এরশাদের প্রশংসায় পোস্টার বয় হয়ে উঠলেন মিলন

আপডেট : ২৮ নভেম্বর ২০২৩, ০৮:২৪ পিএম

হাঁটাচলার সময় সাইফুদ্দিন আলম মিলনের পোস্টার চোখে পড়েনি এমন মানুষ এই নগরে বিরল। পোস্টারের হাস্যোজ্জ্বল এই মুখটি এবার বাস্তবে কিছুটা মলিন। জাতীয় পার্টির প্রেসিডিয়াম সদস্য মিলন দল থেকে এমপি নির্বাচনের মনোনয়ন চেয়েছিলেন, কিন্তু পাননি। মিলনের রাজনৈতিক পথচলা কিংবা তার এই ‘পোস্টার বয়’ হয়ে ওঠার গল্প শুনেছে দেশ রূপান্তর।

১৯৯৮ সালে জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষ্যে ঢাকার কয়েকটি এলাকায় পোস্টার সাঁটিয়েছিলেন মিলন। একদিন জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মোহাম্মদ এরশাদের নজরে পড়ে সেই পোস্টার। তিনি ডেকে নিয়ে বলেন, ‘মিলন তুমিতো ভালো কাজ করতেছো। আমার খুব পছন্দ হয়েছে পোস্টারগুলো। দলের জন্য তো কেউ এভাবে চিন্তা করে না।’

মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এরশাদ স্যারের এই কথাগুলো আজও আমার কানে বাজে। সেই থেকেই আমার পোস্টার লাগানো শুরু।’

রাজধানীর আজিমপুর এলাকার বাসিন্দা মিলনের সঙ্গে গতকাল মঙ্গলবার কথা হয়। মিলনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায় তার পোস্টারবয় হয়ে উঠার গল্প। মিলন পোস্টার সাঁটান জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ও নিজে নির্বাচনে দাঁড়ালে।

মিলন বলেন, মানুষ বিভিন্ন দিবস ও উৎসবকে কেন্দ্র করে পোস্টার লাগায়। ঈদ কিংবা বৈশাখ আসলে রাজনীতিবিদরা পোস্টার লাগান। কিন্তু আমি কেবল দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে পোস্টার লাগাই এরশাদ স্যারের কথা রাখার জন্য। এর বাইরে আমি নির্বাচনে দাঁড়ালে পোস্টার লাগাই।

সাইফুদ্দিন আলম মিলন ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো অংশ নেন। সেবার তার পোস্টারগুলো সবার নজর কাড়ে এবং আলোচনায় নিয়ে আসে। তাকে নিয়ে সে সময় বিভিন্ন গণমাধ্যমে সংবাদ প্রচার হয়।

সবাই নির্বাচন আসলে পোস্টার লাগায় কিন্তু কেবল আপনাকে নিয়ে আলোচনা কেনো হয় এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমার পোস্টার লাগানোর মধ্যে নিজস্ব একটা ভাবনা আছে। আমি সবসময় এমন জায়গায় পোস্টার লাগাই যেন মানুষের নজরে পড়ে। ঢাকা শহরের সবচেয়ে উঁচু জায়গায় আমি পোস্টার সাঁটাই। যেন সহজেই মানুষের চোখে পড়ে আর কেউ ছিঁড়তে না পারে। আমি কখনো কারও পোস্টারের ওপরে পোস্টার বসাই না। ফলে আমাকে নিয়ে আলোচনা বেশি হয়। 

মিলন জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আসলে ৮ হাজার করে পোস্টার সাঁটান। ১৯৯৪ সাল থেকে শুরু করে ২০২২ সাল পর্যন্ত এই ২৮ বছরের মধ্যে দেশের বাইরে থাকায় ২-৩ বার তিনি পোস্টার সাঁটাতে পারেননি। ফলে ২৫ বছরে ৮ হাজার করে মোট প্রায় ২ লাখ পোস্টার সাঁটিয়েছেন। এর বাইরে ১৯৯৬ সালের জাতীয় নির্বাচনসহ মোট চারবার সংসদ নির্বাচন ও দুইবার ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে তিনি দাঁড়িয়েছেন। সংসদ ও সিটি নির্বাচনে তিনি কত পোস্টার সাটিয়েছিলেন সেই হিসেব তার কাছে নেই।

পোস্টারের পেছনে এ পর্যন্ত কত টাকা খরচ হয়েছে সেই হিসেব নিজেও জানেন না মিলন। ব্যবসার টাকা থেকে যখন যা লাগে তাই দিয়েছেন। ফলে আলাদা হিসেব রাখতে পারেননি। মানুষ যেখানে দল থেকে টাকা নেয় সেখানে দলের নিয়মিত চাঁদা পরিশোধ ছাড়াও বিভিন্নভাবে টাকা দিয়েছেন বলে দাবি তার।

নির্বাচনে দাঁড়ালেও কখনো জিততে পারেননি মিলন। এ নিয়ে তার কোনো আফসোস নেই। মিলন বলেন, ‘মানুষ আমাকে ভালোবেসে যা ভোট দিয়েছে তাতেই আমি সন্তুষ্ট। সবাই সংসদে যাবে এমপি হবে বা মেয়র হবে এমন তো নয়।

মিলন এবার ঢাকা-৭ আসন থেকে মনোনয়ন চাইলেও তাকে মনোনয়ন দেয়নি জাতীয় পার্টি। এ প্রসঙ্গে মিলন বলেন, ‘আমি জি এম কাদের স্যারের সঙ্গে কথা বলেছি। স্যার বলেছেন, ‘তুমিতো আমাদের মেয়র প্রার্থী, তাই তোমাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়নি। আগামী সিটি নির্বাচনে তোমাকে মেয়র পদে নমিনেশন দেব।’

তবে রাগ ক্ষোভ আর অভিমানে গত বছর থেকে পোস্টার সাঁটানো বন্ধ করে দিয়েছেন এই পোস্টারবয়। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি এমন জায়গাগুলোতে পোস্টার লাগাতাম, যেখানে অন্য কেউ চিন্তাই করতে পারতো না। আমি লাগানোর পর অন্যরাও আমাকে অনুসরণ করতো। সবাই তো ভালো মানুষ নয়, তাই একটা অংশ ফেসবুকে ও গণমাধ্যমে আমার বিরুদ্ধে লেখে। আওয়ামী লীগের মানুষজন ঢাকার অলিগলি আর স্থাপনায় পোস্টারের বন্যা বসিয়ে দিলেও কোনো সমস্যা হয় না। তাদের জন্য কোনো আইন নেই, অথচ আমার বিরুদ্ধে সিটি কর্পোরেশন থেকে আইনি নোটিশ পাঠানো হল।’

রাস্তায় বের হলেই আমাকে দেখা যায়, এজন্য অন্যদের খারাপ লাগে। আমার ছবি কেন রাস্তায় দেখা যায়, তাদের ছবি কেন দেখা যায় না– এ জন্যে আমাকে হিংসে করে। যারা হিংসে করে আমার বিরুদ্ধে খারাপ কথা বলে, এদের সংখ্যা কম। এই মানুষ সমালোচনা করে, কারণ তাদের খারাপ লাগে, আর বাকি মানুষ প্রশংসা করে।

মেট্রো রেলের পিলারে পোস্টার লাগানো নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছিলেন মিলন। এ নিয়ে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমার পোলাপান যারা পোস্টার লাগায়, এরা তো শিক্ষিত না। টাকা দিই, পোস্টার লাগায়, তাই ওরা ভুল করে মেট্রো রেলের পিলারে পোস্টার লাগিয়েছিল। সমালোচনার মুখে আমি সেই পোস্টার সরিয়ে দিয়েছিলাম। অথচ, এখন তো সেই মেট্রোরেলের ভেতরে ও স্টেশনেও পোস্টার লাগানো হচ্ছে। কই তাদের বিরুদ্ধে তো কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

রাজনীতির বাইরেও তিনি গরীব মানুষের জন্য কাজ করেন। ১৯৮৮ ও ২০০৪ সালের বড় বন্যাতে তিনি দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ত্রাণ বিতরণ করেছেন। এর বাইরে প্রতিবার বন্যা আসলে দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ত্রাণ বিতরণ করেছেন।

এ বিষয়ে মিলন বলেন, আমার তো খুব বেশি টাকা নেই। যা আছে সাধ্য অনুযায়ী মানুষকে দিই। কোভিডের পুরো সময় আমি মানুষকে সাহায্য করেছি। মানুষের জন্য আমি একটা বাড়ি বানিয়ে ভাড়া দিয়েছি। সেখান থেকে যে টাকা আসে তার পুরো টাকা আমি গরীব মানুষকে সেই ট্রাস্টের মাধ্যেমে দান করি।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত