ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ও ঢাবির আর্থিক হিসাবপদ্ধতি

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:৪৭ এএম

যে কোনো একটি নির্বাচনে নির্বাচন-পূর্বকালে, নির্বাচন চলাকালে এবং নির্বাচন পরবর্তীকালে নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা গভীর বিশ্লেষণের দাবি রাখে। তবে এটা ঠিক যে একটি অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া। কোনো একটি নির্বাচনে মোট কতটি ব্যালট পেপার ছাপানো হয়েছে, কতটি ব্যালট পেপার ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়েছে তার হিসাব থাকতে হবে। কোন ব্যালট পেপারে কে ভোট প্রদান করেছে তার স্বচ্ছ হিসাব এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচন শেষে নির্বাচন কমিশনের কাছে গিয়ে একজন ভোটার যে প্রার্থীকে ভোট দিয়েছেন, তার অনুকূলে ভোট গণনা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করার সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া থাকতে হবে।

বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচনে কয়েকটি ভোটকেন্দ্র থাকে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে আবার দুই বা ততোধিক ভোটকক্ষ বা বুথ থাকে। ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে নির্ধারিত বুথে ঢুকে পোলিং অফিসারের কাছে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সহকারী প্রিসাইডিং কর্মকর্তার কাছ থেকে ব্যালট পেপার নিয়ে ভোট প্রদান করে থাকেন। ছবিসহ ভোটার তালিকা শুধু মাত্র নির্বাচন কমিশনের কাছে থাকে। এখন ছবিসহ ভোটার তালিকা থাকার কারণে কোনো জালভোট প্রদান করার সুযোগ নেই। কিন্তু দেখা যায়, নির্বাচন কমিশনের নিষ্ক্রিয়তায় ভোট গ্রহণকারী কর্মকর্তাদের জিম্মি করে জালভোট প্রদান করে রাজনৈতিক দুর্বৃত্তরা।

প্রচলিত ভোটগ্রহণ পদ্ধতিতে প্রধান ত্রুটিগুলো:

১. একজন ভোটার কোন ব্যালটে সিল মেরেছে তার প্রমাণ যেমন ভোটারের কাছে নেই, তেমনি নির্বাচন কমিশনের কাছেও নেই।

২. জালভোট এবং আসল ভোট যাচাই-বাছাইয়ের সুনির্দিষ্ট প্রযুক্তিগত পদ্ধতি নেই নির্বাচন কমিশনের কাছে।

৩. মোট ভোটারের চেয়ে প্রদত্ত ভোটের সংখ্যা বেশি এমন রেকর্ড আছে বিভিন্ন নির্বাচনে। অতিরিক্ত এই ভোট কারা দিয়েছে তা শনাক্ত করার সুযোগ নেই। জালভোট প্রদানকারী ব্যক্তিকে শনাক্ত করার সুযোগ নেই বলে জালভোট প্রদান ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে।

একজন ভোটার হিসেবে আমি জানি না আমি আমার বুথে ভোট প্রদান করার আগে কয়জন ভোট প্রদান করেছে। আমি জানি না আমি কোন ব্যালটে ভোট প্রদান করেছি। আমি জানি না আমি যাকে ভোট প্রদান করেছি আদৌ তার অনুকূলে আমার ভোট জমা পড়েছে কি না। অপরদিকে একজন গণমাধ্যমকর্মী হিসেবে যখন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে যাই, তখন কমন কতগুলো জিজ্ঞাসা থাকে। যেমন- এই কেন্দ্রে ভোটার সংখ্যা কত, বুথ কয়টি, কোন বুথে কত ভোটার, এ পর্যন্ত কতটি ভোটগ্রহণ করা হয়েছে ইত্যাদি। প্রিসাইডিং অফিসার হয়তো আমাদের জানালেন যে, এই কেন্দ্রের ২টি বুথে এ পর্যন্ত ১০টি ভোট কাস্টিং হয়েছে। কিন্তু, এই যে ১০টি ভোট কাস্টিং হয়েছে সেটা সত্য না মিথ্যা তা ভেরিফিকেশন করার সুযোগ নেই। একটি ভোটকেন্দ্রে কতটি ব্যালট পেপার আনা হয়েছে এবং কতটি ব্যালট পেপার ব্যবহৃত হয়েছে তার হিসাব প্রিসাইডিং অফিসার কখনো দেন না গণমাধ্যমে। তবে নির্বাচনের ফলাফল প্রকাশ করার সময় কতটি ভোট কাস্টিং হয়েছে, কে কত ভোট পেয়েছেন এবং কতটি ভোট নষ্ট হয়েছে তার একটা হিসাব দেওয়া হয়।

ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়া ও ঢাবির আর্থিক হিসাবপদ্ধতি

দেশে প্রচলিত ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ার ভুলত্রুটি, বিচ্যুতি থেকে বের হয়ে আসার উপায় হিসেবে খুঁজতে গিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক হিসাব পদ্ধতির মধ্যে একটি সমাধান পেয়েছি।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন শিক্ষার্থী তার বেতনাদি জমা দেওয়ার জন্য যখন জনতা ব্যাংক টিএসসি শাখায় যায়, তখন ব্যাংকের একটি স্লিপ /রসিদ পূরণ করতে হয়। টাকা জমা দেওয়ার এই রসিদের তিনটি অংশ থাকে। যেমন জমাকারীর অংশ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশ এবং ব্যাংকের অংশ। টাকা জমা দেওয়ার পর ব্যাংক কর্মকর্তারা টাকা জমাকারী শিক্ষার্থীর অংশটি ফেরত দেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের অংশটি বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব শাখার কাছে পাঠিয়ে দেন। ব্যাংকের অংশটি ব্যাংকে জমা থাকে। তবে এই অংশে একটি কোড নাম্বার থাকে। কোনো শিক্ষার্থী কোন তারিখে কত টাকা জমা দিয়েছেন তার একটা স্পষ্ট হিসাব থাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে। যদি কোনো শিক্ষার্থী জমাকারীর অংশটি হারিয়ে ফেলেন, তাহলে বিশ্ববিদ্যালয়ের হিসাব শাখায় গিয়ে বিভাগ, সেশন এবং শিক্ষার্থীর নাম বলে সেখানে নিবন্ধিত খাতা থেকে কোন তারিখে কত টাকা জমা দিয়েছেন তা খুঁজে বের করা যায়। ৫০ টাকা জরিমানা দিয়ে টিএসসিতে জনতা ব্যাংকে গিয়ে একটি ডুপ্লিকেট কপি নেওয়া সম্ভব হয়।

আমরা যদি ব্যাংকের ছাত্রছাত্রীর অংশটাকে ভোটারের অংশ (জাতীয় পরিচয়পত্র/ভোটার রসিদ) ধরি, বিশ্ববিদ্যালয় হিসাব দপ্তরের অংশটাকে উপজেলা নির্বাচন অফিসে থাকা ‘ছবিসহ ভোটার তালিকা’ ধরি এবং ব্যাংকের অংশটিকে ব্যালট পেপার ধরি তাহলে আমার পদ্ধতিটা বুঝতে সুবিধা হবে।

নির্বাচন ব্যবস্থাপনার সর্বোচ্চ স্তরে থাকেন নির্বাচন কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার এবং সর্বনিম্ন স্তরে থাকেন ভোটকেন্দ্রের বুথভিত্তিক পোলিং অফিসার। একজন ভোটার তার জাতীয় পরিচয়পত্র/ভোটার রসিদ নিয়ে ভোটকেন্দ্রের বুথে যাবে। পোলিং অফিসার তাকে সঠিক ভোটার হিসেবে শনাক্তকরণের পর বুথভিত্তিক একটা সিরিয়াল নম্বর দেবেন। তিনি যদি ওই বুথে প্রথম গিয়ে ভোট দিয়ে থাকেন তার কাস্টিং সিরিয়াল নম্বর ১। এভাবে ২, ৩, ৪, ৫... সর্বশেষ কাস্টিং সিরিয়াল নম্বর দেবেন।

পোলিং অফিসার একজন ভোটারের জাতীয় পরিচয়পত্র/ভোটার রসিদে কাস্টিং সিরিয়াল নম্বর দেবেন। কাস্টিং সিরিয়াল নম্বর পাওয়ার পর একজন ভোটার সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের কাছে গিয়ে কাস্টিং সিরিয়াল নম্বর দেখিয়ে ব্যালট পেপার সংগ্রহ করবেন। সহকারী প্রিসাইডিং ভোটারের কাস্টিং সিরিয়াল নম্বর হাতে নিয়ে মুড়িতে থাকা ব্যালট পেপার নম্বর এবং ব্যালটে থাকা ব্যালট পেপার নম্বর মিলিয়ে দেখবেন। মিলিয়ে দেখার পর মুড়িতে সিরিয়াল নম্বর লিখবেন এবং ভোটারের স্বাক্ষর/টিপসই  নেবেন। মুড়িতে ভোটারের স্বাক্ষর নেওয়ার পর সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার ভোটার রসিদে কেন্দ্র নম্বর এবং বুথ নম্বর লিখে দেবেন। তারপর ভোটারকে দেওয়া ব্যালট পেপারে স্বাক্ষর করবেন। স্বাক্ষর করার পর মুড়ি থেকে ব্যালট পেপার আলাদা করে ভোটারকে দেবেন। ব্যালট পেপার হাতে পাওয়ার পর ভোটার গোপন কক্ষে প্রবেশ করে ভোট প্রদান করে রসিদ নিয়ে ভোটকক্ষ ত্যাগ করবেন।

প্রচলিত ভোটগ্রহণ পদ্ধতির চেয়ে প্রস্তাবিত পদ্ধতির পার্থক্য:

১. বর্তমান ভোটগ্রহণ পদ্ধতিতে একটা বুথে দুজন পোলিং অফিসার এবং একজন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসার দরকার হয়। কিন্তু উল্লিখিত পদ্ধতিতে একজন পোলিং অফিসার এবং একজন সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারই যথেষ্ট।

২. বর্তমান পদ্ধতিতে ভোটকেন্দ্রের ভোটকক্ষে পোলিং অফিসার এবং সহকারী প্রিসাইডিং তাৎক্ষণিকভাবে ওই বুথে কতটি ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে তার সঠিক হিসাব বলতে পারেন না। উল্লিখিত পদ্ধতিতে সহজেই কতটা ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে তা জানা যাবে।

৩. বর্তমান ভোটগ্রহণ পদ্ধতিতে পোলিং অফিসার ছবিসহ ভোটার তালিকায় ভোটারের নামের পাশে () চিহ্ন দিয়ে ব্যালট পেপার দিয়েছেন এমনটা বোঝায়। (একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পরিচালনা ম্যানুয়েল, পৃষ্ঠা -৫৯)। প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে কাস্টিং সিরিয়াল নম্বর দিয়ে বুঝিয়ে দেবেন উনি এই বুথে ভোট দিয়েছেন। কার পরে এবং কার আগে দিয়েছেন তাও বোঝা সম্ভব।

৪. বর্তমান পদ্ধতিতে ব্যালটের মুড়িতে ভোটারের ক্রমিক নম্বর এবং স্বাক্ষর লেখা হয়। প্রস্তাবিত পদ্ধতিতে মুড়িতে ভোটার কাস্টিং সিরিয়াল নম্বর এবং ভোটারের স্বাক্ষর নেওয়া হবে।

৫. নির্বাচনের পর ভোটার রসিদ ব্যবহার করে ভোটার যাকে ভোট প্রদান করেছেন ব্যালট পেপার সেই প্রার্থীর অনুকূলে জমা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে পারবেন।

৬. যেহেতু নির্বাচন কমিশনের কাছে সব ভোটারের তথ্য-উপাত্ত জমা আছে, সেহেতু ভোটগ্রহণ করার পর বায়োমেট্রিক পদ্ধতিতে ভুয়া ভোটার ভেরিফিকেশন করার সুযোগ আছে। কার ভোট কে দিয়েছে তাও শনাক্ত করা সম্ভব। সহকারী প্রিসাইডিং অফিসারের স্বাক্ষর ভেরিফিকেশন করে আসল ব্যালট পেপার এবং ভুয়া ব্যালট পেপার শনাক্ত করা সম্ভব।

প্রস্তাবিত পদ্ধতির সুবিধা:

স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি: এই পদ্ধতিতে সারা দেশে মোট কতটি ব্যালট পেপার ছাপানো হয়েছে এবং কতটি ব্যালট পেপার ভোটগ্রহণ প্রক্রিয়ায় ব্যবহৃত হয়েছে তার হিসাব থাকবে। এছাড়া একটা আসনের জন্য কতটি ব্যালট পেপার ছাপানো হয়েছে এবং কতটি ব্যালট পেপার ব্যবহৃত হয়েছে এবং একটি ভোটকেন্দ্রে কতটি ব্যালট পেপার আনা হয়েছে এবং কতটি ব্যালট পেপার ব্যবহৃত হয়েছে তার হিসাব পাওয়া যাবে।

গণমাধ্যমকর্মী, নির্বাচন পর্যবেক্ষক এবং প্রার্থীদের সুবিধা : তারা কোনো বুথে ঢুকেই জানতে পারবেন এই বুথে ভোট কয়টি কাস্টিং হয়েছে। নির্বাচন পরবর্তী সময়ে ব্যালট পেপার ভেরিফিকেশন করার সুযোগ আছে।

ভোটারের সুবিধা : একজন ভোটার নির্বাচন পরবর্তী সময়ে তিনি যাকে ভোট প্রদান করেছেন তার অনুকূলে ভোট গণনা হয়েছে কি না তা নিশ্চিত করতে পারবেন।

অমোচনীয় কালির দরকার নেই : ভোটার রসিদ/জাতীয় পরিচয়পত্রে ভোটের কাস্টিং সিরিয়াল নম্বর থাকার কারণে অমোচনীয় কালির দরকার নেই।

কারচুপি বন্ধ : এই পদ্ধতিতে কোনো ধরনের ব্যালট পেপার ছিনতাই করে জালভোট প্রদান করার সুযোগ নেই।

লেখক: নির্বাচন পর্যবেক্ষক ও গণমাধ্যমকর্মী

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত