টাকা উত্তোলনে ব্যাংকের লাইনে দাঁড়িয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করার বিরক্তি কমিয়েছে কার্ডভিত্তিক লেনদেন। আর বিদেশি বিভিন্ন কোম্পানি থেকে অনলাইনে পণ্য ক্রয় সহজ করেছে ক্রেডিট কার্ড। করোনার প্রকোপ বাড়ার পর কার্ডে বিদেশিসহ দেশীয় মুদ্রার লেনদেন ব্যাপক হারে বেড়ে যায়। কিন্তু দীর্ঘদিনের ডলার সংকটে গ্রাহকদের ক্রেডিট কার্ডে বিদেশি মুদ্রার লেনদেনের সীমা কমেছে। এতে কার্ডের মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রার লেনদেনও কমে আসছে। মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে কার্ডের মাধ্যমে বিদেশি মুদ্রার লেনদেন কমেছে ১০ শতাংশের বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত সর্বশেষ হালনাগাদ প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ হিসাবে চলতি বছরের জুলাই মাসে কার্ড ব্যবহার করে বিদেশি মুদ্রার লেনদেন হয়েছিল ৭৬৯ কোটি টাকা। আর সেপ্টেম্বরে ওই লেনদেন কমে দাঁড়িয়েছে ৬৮৯ কোটি টাকা; অর্থাৎ দুই মাসের ব্যবধানে কার্ড ব্যবহার করে বিদেশি মুদ্রার লেনদেন কমেছে ১০ দশমিক ৩৫ শতাংশ।
ব্যাংকাররা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ডলার সংকটের কারণে ক্রেডিট কার্ড গ্রাহকদের সীমা কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির কারণে অনেক গ্রাহক আগে থেকেই ধার করে রেখেছে। এতে লিমিট না থাকায় কার্ডের গ্রাহকরা লেনদেন কমিয়েছেন। এ ছাড়া ডলারের অবমূল্যায়নের কারণে বিদেশি পণ্যগুলোতে দাম বাড়ায়ও বিদেশি মুদ্রার লেনদেন কমতে পারে। এ ছাড়া ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে অনেকেই বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বিলাসী পণ্য ক্রয় করেন। এ জন্য কড়াকড়ি করেছে ব্যাংকগুলো।
কার্ড ব্যবহার করে শুধু বিদেশি মুদ্রা নয়, দেশীয় মুদ্রারও লেনদেন কমেছে। মাত্র তিন মাসের ব্যবধানে কার্ড ব্যবহার করে দেশীয় মুদ্রার লেনদেন কমেছে ১৮ দশমিক ৩০ শতাংশ। গত জুনে কার্ড ব্যবহার করে দেশি মুদ্রা লেনদেন হয়েছিল ৪৮ হাজার ৫০ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৯ হাজার ২৫৩ কোটি টাকা।
কার্ডে লেনদেন কমার কারণ জানতে চাইলে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এবং ব্যাংক নির্বাহীদের সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন অব ব্যাংকার্স বাংলাদেশের (এবিবি) সাবেক চেয়ারম্যান সৈয়দ মাহবুবুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, দেশে দীর্ঘদিন থেকেই ডলার সংকট চলছে। এ কারণে ব্যাংকগুলো ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের লিমিট কমিয়ে দিয়েছে। এতে কার্ডে বিদেশি মুদ্রার লেনদেন কমে এসেছে। আবার কোনো কোনো গ্রাহক আগে থেকে ধার করে রেখেছেন, লিমিট কমার কারণে তারা কার্ডে পেমেন্ট করতে পারছেন না।
লিমিট কমিয়ে দেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, আর্থিক সংকটের কারণে ক্রেডিট কার্ডে ঋণে দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো খুবই সতর্ক। কারণ ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারকারীদের এখন গণহারে ঋণ দিলে তারা খেলাপি হয়ে যাওয়ার শঙ্কা রয়েছে।
এদিকে, লেনদেন কমলেও দেশে ক্রেডিট, ডেবিট ও প্রিপেইড কার্ডের সংখ্যা বেড়েছে। গত জুনে দেশে ক্রেডিট কার্ডের পরিমাণ ছিল ২২ লাখ ৩৮ হাজার ৬৬৩টি। তিন মাসের ব্যবধানে সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২৩ লাখ ১৬ হাজার ১৩২টি; অর্থাৎ তিন মাসে ক্রেডিট কার্ড বেড়েছে ৭৭ হাজার ৪৬৯টি। একই সময়ে ডেবিট কার্ড বেড়েছে ১৪ লাখ ৬৬ হাজার ৮৮০টি। গত জুনে দেশে ডেবিট কার্ডের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ২১ লাখ ৩১ হাজার ৯৮৪টি। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৩৫ লাখ ৯৮ হাজার ৮২৪টি।
এ ছাড়া গত জুনে দেশে প্রিপেইড কার্ড ছিল ৪২ লাখ ৬৯ হাজার ৮০৫টি। সেপ্টেম্বরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৭ লাখ ৩৬ হাজার ৮৫১টিতে; অর্থাৎ তিন মাসে দেশে প্রিপেইড কার্ড বেড়েছে ৪ লাখ ৬৭ হাজার ৪৬টি।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য বলছে, গত জুনে ডেবিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ৪৫ হাজার ৩৪৮ কোটি টাকা। কিন্তু সেপ্টেম্বরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৬ লাখ ৭৬৯ কোটি টাকা। তিন মাসের ব্যবধানে ডেবিট কার্ডে লেনদেন কমেছে ১৮ দশমিক ৯৪ শতাংশ।
একই সময়ে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন কমেছে ১ শতাংশ। গত জুনে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছিল ২ হাজার ৫৮৩ কোটি টাকা। সেপ্টেম্বরে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ২ হাজার ৫৬৩ কোটি টাকা। আর প্রিপেইড কার্ডে লেনদেন কমেছে ১৪ দশমিক ১৪ শতাংশ। গত জুনে প্রিপেইড কার্ডে লেনদেন হয়েছিল ৪১৭ কোটি টাকা। কিন্তু সেপ্টেম্বরে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৩৫৮ কোটি টাকা।
এদিকে চলতি বছরের আগস্টে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরে লেনদেন বাড়লেও বিদেশে বাংলাদেশিদের কার্ডের মাধ্যমে ডলার ব্যয় কমেছে। ওই মাসে খরচ হয় ৪১৮ কোটি টাকা। যা আগের মাসে ছিল ৫১১ কোটি টাকা। এক মাসের ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ডে ডলারের ব্যবহার কমেছে ৯৩ কোটি টাকা বা ১৮ দশমিক ২০ শতাংশ। তবে এই সময়ে দেশের অভ্যন্তরে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেড়েছে।
তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে (জানুয়ারি-আগস্ট) দেশের মধ্যে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন হয়েছে ১৮ হাজার ৯৩৪ কোটি টাকা। আলোচ্য এই সময়ের মধ্যে বিদেশে ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে ডলার খরচ হয়েছে ৩ হাজার ৩২৪ টাকার। অর্থাৎ ক্রেডিট কার্ডে দেশের মধ্যে খরচের প্রবণতাই বেশি দেখা যাচ্ছে।
দেশভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, দেশের বাইরে লেনদেনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার হয়েছে ভারতে। এর পরিমাণ ১৭ দশমিক ৬২ শতাংশ, অর্থের হিসাবে যা ৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এ ছাড়া লেনদেনে অন্যান্য দেশ হিসেবে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ১৬ দশমিক ৩২ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ৯ দশমিক ৫১, যুক্তরাজ্যে ৭ দশমিক ৬৯, সিঙ্গাপুরে ৭ দশমিক ৬১, কানাডায় ৬ দশমিক ৭১ শতাংশ, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৬ দশমিক ৪৯, মালয়েশিয়ায় ৫ দশমিক ৪০, সৌদি আরবে ২ দশমিক ৮৯, নেদারল্যান্ডসে ২ দশমিক ৮১, আয়ারল্যান্ডে ২ দশমিক ৭৩, অস্ট্রেলিয়ায় ২ দশমিক ১৯ শতাংশ এবং অন্যান্য দেশে ১২ দশমিক ০২ শতাংশ।
দেশের মধ্যে ব্যবহার করা ক্রেডিট কার্ডের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেশি হয়েছে দেশের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। মোট ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের ৫০ শতাংশ অর্থাৎ অর্ধেক লেনদেন হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোয়। এ ছাড়া ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ খুচরা দোকানের ক্ষেত্রে, ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ ইউটিলিটি, ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ নগদ অর্থ উত্তোলন, ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ ওষুধ ও ফার্মেসিতে, ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ পোশাক কেনাকাটা, ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ লেনদেন হয়েছে ফান্ড ট্রান্সফারে, ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ ট্রান্সপোর্টেশন, ২ দশমিক ১৮ শতাংশ ব্যবসা সেবা এবং ১ দশমিক ০৯ শতাংশ ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন হয়েছে অন্যান্য প্রয়োজনে।
