ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে গত শুক্রবার ভারত আর যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে বিদেশ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের ‘টু-প্লাস-টু’ বৈঠকে বাংলাদেশ নিয়ে উভয় দেশের আলোচনা ও আলোচনা শেষে উভয় দেশ যে বিবৃতি দিয়েছে তাতে সন্তুষ্ট বিএনপি। গতকাল শনিবার দলটির নেতারা দেশ রূপান্তরকে এ তথ্য জানিয়ে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারত বিশ্বের অন্যতম গণতান্ত্রিক দেশ। বিশ্বের গণতান্ত্রিক দেশগুলোর প্রতি তাদের (বিএনপি নেতাদের) আহ্বান ছিল তারা (ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র) যেন গণতন্ত্রের পক্ষে, দেশের জনগণের পক্ষে থাকে। দুই দেশের বিদেশ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের আলোচনা শেষে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা স্পষ্ট করেই বলেছেন, বাংলাদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে সে দেশের জনগণ। এখন পর্যন্ত তাদের (ভারত) অবস্থান জনগণের পক্ষেই আছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বিষয়ে ভারতের অবস্থান আগের মতোই রয়েছে। তার প্রমাণ সে দেশের পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রার বক্তব্য। তিনি সরাসরি বলেছেন, বাংলাদেশের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবে দেশের জনগণ। বিশে^র গণতান্ত্রিক দেশগুলোর প্রতি আমাদের আহ্বান ছিল তারা যেন জনগণের পক্ষে থাকে।’
চলতি বছর ভারতীয় হাইকমিশনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের নৈশভোজে অংশ নেওয়ার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘সেই বৈঠকে বিএনপির পক্ষ থেকে আমাদের অবস্থান তুলে ধরা হয়েছিল। ভারতের প্রতি অনুরোধ ছিল তারা যেন কোনো দলের পক্ষে অবস্থান না নিয়ে দেশের জনগণের পক্ষে অবস্থান নেয়। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে ভারতের পররাষ্ট্র সচিবের বক্তব্যে প্রমাণ হয়েছে তারা আগের অবস্থানেই রয়েছে।’
বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির এই সদস্য আরও বলেন, ‘বাংলাদেশে ক্ষমতার পালাবদল হলে ভারতের যে উদ্বেগ তা নিরসনে বিএনপি নিরন্তর কাজ করে যাচ্ছে। এরই অংশ হিসেবে বিএনপির পক্ষ থেকে রাষ্ট্রীয় কাঠামো মেরামতে যে ৩১ দফা ঘোষণা করা হয়েছে তাতে পররাষ্ট্র বিষয়ে অবস্থান স্পষ্ট করা হয়েছে। ৩১ দফার মধ্যে ১৯তম দফায় বলা হয়েছে, বৈদেশিক সম্পর্কের সব ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও জাতীয় নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেওয়া হবে। বাংলাদেশ ভূখণ্ডের মধ্যে কোনো সন্ত্রাসী তৎপরতা বরদাশত করা হবে না এবং কোনো সন্ত্রাসবাদী তৎপরতা আশ্রয়-প্রশ্রয় পাবে না।’
চলতি বছরের ১৪ জুলাই রাজধানীর গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রীয় কাঠামো মেরামতের ৩১ দফার এই রূপরেখা ঘোষণা করেছিলেন।
গত শুক্রবার যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের ‘টু-প্লাস-টু’ বৈঠকের পর বিকেলে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রক। সেখানে এক প্রশ্নের উত্তরে পররাষ্ট্র সচিব বিনয় কোয়াত্রা বলেন, ‘বাংলাদেশ নিয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি খুবই স্পষ্ট করে তুলে ধরেছি আমরা। তৃতীয় কোনো দেশের নীতিমালা নিয়ে আমাদের মন্তব্য করার জায়গা নেই। বাংলাদেশের নির্বাচন তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়। সে দেশের মানুষ তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে সিদ্ধান্ত নেবেন। বন্ধু ও সঙ্গী দেশ হিসেবে বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্মান জানাই আমরা। একটি স্থিতিশীল, শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিশীল রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে সে দেশের মানুষ যেভাবে দেখতে চায়, সেই ভিশনকে ভারত কঠোরভাবে সমর্থন করে।’ তিনি একটু জোর দিয়েই বলেন, ‘বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পরিস্থিতি নিয়ে আমাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি, আমরা যেভাবে পরিস্থিতি পর্যালোচনা করি, সেটা খুব স্পষ্ট করে তুলে ধরেছি।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের বিদেশ ও প্রতিরক্ষামন্ত্রীদের বৈঠকের পরদিন গতকাল গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ‘এই মুহূর্তে একতরফা তফসিল ঘোষণা করলে সরকার পুনরায় এটাই প্রমাণ করবে যে আওয়ামী লীগ গণতান্ত্রিক আদর্শে বিশ্বাসী নয়; বরং একদলীয় স্টিম রোলার চালিয়ে দেশ শাসন করতে চায়। সরকারি দল হয়তো মনে করছে যে অতীতের মতো একতরফা সাজানো নাটক করে এবারেও নির্বাচনী বৈতরণী পার হয়ে যাবে। তারপর যেনতেন প্রকারে একটা গৃহপালিত বিরোধী দল সাজিয়ে নির্বিঘেœ একটি “মেইক বিলিভ” সংসদের নাটক মঞ্চস্থ করবে। তবে, বিষয়টি হচ্ছে এই যে, এখন আর ২০১৪ বা ২০১৮ সাল নয়। ২০২৪-এ এসে এখন সরকার আর দেশে-বিদেশে কাউকে বোকা বানাতে পারছে না।’
তিনি আরও বলেন, ‘এখন দেশের ভেতরে বা বাইরেই হোক, সবাই প্রত্যক্ষ করেছে এবং খোলাখুলিভাবে স্পষ্ট করে দিয়েছে যে বিরোধী দলের ওপর ক্র্যাকডাউন করে এবং তাদের সংগঠনের ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত সবাইকে গ্রেপ্তার করে তারপর একতরফা প্রহসনের নির্বাচনের তামাশার মাধ্যমে রাজত্ব চালানো যেতে পারে, তবে গণতন্ত্র নয়।’
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের ঘনিষ্ঠ ও যুক্তরাজ্যে অবস্থানরত দলটির এক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে বিএনপির পররাষ্ট্রবিষয়ক কাজ করছেন আমাদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে একদল তরুণ নেতা, যাদের বেশিরভাগই বিদেশে অবস্থান করছেন। তারাই নিয়মিত ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছেন। পাশাপাশি ভারতীয় মিডিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ রাখছেন। এরই অংশ হিসেবে ভারতের পররাষ্ট্রবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র অরিন্দম বাগচিকে বাংলাদেশ প্রসঙ্গে প্রশ্ন করা হয়েছিল। গত শুক্রবার বিদেশ সচিবকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তাদের অবস্থানে আমরা সন্তুষ্ট।’