আনন্দময় নতুন শিক্ষাব্যবস্থা এবং কন্যার স্বপ্নবিষাদ

আপডেট : ১১ নভেম্বর ২০২৩, ১১:৩৫ এএম

পঞ্চম শ্রেণি পড়া মেয়ে একদিন অভিযোগ করে বলল মা, আমার কোনো ভুল হয়নি লেখায়। তবু স্যার শুধু ‘এ’  দিয়েছেন। জানো মা, আমার বন্ধুর তিনটা ভুল ছিল। ও স্যারের কাছে শুনে, ঠিক করার পর স্যার ওকে ‘এ প্লাস’ দিয়েছেন। ও স্যারের বাসায় কোচিং করে। তুমি আমাকে কোচিং করতে দাও না কেন? বললাম, তুমি তো জানো আজকের বিষয়ে তুমি বন্ধুর চেয়ে ভালো পেরেছ। বন্ধু বেশি নম্বর পেলেও তুমিই আসলে জয়ী। এমন কথা বলি তবু চিন্তা হয়। স্রোতের বিপরীতে কতদিন টিকতে পারব? কারণ ক্লাসের অধিকাংশ ছাত্রছাত্রী কোচিং করে। স্কুল থেকে ফিরে মেয়ে প্রায়ই বলে, মা ওরা শিট পেয়েছে। আমার শিট নেই। জানো মা, আমি এক বন্ধুকে দিতে বলেছি একটা শিট। ও বলে, টাকা দিয়ে কোচিং করলে এগুলো পাওয়া যায়। আর যারা কোচিং করে না, এমন কাউকে শিট দেওয়া নিষেধ। 

এভাবেই চলছিল। ঠিক তখনই এলো নতুন শিক্ষা পদ্ধতি। শুরুতে বুঝে উঠতে না পারলেও, এখন পরিষ্কার এ শিক্ষা পদ্ধতি। আমি আশাবাদী। আনন্দের সঙ্গে বৈষম্যহীন শিক্ষা নিয়ে সন্তান পাখিওয়ালা হোক। স্কুলে ওর আনন্দ থাকুক। আমার দুই মেয়ে। বড় মেয়েটা একদিন বলল জানো মা, টিফিন খেতে নিচে নামলে অমুক (সাবজেক্ট উহ্য রাখলাম) বিষয়ের স্যার আমার কয়েকজন বন্ধুর নাম ধরে ডাকে। গল্প করে। আমাকে ডাকে না।

  কেন ডাকে না?

 ডাকবে কেন? স্যার তো আমাকে চেনেই না। এমনকি তোমাকেও চেনে না, মা। বললাম দেখো, তোমার স্কুলের টিচারদের আমাকে চিনতে হবে কেন? তোমাকে চিনলেই হবে। আর এর জন্য ক্লাস আছে। আলাদা করে বাসায় গিয়ে চিনতে হবে কেন?  আমার কাজের জায়গার বন্ধুরা কি তোমাকে চেনে? ঠিক তেমনি তোমার শিক্ষকরা আমাকে কেন চিনবে? তবে তোমাকে চিনতে হবে।

মেয়ে বলল ট্যালেন্ট টিচারও আছেন। তারা কোচিং করান না। সবাইকে চেনেন, কথা বলেন। আমার ক্লাস টিচার আপা খুব ভালো। আপা কোচিং করান না। সবাইকে চেনেন, কথা বলেন।

আমি আমার মেয়েদের বন্ধু এবং বন্ধুর মায়েদের সঙ্গে কথা বলে জেনেছি, যারা কোচিং করে কেবল তাদের সঙ্গে কোচিং শিক্ষকরা কথা বলেন! তারাই নাকি ভালো নম্বর পায়।

এই যখন অবস্থা, প্রতিদিনই বৈষম্য ঠেলে বেরিয়ে আসার চেষ্টা। ঠিক তখন এলো নতুন শিক্ষা পদ্ধতি। শুরুতে চিন্তিত হলাম। টিচাররা বারকয়েক বসলেন আমাদের সঙ্গে।  জানালেন, পদ্ধতি নতুন হলেও শেখার আনন্দ বাচ্চাদের এগিয়ে নেবে।

একসময় প্রতিটি বই ঘেঁটে দেখি। নিয়মিত পড়াতে শুরু করি। অভূতপূর্ব ঘটনা আর তার বাস্তবিক প্রয়োগ করার কৌশল নিয়ে সাজানো সূচি দেখে মুগ্ধ হই। ঠিক তখনই দেখি  কানাঘুষা বাতিল করো শিক্ষা পদ্ধতি সেøাগানের প্রস্তুতিপর্ব। আমার বিশ্বাস, আন্দোলনে আসা এসব অভিভাবক জানতেই পারেননি নতুন শিক্ষাপদ্ধতির ভবিষ্যৎ। এখন মুখস্থ পড়ার দিন নেই, আত্মস্থ করতে হবে। অ্যাসাইনমেন্ট করতে হবে।

নতুন শিক্ষা পদ্ধতিতে পড়াশোনা অনেক আনন্দময় হয়েছে। শিশুরা যা শিখছে, তা-ই  অ্যাসাইনমেন্ট হিসেবে  প্রকাশ করার সুযোগ পাচ্ছে। বই না পড়ে অ্যাসাইনমেন্ট করতে গেলে অসুবিধা এ সিস্টেমে। আবার মুখস্থ করার অপশনও খুব নেই। এই পদ্ধতিতে প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন সবার আগে অঙ্ক, ইংরেজি, বিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের শিক্ষক। এরা প্রশিক্ষণ নিতে গিয়ে যখনই বুঝতে পারছেন, আর কোচিং-বাণিজ্য থাকবে না, তখনই এদের কিছুসংখ্যক কৌশলে অভিভাবকদের বলছেন নেতিবাচক কথা! মুখস্থবিদ্যায় উচ্চ নম্বর পাওয়া না পাওয়া কিছু অভিভাবক তাই না বুঝতে পেরেই নেমে পড়ছেন আন্দোলনে। ইতিবাচকভাবে অভিভাবকদের তৈরি করার দায়িত্ব শিক্ষকেরই। অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়ার নামে নানাবিধ খরচ বাড়িয়ে চাপ তৈরি করা কি কোচিং-বাণিজ্য চালু রাখারই কৌশল? সরকারের ঘোষিত নতুন শিক্ষা পদ্ধতিতে বাসায় ব্যবহৃত বা অব্যবহৃত বস্তুর ব্যবহারের কথা বলা হলেও কিছু শিক্ষক মানসিক চাপ তৈরি করে নানাবিধ খরচ করাতে বাধ্য করছেন। আমার সন্তানের স্কুলের প্রধান শিক্ষক বলেছেন, অতি সাধারণ ব্যবহার্য জিনিসপত্র দিয়ে এক্সপেরিমেন্ট করার কথা বলা আছে। অল্প কিছু প্রজেক্ট আছে, তাতে যে খরচ তা স্বাভাবিক এবং সাধারণ। অতি উৎসাহী শিক্ষক এবং শিক্ষার্থীদের সব আবদার না মিটিয়ে, একটু সময় নিয়ে বাচ্চাদের সময় দিয়ে পড়ালে এ আন্দোলন ব্যর্থ হবে।

অন্যদিকে এটাও মানতে হবে, আমাদের অধিকাংশ সন্তান এখন অধিক মাত্রায় ডিভাইস আসক্ত! মোট কথা, অনলাইনে সময় কাটানো বাচ্চার বদভ্যাস। নতুন করে বাহানা তৈরি করছে স্কুল অ্যাসাইনমেন্টের নামে। অভিভাবকদের উচিত, ক্লাস টিচার বা স্কুলের প্রধান  শিক্ষকের সঙ্গে কথা বলে বুঝে নেওয়া প্রতিদিনের পড়াশোনা করতে ঠিক কতটুকু ডিভাইস জরুরি? কোমলমতি শিশুদের সব আবদার মেনে নেওয়া অভিভাবকরা বেশি অসহায় বোধ করছেন নতুন শিক্ষা পদ্ধতি নিয়ে। কারণ তারা জানছেন, ডিভাইস-নির্ভর পড়াশোনা চলছে এখন। আসলে বিষয় ততটা নয়। পড়া যদি ডিভাইস-নির্ভরই হতো, তাহলে বই দিল কেন? বই আছে অনুসন্ধান ও অনুশীলন নামে। পড়ার নামে অনলাইনে ঘোরাফেরা করা বাচ্চাকে নিয়ন্ত্রণ করুন।  মূল পড়ার সঙ্গে কিন্তু ডিভাইসের সম্পর্ক নেই। তবে আরও বেশি জানতে, তথ্যসমৃদ্ধ হতে নেট দুনিয়ায় ঢুঁ মারা খারাপ কিছু নয়। কিন্তু সেটার নিয়ন্ত্রণের ভার স্কুল বা শিক্ষা পদ্ধতির ওপর নয়, পরিবারের। ক্লাস সিক্স ও সেভেনের বই ঘেঁটেঘুঁটে বলতেই পারি অভিনন্দন। সন্তানদের পড়াশোনা হয়েছে, আনন্দের। আমরা ওদের নিয়ে স্বপ্ন দেখি, শুভ-সুন্দরের। কারণ, ওরা যে আগামীর।

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত