বিশ্বকাপ ক্রিকেটের ঢাকঢোল আর বাংলাদেশ দলের ব্যর্থতার পাঁচালির আড়ালেই শেষ হয়ে গেল জাতীয় ক্রিকেট লিগের (এনসিএল) ২৫তম আসর। দেশের শীর্ষ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট প্রতিযোগিতাটি বেশিরভাগ সময়ই বঞ্চিত থাকে পাদপ্রদীপের আলো থেকে। খেলেন না দেশের শীর্ষ ক্রিকেটাররা, তাই গণমাধ্যমেরও মনোযোগ আকর্ষিত হয় না। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ, ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের চেয়ে গুরুত্বে এবং আকর্ষণে পিছিয়ে আছে জাতীয় লিগ। শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারদের উপস্থিতি নেই, আর্থিক সংশ্লেষও তুলনামূলক কম, সেই সঙ্গে প্রচার পরিচিতিও। দেশের শীর্ষ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট প্রতিযোগিতা তাই গুরুত্বে তৃতীয় শ্রেণিতে নেমেছে।
গুরুত্বহীন যেকোনো কিছুর স্থায়িত্ব কম হয়, কোনো রকমে সেরে ফেলার প্রবণতা থাকে। জাতীয় লিগের বেলায়ও বেশিরভাগ সময় তা-ই হয়ে আসছে। এবারের ২৫তম আসর যেমন ১২ অক্টোবর মাঠে গড়িয়েছে, আর ২১ নভেম্বর সমাপ্তি। মাত্র দেড় মাসেই শেষ প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটের মৌসুম। ৮ দলের দুই স্তর বিভাজনে প্রতিটি দল খেলেছে মাত্র ৬টি করে ম্যাচ। অথচ বিশে^র অন্যান্য দেশের প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট মৌসুম হয় দীর্ঘ, প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক। ভারত বিশাল দেশ, ৩৮টি রাজ্য দল অংশ নেয় রনজি ট্রফিতে। ৪টা গ্রুপ ও প্লেট গ্রুপ। প্রতি গ্রুপে ৮টি করে দল, প্লেট গ্রুপে মূলত উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি রাজ্যের ৬টি দল যেসব জায়গায় ক্রিকেট খানিকটা অনগ্রসর। গ্রুপ পর্বে খেলা হয় রাউন্ড রবিন পদ্ধতিতে, অর্থাৎ সবার সঙ্গে সবার একটা করে ম্যাচ। এরপর নকআউট। একটা দল খেলে গ্রুপ পর্বে ৭ ম্যাচ, শীর্ষ দুই দল উত্তীর্ণ হয় নকআউটে। এরপর নকআউটে সুযোগ আছে সর্বোচ্চ ৩টা ম্যাচ খেলার, কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও ফাইনাল; অর্থাৎ রনজি ট্রফিতে এক মৌসুমে দুইটা দলের সর্বোচ্চ ১০টা ম্যাচ খেলারও সুযোগ আছে। এর বাইরেও বয়সভিত্তিক বড় দৈর্ঘ্যরে ক্রিকেট প্রতিযোগিতা হয়। এ ছাড়া প্রাদেশিক পর্যায়ের প্রতিযোগিতা তো আছেই।
বাংলাদেশে এনসিএলে ভালো করা ক্রিকেটারদের নিয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিভিত্তিক একটি প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট টুর্নামেন্ট হয় বাংলাদেশ ক্রিকেট লিগ। জন্মলগ্নেই চার ফ্র্যাঞ্চাইজির একটি বিক্রি করতে না পেরে নিজেদের মালিকানায় রেখেছিল বিসিবি, একপর্যায়ে সরে গেছে প্রাইম ব্যাংকও। চার দলের এই আসর কখনো সিঙ্গেল লিগ কখনো বা ডাবল লিগ হয়েছে। গ্রুপ পর্বে তিনটা ম্যাচ, শীর্ষ দুই খেলে ফাইনাল। এই নিয়মেই হয়েছে সবশেষ ৩ আসর।
টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের বাইরের দল জিম্বাবুয়ে, তাদেরও ঘরোয়া প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে ৫ দলের আসর, ডাবল লিগ পদ্ধতিতে প্রতিটা দল এক মৌসুমে খেলে ৮ ম্যাচ। নিউজিল্যান্ডের জনসংখ্যা কম, ৫০ লাখের একটু বেশি। তবুও ১ লাখ ৭০ হাজারের বেশি নিবন্ধিত ক্রিকেটার আছে নিউজিল্যান্ডে! তাদের ঘরোয়া ক্রিকেটে প্রথম শ্রেণির প্রতিযোগিতা প্লাঙ্কেট শিল্ডে অংশ নেয় ৬টি প্রাদেশিক দল। রাউন্ড রবিন লিগে মোট ২৪টা ম্যাচ, কোনো স্তর বিভাজন নেই।
ইংল্যান্ড এবং অস্ট্রেলিয়ার কাউন্টি ক্রিকেট এবং শেফিল্ড শিল্ডের সঙ্গে তুলনা করাটা হবে মূর্খতা, তবে অন্তত জিম্বাবুয়ে-আফগানিস্তানের চেয়ে তো এগিয়ে থাকার কথা বাংলাদেশের। সেটাই বা হচ্ছে কোথায়? জিম্বাবুয়ের প্রথম শ্রেণির টুর্নামেন্ট লোগান কাপে একটি দল খেলে ৮ ম্যাচ, আফগানিস্তানে আহমেদ শাহ আবদালী প্রতিযোগিতায় একটা দল খেলে ৪ ম্যাচ। আর এনসিএলে বাংলাদেশের একেকটা দল খেলেছে ৬ ম্যাচ। জাতীয় দলের সাবেক পেসার তারেক আজিজ খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘খেলা অপর্যাপ্ত তো হচ্ছেই, তার ওপর প্রতিদ্বন্দ্বিতার মান অত্যন্ত কম। ঢাকা থেকে দল করে দেওয়া হয় ৮ বিভাগের, একেক জায়গার ক্রিকেটার একেক জায়গায় খেলে। যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা নিয়ে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট চলছে, এর সঙ্গে টেস্ট ক্রিকেটের আকাশ-পাতাল ফারাক। এই পর্যায়ে খেলে ভূরি ভূরি রান বা উইকেট নিয়ে এলেও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য পাওয়া যাবে না। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট আয়োজনটা হয়ে যাচ্ছে একদমই দায়সারা গোছের, স্রেফ করার জন্য করা। কোনো ভ্যালু অ্যাডিশন হচ্ছে না।’
ক্রিকেটারদের দাবির মুখে ম্যাচ ফি, আবাসন, যাতায়াতসহ অনেক সুযোগ-সুবিধা বাড়লেও ম্যাচের সংখ্যা বাড়ে না। সেই সঙ্গে শীর্ষস্থানীয় ক্রিকেটারদের পাশাপাশি উঠতি প্রতিভাবান ক্রিকেটাদেরও পাওয়া যায় না জাতীয় লিগে। বিশ^কাপের জন্য শীর্ষ ক্রিকেটাররা নেই, হাই পারফরম্যান্স দলের শ্রীলঙ্কা সফরের কারণে মাহমুদুল হাসান জয়, শাহাদাত হোসেন দীপু, আকবর আলী, মুশফিক হাসানরাও জাতীয় লিগে খেলেননি অনেকটা সময়। জাতীয় লিগের দলগুলোতে একসময় বিদেশি খেলোয়াড়দের দেখা যেত। পাকিস্তানের জাতীয় দলের সাবেক উদ্বোধনী ব্যাটসম্যান ইমরান ফারহাত বেশ নিয়মিতই খেলেছেন। তবে এখন একজন নিবন্ধনের নিয়ম থাকলেও কোনো দলকেই বিদেশি ক্রিকেটার আনতে মনোযোগী হতে দেখা যায় না।
জাতীয় লিগের সময় অন্যান্য দলের সফরসূচি রাখায় অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন সিলেট বিভাগীয় দলের ম্যানেজার ফরহাদ কোরেশি। সাবেক প্রথম শ্রেণির এই ক্রিকেটার বলেন, ‘অন্যান্য দেশে টেস্ট দলের ক্রিকেটারও যদি একাদশে না থাকে তাহলে দেখবেন কাউন্টি খেলা বা শেফিল্ড শিল্ডের খেলার জন্য ছেড়ে দেবে। কিন্তু আমাদের এখানে জাতীয় লিগের সময় এইচপি, এ দল এ রকম অনেক দলের খেলা থাকে এবং খেলোয়াড় ছেড়ে দিতে হয়। শীর্ষ ক্রিকেটাররা না হয় খেলতে চান না বুঝলাম, এখন তরুণরাও জাতীয় লিগে খেলতে অনাগ্রহী।’
এসবের ফল চার দিনের ম্যাচও শেষ হচ্ছে আগেভাগে। অর্ধেকের বেশি ইনিংসে দলীয় রান ২০০ অতিক্রম করেনি। ৪৬ রানে অলআউট, ৫৪ রানে অলআউট, ৮১ রানে অলআউটের ঘটনা দেখা গেছে। দলীয় সংগ্রহ ৪০০ রানের গ-ি ছাড়িয়েছে মাত্র ৮ বার। টেস্ট ক্রিকেট পা রেখেছে ‘বাজবল’ যুগে আর টেস্ট মর্যাদা প্রাপ্তির ২৩ বছর পরও বাংলাদেশ কেন টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের তলানিতে থেকে যাচ্ছে সেটা জাতীয় লিগের দিকে তাকালেই বোঝা সম্ভব।
ক্রিকেটারদের দক্ষতা, ধৈর্য, চরিত্র সবই গড়ে ওঠে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেট খেলা থেকে। এ জন্যই টি-টোয়েন্টির যুগে এসেও ব্যস্ততম দলগুলোর কাছেও টেস্টের মর্যাদা কমেনি। বাংলাদেশের কাছে প্রথম থেকেই টেস্ট মর্যাদা ছিল আইসিসি ট্রফির দরজা এড়িয়ে সরাসরি ওয়ানডে বিশ^কাপে খেলার টিকিট। টেস্ট সংস্কৃতি গড়ে না ওঠার কারণেই লিটন দাস দেশের মাটিতে টেস্ট খেলার চেয়ে পরিবারের সঙ্গে সময় কাটানোকে বেশি গুরুত্ব দেন। আসলে গলদটা গোড়াতেই। প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটকে তৃতীয় শ্রেণির মর্যাদায় ফেলে রাখলে মাঠের পারফরম্যান্স এবং ক্রিকেটারদের আচরণে তার ছাপ তো পড়বেই।
