুলে ধরবেন আগামী ভোটে। বিশেষত আরব বংশোদ্ভূতরা।
নাদিয়া আইয়ুব একজন লেবানিজ মুসলিম যিনি স্বামী মাইকের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র্রে বসবাস করেন। ২০১৮ সালে ডিয়ারবর্নে ১৮ বছর বয়সী এক ফিলিস্তিনি কিশোরকে চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছিলেন। তার একটি কৃত্রিম পা লাগানো হয়েছিল। গাজায় ফেরার পর কিশোরটির সঙ্গে তাদের কথা হতো। জাবালিয়া শরণার্থী শিবিরে থাকত সে। যুদ্ধ শুরুর পর তার সঙ্গে ওই দম্পতির একবার কথা হয়। কিন্তু এখন আর খোঁজ নেই।
যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত আরব সম্প্রদায় ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে নৈকট্য বোধ করেন। নাদিয়া-মাইক দম্পতিও সেরকমই। জো বাইডেন হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর তেলআবিব সফর করলে এবং ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মন্ত্রিসভার সঙ্গে সাক্ষাৎ করায় তারা ক্ষুব্ধ। মাইক বলেন, ‘প্রেসিডেন্ট বাইডেনের হাতে রক্ত রয়েছে।’ তার পাশ থেকে নাদিয়া বলছিলেন, ‘তাকে (বাইডেন) আমি ভোট দিয়েছিলাম। এবার আর দেব না।’ মাইক-নাদিয়ার এই অনুভূতি কম-বেশি সব আরবদের এবং তা শুধু মিশিগানে ছড়িয়ে নেই, সারা দেশেই তার প্রভাব রয়েছে। স্থানীয় আরব সংবাদমাধ্যমগুলোয় শিরোনাম করা হচ্ছে, বাইডেন আমাদের ভোট হারিয়েছেন।
মিশিগানের মতো দোদুল্যমান রাজ্য আগামী বছরের ভোটে বড় নির্ণায়ক হয়ে উঠতে পারে। এখানে ২০১৬ সালে জয়লাভ করেন ডোনাল্ট ট্রাম্প যিনি এবার বাইডেনের সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী। ২০২০ সালে বাইডেন এই অঙ্গরাজ্যে জয় তুলে নিয়েছিলেন। এখানে মুসলিম ভোট রয়েছে দুই লাখের মতো।
স্যাম বাদাউন নামের স্থানীয় এক কর্মকর্তা বলছিলেন, আরবরা কীভাবে প্রেসিডেন্টকে ভোট দেবে, যখন টিভিতে তারা বর্বরতা দেখে এবং বাইডেন সেই ব্যক্তি যিনি অস্ত্র পাঠাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, ইসরায়েলের প্রতি বাইডেনের সমর্থন নতুন নয়। তবে যুদ্ধ চলাকালে তিনি যেভাবে তেলআবিবে গেলেন তা তাকে অবাক করেছে। এই মুহূর্তে যুদ্ধবিরতি দরকার। এখন ভোট হলে বাইডেন সমর্থন পাচ্ছেন যা নিশ্চিত করেই বলা যায়। ‘দ্য আরব আমেরিকান ইনস্টিটিউট’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান বলছে, হামাস-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর ডেমাক্রেটিক পার্টির প্রতি আরব আমেরিকানদের সমর্থন কমছে। ২০২০ সালে যে সমর্থন ছিল ৫৯% শতাংশ, তা এখন হ্রাস পেয়ে ১৭ শতাংশে নেমে এসেছে। গত ৩০ বছরে প্রথমবারের মতো আরব আমেরিকানদের কাছে ডেমোক্র্যাটরা কোনো বিবেচনায় আসছে না।
তবে কি বাইডেনের ভোট ট্রাম্পের দিকে যাবে, এমন প্রশ্নের পরিপ্রেক্ষিতে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ল্যারি সাবাতো বলেন, ট্রাম্পের ইসরায়েলপন্থি নীতি আরও পরিষ্কার। তিনি তেলআবিব থেকে জেরুজালেমে দূতাবাস নিয়ে এসেছেন এবং এজন্য তার প্রতিও আরও বেশি ক্ষুব্ধ আরবরা। তবে আরব আমেরিকানরা বাড়িতে বসে থাকলে, তা বাইডেনের জন্য নেতিবাচকই হবে।
এই বিশ্লেষকের কথা মিলে যায় একজন আরব আমেরিকানের কথার মাধ্যমে। নাদা আল-হানুতি নামের একজন বলেন, ‘আমি বন্ধু, সহকর্মী ও অন্যান্যদের কাছ থেকে শুনেছি; তারা বাড়িতে থাকবেন অথবা তৃতীয় কোনো দলকে সমর্থন করবেন।’
এ অবস্থায় যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসের নিম্নকক্ষ হাউজ অব রিপ্রেজেন্টেটিভস মঙ্গলবার রাশিদা তালিবের বক্তব্যের নিন্দা জানাতে প্রস্তাব পাস করেছে। উত্থাপিত প্রস্তাবনায় বিপুলসংখ্যক রিপাবলিকান ছাড়াও ২২ ডেমোক্র্যাট আইনপ্রণেতা সমর্থন দেয়।
