উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষকদের উঠিয়ে বসলেন জাবি ছাত্রলীগের দুই নেতা

আপডেট : ১৪ নভেম্বর ২০২৩, ০৪:৪২ পিএম

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে নবনির্মিত ছয়টি আবাসিক হল ও গবেষণা কেন্দ্রের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে দেরিতে উপস্থিত হয়ে জায়গা না পেয়ে শিক্ষকদের তুলে দিয়ে বসেছেন ছাত্রলীগের দুই নেতা। এ ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন শিক্ষকরা।

মঙ্গলবার (১৪ নভেম্বর) সকাল ১০টায় গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিং-য়ের মাধ্যমে এসব স্থাপনার উদ্বোধন ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী। এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের জহির রায়হান মিলনায়তন থেকে যুক্ত হন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, দুই উপ-উপাচার্য, কোষাধ্যক্ষ, সিনেট ও সিন্ডিকেট সদস্য, অনুষদের ডিন, হল প্রাধ্যক্ষসহ বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে দুইজন শিক্ষককে উঠিয়ে দিয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে বসানোর ঘটনা ঘটেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, অনুষ্ঠান শুরুর ২৪ মিনিট পর প্রায় ২০জন নেতাকর্মী নিয়ে জহির রায়হান মিলনায়তনে উপস্থিত হন শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান লিটন। ততক্ষণে অডিটোরিয়াম ভবন অতিথি দিয়ে ভরে যায়।

তখন পরিপূর্ণ হলরুমে জায়গা না পাওয়ায় ক্ষেপে যান হাবিবুর রহমান লিটন। এ সময় তাদের শান্ত করতে প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান উপস্থিত হন। প্রক্টর ও সহকারী প্রক্টরের সঙ্গে কথা কাটাকাটি হলে বিশৃঙ্খল পরিবেশের সৃষ্টি হয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে প্রক্টর তাদের নিয়ে মিলনায়তনের বাইরে যান। তখন ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা শ্লোগান দিতে শুরু করেন। পরে প্রক্টরের অনুরোধে তারা শ্লোগান বন্ধ করেন।

অডিটোরিয়াম ভবনের সামনে গিয়ে প্রক্টরের সঙ্গে আরেক দফায় বাকবিতণ্ডায় জড়ান শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক ও তার অনুসারীরা।

এ সময় শাখা ছাত্রলীগের সহসভাপতি আকাশ অনুষ্ঠান চলাকালে অডিটোরিয়াম ভবনে তালা দেওয়ার হুমকি দেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের জন্য জায়গা রাখা হয়নি, আমরা তাহলে অডিটোরিয়ামে তালা দিয়ে চলে যাই।’

এর কিছুক্ষণ পর অডিটোরিয়ামে উপস্থিত হন শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিতে তৃতীয় সারিতে বসা প্রাণিবিদ্যা বিভাগ ও দর্শন বিভাগের দুই প্রভাষককে তাদের জায়গা ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করেন প্রক্টর ফিরোজ-উল-হাসান। পরে শিক্ষকদের যথাক্রমে ষষ্ঠ ও সপ্তম সারির আসনে বসানো হয়। শিক্ষকদের তৃতীয় সারির আসনে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি আকতারুজ্জামান সোহেল ও সাধারণ সম্পাদক হাবিবুর রহমান লিটনকে বসানো হয়।

পরে অনুষ্ঠান শেষ হওয়ার আগেই ওই দুই শিক্ষককে অডিটোরিয়াম হল ত্যাগ করতে দেখা যায়। শিক্ষকদের তুলে দিয়ে সেখানে ছাত্রলীগের দুই নেতাকে বসানোর ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করছেন শিক্ষকরা।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক এম শামীম কায়সার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কালকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল যে, অডিটোরিয়ামের নিচতলায় শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বসবেন এবং ওপরের তলায় ছাত্রলীগসহ অন্যান্য শিক্ষার্থীরা বসবেন। যদি ছাত্রলীগ শিক্ষকদের সরিয়ে দিয়ে বসে থাকে এবং প্রক্টরের সঙ্গে যদি অসংলগ্ন আচরণ করে থাকে তাহলে সেটি খুবই দুঃখজনক।’
 
প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগের এমন আচরণকে ‘অশোভন’ ও শিক্ষকদের জন্য ‘লজ্জাকর’ বলে মন্তব্য করেন উপস্থিত শিক্ষকরা। জীববিজ্ঞান অনুষদের এক জ্যেষ্ঠ অধ্যাপক বলেন, ‘এমন জাঁকজমকপূর্ণ প্রোগ্রামে ছাত্রলীগের এমন আচরণ খুবই অশোভন। ভরা মজলিশে দুইজন সম্মানিত শিক্ষককে তুলে দিয়ে সেই জায়গায় ছাত্রলীগ নেতাদের বসানো শিক্ষকদের জন্য অসম্মান ও লজ্জার। আমি এই ঘটনার নিন্দা জানাই।’
 
তিনি আরও বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন একটা অনুষ্ঠানে অধ্যাপকদের চিঠি দিয়ে দাওয়াত করা হয়নি। পূর্বে এরকম কোন ঘটনার নজির নেই। প্রশাসন সম্ভবত বিরোধীমত পোষণকারীদের ভয় পায়, তাদের উপস্থিতিতে অস্বস্তিবোধ করেন।’
 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অনুষ্ঠানে উপস্থিত আরেক অধ্যাপক বলেন, ‘ষষ্ঠ ও সপ্তম সারিতে জায়গা যখন ফাঁকাই ছিল তখন ছাত্রলীগ নেতাদের সেই আসনে বসানো যেতো। দুইজন শিক্ষককে তুলে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। তাদেরকে তুলে দিয়ে শিক্ষক সমজকে নিচু করা হয়েছে।’

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর আ স ম ফিরোজ-উল-হাসান বলেন, ‘আমরা ছাত্রলীগকে আগে আসতে বলেছিলাম। আগে আসলে এই ঘটনা ঘটতো না। সকল ছাত্রলীগ নেতাকর্মীরা দাবি করেছিল যে স্ক্রিনে যাতে সভাপতি-সেক্রেটারিকে দেখা যায়, সেই ব্যবস্থা করতে হবে। দ্বিতীয় অথবা তৃতীয় সারিতে বসতে দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। আমার ওখানে অনুরোধ করার মত জুনিয়র ওই দুজনই (শিক্ষক) ছিল। আর অন্য কাউকে অনুরোধ করার কোনো সুযোগ ছিল না। ম্যাক্সিমাম সিনিয়র এবং অন্য অপরিচিত যারা স্কুল কলেজের শিক্ষক-অফিসাররা সেখানে ছিল। এই দুজন আমার অত্যন্ত কাছের এবং আপনজন দেখেই আমি তাদের অনুরোধ করতে পেরেছি। তারা হয়তো মনে কষ্ট পেলেও অনুরোধ রেখেছে।’

প্রক্টর আরও বলেন, আমাদের তো সব মিলিয়ে সমন্বয় করতে হয়। ওরা আগে আসলে এই সমস্যাটা হতো না; সামনের দিকে বসতে পারত। আমি প্রত্যাশা করব যে, এরপরে কোনো প্রোগ্রামে তারা যেন নির্দিষ্ট সময়ে আসে এবং তারা যেখানে বসতে চায়, সেখানে বসতে পারে। পুরো প্রোগ্রামটা শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করার স্বার্থেই আমি খুব কাছের দুজন মানুষকে অনুরোধ করেছি।’

এ বিষয়ে জানতে চেয়ে শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা সাড়া দেননি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত