উন্নয়ন এজেন্ডা ও যুব ম্যানিফেস্টো

আপডেট : ২৯ নভেম্বর ২০২৩, ০৫:০০ এএম

যেকোনো বিবেচনায় বাংলাদেশ এই মুহূর্তে একটি রূপান্তর প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। রাজনৈতিকভাবে আমরা এমন একটি অস্থির সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি যা আমাদের ধারাবাহিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। প্রতিবন্ধকতা অনেকটা সংস্কৃতিগত, অর্থনৈতিক অগ্রগতির সঙ্গে সঙ্গে সাংস্কৃতিক পরিবর্তনের তাল মেলাতে না পারার ব্যর্থতা। আবার অর্থনৈতিক উন্নয়নের অসম বণ্টনও এর অন্যতম কারণ। তারপরও অর্থনৈতিক উন্নয়ন সার্বিকভাবে যে জনআকাক্সক্ষা তৈরি করেছে যার উল্টোপিঠে আছে অজানা আশঙ্কা। বর্তমান বিশ্ব পরিস্থিতি ও জাতীয় আর্থ-সামাজিক বিবেচনায় তার যুক্তিগ্রাহ্য কারণও আছে বটে। বিশ্ব পরিস্থিতির ওপর আমাদের প্রভাব সামান্যই কিন্তু অবস্থার যতটুকু উন্নয়ন করা সম্ভব তা শুধু জাতীয় পর্যায়ে এবং প্রয়োজনীয় কৌশলপত্র প্রণয়নের মাধ্যমে। এই কৌশলপত্র শুধু অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জনের জন্য না, এর সঙ্গে তাল মিলিয়ে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরের ধারাবাহিকতা রক্ষা করার জন্যও। আর একমাত্র এই দুইয়ের সমন্বয়ই টেকসই উন্নয়নের ধারাবাহিকতা নিশ্চিত হতে পারে। আর এর অভাবই যেন সেই অজানা আশঙ্কার ফাঁদে একটু একটু করে ঝুঁকে পড়া এবং আখেরে নিজেদের সম্ভাবনা বিসর্জন দেওয়া।

বাংলাদেশের এই রূপান্তরের প্রাণশক্তি এই দেশের যুবসমাজ, তা যতটুকু হয়েছে এবং ভবিষ্যতে যতটুকু হবে তার সবটার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। বাংলাদেশের বিবেচনায় মানবসম্পদই প্রধান সম্পদ আর এই মানবসম্পদের প্রধান কর্মশক্তি হচ্ছে আমাদের দেশের যুবারা। যুবদের আছে অদম্য কর্মশক্তি, উদ্ভাবনী দক্ষতা ও পরিবর্তন করার অসীম সাহস। আর এর সঙ্গে যদি জনমিতিতে তাদের সংখ্যাই বেশি থাকে তাহলে তো সোনায় সোহাগা। বলা হচ্ছে বাংলাদেশ এই মুহূর্তে জনমিতির সুফলের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে যেখানে যুবদের সংখ্যা প্রায় ২৮ শতাংশ, যাদের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছরের মধ্যে। আগামী প্রায় এক যুগ এই সুফল থাকবে এবং তারপর ধীরে ধীরে জনমিতির সুফল কমে আসবে যেখানে কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর হার কমে যাবে এবং নির্ভরশীল জনগোষ্ঠীর সংখ্যা বেড়ে যাবে। এখন এই সীমিত সময়ের মধ্যে এই যুব কর্মশক্তিতে কতটুকু ব্যবহার করা যাবে তা নির্ভর করছে তাদের কীভাবে প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং তাদের জন্য কতটুকু সহায়ক পরিবেশ তৈরি করা হচ্ছে।

অন্যদিকে বাংলাদেশ যুব জনসংখ্যা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ না। যার মধ্যে আছে শহুরে, গ্রামীণ, প্রান্তিক, নারী, আদিবাসী, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন যুব ইত্যাদি এদের সবাইকে উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি যেমন গুরুত্বপূর্ণ একই সঙ্গে জাতীয় উন্নয়ন ও

সাংস্কৃতিক রূপান্তর প্রক্রিয়ায়ও এদের ভূমিকা নিশ্চিত করাও জরুরি। এই গুরুদায়িত্ব এখন সবার ওপর বিশেষ করে আসছে নতুন সরকারের ওপর যাতে এই মানবসম্পদ স্বপ্নের রূপান্তরের দক্ষ কারিগর হিসেবে তৈরি হয়। বাংলাদেশের যুবরাও তাই মনে করে। সম্প্রতি বেশ কয়েকটি প্রক্রিয়ায় যুবরা এ সম্পর্কে নিজেদের মতামত ব্যক্ত করেছে এবং দাবি করেছে রাজনৈতিক দলগুলো নির্বাচনী ইশতেহারে এই বিষয়গুলো বিবেচনায় নেবে এবং বাস্তবায়নে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করবে। 

এ সম্পর্কিত বেশ কিছু আলোচনা ও জরিপে যুবরা মূলত শিক্ষা, দক্ষতা, কর্মসংস্থান ও শিল্পোদ্যোগ ইত্যাদি সম্পর্কিত উদ্যোগ গ্রহণের কথা বলেছে। বিআইডিএস-এর এক তথ্য বলছে বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষিত  যুবকদের মধ্যে বেকারত্বের হার আশঙ্কাজনক হারে পৌঁছেছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক পাসের পর ৬৬ শতাংশ যুবক বেকার থাকছে। সম্প্রতি একশনএইড বাংলাদেশ ও ইয়ুথ পলিসি ফোরাম (ওয়াইপিএফ)-এর এক জরিপ অনুযায়ী ৮৬ শতাংশ যুবক মনে করেন বাংলাদেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থা তাদের চাকরির বাজার বা আত্মকর্মসংস্থানের জন্য উপযোগী করে গড়ে তুলছে না। পাশাপাশি ৭৭ শতাংশ মনে করেন বাস্তবমুখী শিক্ষা, দক্ষতা অর্জন ও আত্মকর্মসংস্থানমূলক সুযোগ যদি তৈরি করা যায় তাহলে তা সামগ্রিকভাবে বেকার সমস্যা দূরীকরণে সহায়তা করবে। এই একই জরিপের ফলাফল অনুযায়ী যুবরা দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্য নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা সম্পর্কিত বিষয়সমূহকে যুবদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। আর সেই বিবেচনায় তারা কৃষির আধুনিকায়নে ঋণ ও প্রশিক্ষণের পাওয়ার ওপর গুরুত্ব দিয়েছে। পাশাপাশি তারা অর্থনৈতিক সংকটে সরকারের তরফ থেকে আর্থিক সহযোগিতার কথা উল্লেখ করেছে। অন্যদিকে একটি সুস্থ প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে স্বাস্থ্যসেবা, যৌন ও প্রজনন সম্পর্কিত জনস্বাস্থ্য খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি ও কার্যকরী ব্যবস্থাপনা এবং যৌন ও প্রজনন স্বাস্থ্য সম্পর্কিত সেবা কার্যক্রমকে আরও জোরদার করার কথা উল্লেখ করেছে।

যুবরা মনে করে জলবায়ু পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী একটি জরুরি সংকট। তাই জলবায়ু পরিবর্তন সম্পর্কিত সংকট মোকাবিলায় পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে হবে। সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়নে উদ্যোগ গ্রহণ, বাস্তুচ্যুত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকা তরুণদের কর্মসংস্থান, ও বিভিন্ন ধরনের দূষণরোধে ভূমিকা গ্রহণ করার কথা তারা জোর দিয়ে বলছে। একশনএইড বাংলাদেশ ও ওয়াইপিএফ-এর এই জরিপে ৭৬ শতাংশ যুব আরও মনে করেন বাংলাদেশের এখন পরিবেশবান্ধব উদ্যোগ ও প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ করা উচিত ও বিনিয়োগে উৎসাহিত করা উচিত। তাদের দৃষ্টিতে জ্বালানি ব্যবস্থাপনায় রূপান্তরে এখনই সময় এবং তরুণদের দক্ষতা বৃদ্ধি এই রূপান্তর প্রক্রিয়াকে আরও বেগবান করতে পারে। তারা ধারাবাহিকভাবে নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদনে সরকারকে গুরুত্বারোপ করতে হবে। শুধু তাই নয়, একই সঙ্গে ৭০ শতাংশ যুব অ-নবায়নযোগ্য শক্তির ওপর বাংলাদেশের নির্ভরশীলতার পক্ষে নন। তারা মনে করেন বাংলাদেশের উচিত অ-নবায়নযোগ্য শক্তির ব্যবহার পর্যায়ক্রমে বন্ধের লক্ষ্যে কাজ করা।

তথ্যপ্রযুক্তির ক্ষেত্রে যুবরা সরকারি সেবা প্রদানকারী প্লাটফর্মগুলো যাতে জনবান্ধব হয় ও এর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায় সে সম্পর্কে দাবি তুলছে। তারা বলছে শহর ও গ্রামের মধ্যকার ডিজিটাল বিভক্তি দূর করতে হবে, ইন্টারনেট প্যাকেজের মূল্যহ্রাস করতে ভ্যাট ও  ট্যাক্সের সমন্বয় করা, সাইবার বুলিং প্রতিরোধ, প্রান্তিক পর্যায়ে স্টার্ট-আপ ও ফ্রিল্যান্সার তৈরিকে সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তৈরির হাতিয়ার হিসেবে দেখছে। এক তথ্য অনুযায়ী, ই-সার্ভিস ডেলিভারিতে বাংলাদেশ ১৯৩টি দেশের মধ্যে ১১৫তম অবস্থানে আছে যা এই খাতে বাংলাদেশের আরও দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার বিষয়টি নির্দেশ করে। ওয়াইপিএফ ও একশনএইড বাংলাদেশ-এর জরিপে প্রায় ৬৪ শতাংশ যুব জানিয়েছে তারা বর্তমানে অনলাইনে প্রাপ্ত ই-সার্ভিস নিয়ে সন্তুষ্ট নন। পাশাপাশি তারা মনে করেন নারীর প্রতি সহিংসতা ও যৌন সহিংসতা প্রতিরোধে উদ্যোগ  নেওয়া দরকার, এখনো বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বাল্যবিবাহপ্রবণ দেশগুলোর একটি।  ইউনিসেফের সাম্প্রতিক প্রতিবেদন অনুযায়ী বাংলাদেশের ৫১ শতাংশের বেশি তরুণী বাল্যবিবাহের শিকার হন। বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক রূপান্তরে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নারীর অংশগ্রহণসহ অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নারীর প্রতি যেকোনো বৈষম্য, সহিংসতা ও বাল্যবিবাহ এক্ষেত্রে বড় বাধা। সবশেষ এই যুবরা রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি, বিকেন্দ্রীকরণ ব্যবস্থায় প্রান্তিক যুবদের জন্য সুযোগের সমতা তৈরি, দুর্নীতি প্রতিরোধ উদ্যোগ ইত্যাদি বিষয়ের ওপর তাদের মতামত ব্যক্ত করেছে।

এই জরিপের পাশাপাশি সম্প্রতি সিটিজেন প্ল্যাটফর্ম ফর এসডিজি, বাংলাদেশ, যুবদের ওপর এক জরিপ চালিয়েছে, এই জরিপে ৬০ শতাংশ যুবক বলেছে কর্মসংস্থানের জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়া চালু করতে হবে, এর পাশাপাশি ৪৮ শতাংশ যুবক জীবনধারণের জন্য প্রয়োজনীয় মজুরির নিশ্চয়তার কথা উল্লেখ করেছে। প্রায় একই শতাংশ যুবক উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণের সংস্থানের কথা বলেছে। পাশাপাশি যুবরা মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ক্ষেত্রে সব ধরনের প্রতিবন্ধকতা দূর করার উদ্যোগ, বেকারভাতা, সংসদ নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য যুবদের জন্য কোটা ব্যবস্থার সংরক্ষণ, উপজেলা পর্যায়ে মানসিক স্বাস্থ্য ও মাদকাসক্ত নিরাময়ে চিকিৎসাসেবা প্রদান, কর্মজীবী নারীদের জন্য দিবাযতœ কেন্দ্রের ব্যবস্থা ইত্যাদি বিষয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে। 

যে কোনো উন্নয়নের জন্য সঠিক পরিকল্পনা দরকার, আর যুবদের জন্য অবশ্যই তা করতে হবে কারণ যুবদের উন্নয়ন নিঃসন্দেহে একটি বিশেষায়িত বিষয়। অন্যদিকে যেকোনো উন্নয়ন একটি ধারাবাহিক প্রক্রিয়া কিন্তু বাংলাদেশের জন্য উন্নয়নের বড় সংকট হচ্ছে এখানে সব বিনিয়োগ মানবসম্পদ উন্নয়নের নিশ্চয়তা দেয় না। প্রায়ই দেখা যায় দক্ষ ব্যবস্থাপনার অভাবে অবকাঠামোর সুবিধা দেশের জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছায় না, বিশেষ করে সামাজিকভাবে সুবিধা বঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর কাছে। সেক্ষেত্রে এই অবকাঠামো পরিচালনার দায়িত্বে যারা থাকেন প্রথমত তাদের দায়বদ্ধতা ও জবাবদিহির যেমন ঘাটতি আছে একই সঙ্গে এদের দক্ষতার ঘাটতিও প্রবল। বেশিরভাগ উন্নয়ন পরিকল্পনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, দায়বদ্ধতা ও প্রয়োজনীয় দক্ষতা ঠিকঠাক আছে ধরে নিয়ে অবকাঠামোগত উন্নয়ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। তবে শেষ পর্যন্ত অবকাঠামোগত উন্নয়নটাই হয়। কিন্তু ব্যবস্থাপনা দক্ষতার অভাবে অবকাঠামোর পরিপূর্ণ সুবিধা অর্জন করা আর হয়ে ওঠে না। অভিজ্ঞতায় বলে উন্নয়ন কর্মসূচি হওয়া উচিত ব্যবস্থাপনাগত প্রস্তুতি আগে এবং এর পরে প্রয়োজনীয়গত অবকাঠামোগত উন্নয়ন। যুবদের উন্নয়ন সম্পর্কিত গ্রহণের ক্ষেত্রে ভবিষ্যৎ সরকারের পক্ষ থেকে এই বিষয়গুলো ভেবে দেখা যেতে পারে।

লেখক: উন্নয়নকর্মী ও কলামিস্ট

 [email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত