মৌলভীবাজারের লাঠিটিলা সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সাফারি পার্ক নির্মাণের লক্ষ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্প অনুমোদনে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন দেশের ১৮ জন অধিকারকর্মী ও পরিবেশ সংগঠক। গতকাল শুক্রবার গণমাধ্যমে পাঠানো এক যৌথ বিবৃতিতে প্রকল্পটি বাতিলের আহ্বান জানিয়ে তারা বলেছেন, ওই প্রকল্প বাস্তবায়নে আমাদের পরিবেশ তথা স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
বিবৃতিদাতারা হলেন মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের সভাপতি অ্যাডভোকেট সুলতানা কামাল, গণসাক্ষরতা অভিযানের প্রধান নির্বাহী রাশেদা কে চৌধূরী, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ, ব্রতীর প্রধান নির্বাহী শারমিন মুরশিদ, আদিবাসী ফোরামের সাধারণ সম্পাদক সঞ্জীব দ্রং, ওয়াটারকিপার্স-বাংলাদেশের সমন্বয়ক শরীফ জামিল, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. মেজবাহ কামাল, সিলেট মেট্রোপলিটন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ড. মোহাম্মদ জহিরুল হক, বাংলাদেশ প্রতিযোগিতা কমিশনের বেসরকারি উপদেষ্টা এমএস সিদ্দিকী, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের অধ্যাপক রুবায়েত ফেরদৌস, ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানিং অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইপিডি) নির্বাহী পরিচালক ড. আদিল মোহাম্মদ খান, সিলেট আদিবাসী পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক ফাদার জোসেফ গোমেজ, শেরেবাংলা কৃষি বিশ^বিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক মীর মোহাম্মদ আলী, তরুপল্লবের সাধারণ সম্পাদক মোকারম হোসেন, সুন্দরবন ও উপকূল সুরক্ষা আন্দোলনের সমন্বয়ক নিখিল চন্দ্র ভদ্র, সুরমা রিভার ওয়াটারকিপার আব্দুল করিম কিম এবং কুবরাজ আন্তোপুঞ্জি উন্নয়ন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক ফ্লোরা বাবলি তালাং।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার একনেক সভায় মৌলভীবাজারের জুড়ী উপজেলার লাঠিটিলায় একটি সাফারি পার্ক নির্মাণের জন্য ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সাফারি পার্ক, মৌলভীবাজার (প্রথম পর্যায়)’ প্রকল্পটি অনুমোদন হয়েছে। কিন্তু এর আগে দেশের পরিবেশ ও মানবাধিকারকর্মীরা এই বন সংরক্ষণে সংশ্লিষ্ট অধিদপ্তর, বিভাগ ও মন্ত্রণালয়কে বারবার অবহিত করলেও সেই সব উদ্বেগে কর্ণপাত করা হয়নি। একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চলে সাফারি পার্ক নির্মাণের এই উদ্যোগ দেশের পরিবেশ ও বাস্তুতন্ত্র রক্ষায় সরকারের উদাসীনতা প্রকাশ পেয়েছে। ইতিপূর্বে কক্সবাজারের চকরিয়ায় বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক-১ এবং গাজীপুরে বঙ্গবন্ধু সাফারি পার্ক-২ নির্মাণ করা হয়েছে। ওই দুটি সাফারি পার্ক পরিচালনা নিয়ে বন বিভাগের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। দুটি সাফারি পার্ক পরিচালনায় ব্যর্থতা ও পরিবেশের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব থাকা সত্ত্বেও লাঠিটিলায় আরেকটি সাফারি পার্ক নির্মাণের এই চেষ্টা অনভিপ্রেত।
বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের সীমান্তবর্তী লাঠিটিলায় এখনো হাতির বিচরণস্থল হিসেবে পাথারিয়া হিল রিজার্ভ ফরেস্ট (পিএইচআরএফ) পরিচিত। প্রশাসনিকভাবে পিএইচআরএফ মৌলভীবাজার জেলার জুড়ী ও বড়লেখা উপজেলার মধ্যে অবস্থিত। সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, বর্তমানে সংরক্ষিত বনটির আয়তন ৮০ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে লাঠিটিলার আয়তনই ২০ বর্গকিলোমিটার। এটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল হওয়া সত্ত্বেও সেখানে মানুষের বসতি গড়ে উঠেছে। বনে বসবাসকারীদের জন্য নানা ধরনের অবকাঠামো স্থাপন, বনের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করছে। এ অবস্থায় বন বিভাগ থেকে এসব মানব বসতি উচ্ছেদ করে বনের স্বাভাবিক পরিবেশ বজায় রাখা জরুরি হলেও তা না করে গ্রাম বহাল রেখেই সাফারি পার্ক নির্মাণ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে; যা মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ সেখানে সাফারি পার্কের নামে বন ধ্বংসের আয়োজন চলছে। এতে মুষ্টিমেয় কিছু লোকের আর্থিক লাভ ছাড়া দেশের জন্য মঙ্গলজনক হবে না; বরং স্থানীয় জনগোষ্ঠী, বাস্তুতন্ত্র ও জীববৈচিত্র্যের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। তাই আমরা লাঠিটিলা সাফারিপার্ক প্রকল্পের বিরুদ্ধে আমাদের সুস্পষ্ট অবস্থান ব্যক্ত করছি। জনমত উপেক্ষা করে লাঠিটিলা ধ্বংসের এই প্রকল্প এগিয়ে নিলে তা বৃহত্তর সামাজিক আন্দোলনে রূপ নেবে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
