ইসলামের বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়নকারী ব্যক্তিত্ব

জীবনালেখ্য

আপডেট : ০১ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৮:৪৬ এএম

সমকালীন যে ক’জন মনীষী ইসলামি জ্ঞানের প্রসার ও পৃষ্ঠপোষকতা এবং আধ্যাত্মিক সাধনার মাধ্যমে মুসলিম জনসাধারণের মধ্যে ধর্মীয় জাগরণ সৃষ্টিতে সবিশেষ অবদান রেখে চলেছেন, শায়খুল হাদিস মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ তাদের অন্যতম। তিনি ফরিদাবাদ মাদ্রাসার প্রধান মুফতি, প্রাজ্ঞ আলোচক ও নন্দিত লেখক। তার বর্ণাঢ্য জীবন নিয়ে লিখেছেন দারুল উলুম ঢাকার মুহতামিম মুফতি রেজাউল হক মুহাম্মদ আবদুল্লাহ

শায়খুল হাদিস মাওলানা মুফতি আবু সাঈদ ১৩৮১ হিজরি সালের ১৮ রমজান মোতাবেক ২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন। শুক্রবার সুবহে সাদেকের সময় তার জন্ম হয় মেঘনা, ডাকাতিয়া ও ধনাগোদা নদীর অববাহিকার কোলজুড়ে ঘন সবুজ ভূখণ্ড চাঁদপুর জেলার হাজীগঞ্জ থানাধীন ফুলছোঁয়া গ্রামে। পিতা মৌলভী আব্দুল লতিফ (রহ.) ছিলেন একজন বুজুর্গ মানুষ। তিনি স্থানীয় স্কুল ও মাদ্রাসায় শিক্ষকতা করতেন। বাংলাদেশের অন্যতম ইসলামি ব্যক্তিত্ব হজরত কারি ইবরাহীম (রহ.) ছিলেন তার পীর ও মুর্শিদ। মুফতি আবু সাঈদ প্রথমে গ্রামের সাবাহি মক্তব ও প্রাইমারি স্কুলে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। অতঃপর নানাবাড়ি উজানীতে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তি হন। সেখানে সানাবিয়া মারহালা (উচ্চ মাধ্যমিক স্তর) প্রথম বর্ষ (কাফিয়া) পর্যন্ত অত্যন্ত সুনামের সঙ্গে লেখাপড়া করেন। এরপর তিনি রাজধানী ঢাকার ঐতিহ্যবাহী দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান জামিয়া আরাবিয়া ইমদাদুল উলুম ফরিদাবাদে ভর্তি হন। সেখানে সানাবিয়া উলইয়া স্তর থেকে সর্বোচ্চ শ্রেণি দাওরায়ে হাদিস (তাকমিল) শ্রেণি পর্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে লেখাপড়া করেন। তিনি শিক্ষা জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি প্রায় সব শ্রেণিতে রেকর্ড সংখ্যক নম্বর পাওয়ার গৌরব অর্জন করেন।

১৪০৪-০৫ হিজরি মোতাবেক ১৯৮৪-৮৫ খ্রিস্টাব্দে তিনি বিশ্ববিখ্যাত ইসলামি বিদ্যাপীঠ দারুল উলুম দেওবন্দ গমন করেন। সেখানে পুনরায় দাওরায় হাদিসে ভর্তি হন এবং মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী (রহ.)-এর কাছে সহিহ বোখারি প্রথম ভাগ ও সুনানে তিরমিজি প্রথম ভাগ পড়ার সৌভাগ্য অর্জন করেন। মুফতি আবু সাঈদ হজরত মুফতি সাঈদ আহমাদ পালনপুরী (রহ.)-এর চিন্তা-দর্শন ও জীবনাদর্শ দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত।

দারুল উলুম দেওবন্দের বার্ষিক পরীক্ষায় তিনি প্রথম স্থান অর্জন করে প্রগাঢ় ধীশক্তি ও তীক্ষè মেধার স্বাক্ষর রাখেন। দাওরায়ে হাদিস পাসের পর রমজান মাসে তিনি দেওবন্দের প্রধান মুফতি হজরত হাবিবুর রহমান খায়রাবাদীর কাছে ফাতোয়া ও ফারায়েজের ওপর বিশেষ প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। হজরত খায়রাবাদী তার অসাধারণ প্রতিভায় মুগ্ধ হয়ে বিশেষ সনদ দেন এবং দেশে ফিরে ফাতোয়া ও ফারায়েজের কাজ করার অনুমতি প্রদান করেন।

দেওবন্দে থাকাকালেই ফরিদাবাদ মাদ্রাসা কর্র্তৃপক্ষ তাকে উচ্চস্তরের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেন। শিক্ষকতার সূচনালগ্নেই তিনি ফরিদাবাদ মাদ্রাসার প্রধান মুফতির পদ অলংকৃত করেন। নিরবচ্ছিন্ন অধ্যয়ন, নিরন্তর অধ্যবসায় ও নিরলস প্রচেষ্টার মাধ্যমে তিনি হাদিস, তাফসির, ফিকহ, মানতিক ইত্যাদি বিভিন্ন শাস্ত্রে অগাধ পাণ্ডিত্য অর্জন করেন। ধীরে ধীরে তিনি জাতীয় অঙ্গনে ফিকহ ও ফাতোয়ার জগতের উজ্জ্বল জ্যোতিষ্করূপে আবির্ভূত হন। প্রচুর অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে অধ্যয়ন করে পাঠদান করেন বিধায় মেধাবী-অমেধাবী সর্বশ্রেণির শিক্ষার্থী তার ক্লাস পছন্দ করেন। তার জ্ঞানরাজ্য থেকে কেউই বঞ্চিত হন না।

জন্মগতভাবেই তিনি অলি-আউলিয়ার বংশধর। তার ধমনিতে বরেণ্য পীর-মাশায়েখের শোনিতধারা প্রবাহিত। তাসাউফ-আধ্যাত্মিকতা তার পারিবারিক উত্তরাধিকার। তাই হৃদয়ের টানে তিনি দেশি-বিদেশি অগণিত পীর মাশায়েখ ও বুজুর্গ অলি-আউলিয়াদের সান্নিধ্য ও সাহচর্য অর্জন করেন। তাদের মধ্যে হাকিমুল উম্মত হজরত মাওলানা আশরাফ আলী (রহ.)-এর খলিফা ভারতের মাওলানা মসিহুল্লাহ খান (রহ.), শায়খুল হাদিস হজরত যাকারিয়া কান্ধলভী (রহ.)-এর খলিফা শায়খুল হাদিস মাওলানা ইউনুস (রহ.) ও চট্টগ্রামের বিখ্যাত বুজুর্গ হজরত মাওলানা সুলতান আহমাদ নানুপুরী (রহ.)-এর নাম বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।

তিনি নানুপুরী হুজুর (রহ.)-এর বয়সে সর্বকনিষ্ঠ কিন্তু মর্যাদায় সর্বোচ্চ খলিফা। বর্তমানে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার অগণিত অসংখ্য মুরিদ রয়েছে। যাদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক হলেন- উলামায়ে কেরাম।

মুফতি আবু সাঈদ আক্ষরিক অর্থেই আপাদমস্তক সুন্নতে নববির অনুসারী। উত্তম চরিত্র, উন্নত নীতি-নৈতিকতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আচার-আচরণে, কথাবার্তায়, চলনে-বলনে কেউ কখনো তার দ্বারা কষ্ট পায়নি। তিনি কখনো কারও কোনো সমালোচনা, নিন্দা, পরচর্চা, গিবত করেন না এবং তিনি পরনিন্দাকে প্রশ্রয় দেন না। তার জীবনটা খোলা বইয়ের মতো, সবার সামনে উন্মুক্ত। শুভ্র নির্মল পুণ্যময়। তাতে কৃত্রিমতা লৌকিকতার জঞ্জাল নেই। তার মতো নির্মোহ, নির্লোভ, নিরহংকার আরেকজন আছেন কি না আমাদের জানা নেই। ছোট-বড় সবাইকে আগে আগে সালাম দেওয়া অনন্য বৈশিষ্ট্য তার।

ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে তার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ তত্ত্বাবধানে অর্ধশতাধিক দীনি মাদ্রাসা পরিচালিত হচ্ছে। তার পীর ও মুর্শিদ হজরত নানুপুরী (রহ.) তাকে নিজ এলাকায় মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠার নির্দেশ দেন। হজরতের নির্দেশক্রমে তিনি নিজ গ্রাম ফুলছোঁয়ায় পিতার দেওয়া ৩০ শতাংশ জায়গার ওপর ২০ শাওয়াল ১৪১৫ হিজরি মোতাবেক ২২ মার্চ ১৯৯৫ খ্রিস্টাব্দ বুধবার উজানীর পীর হজরত মাওলানা মোবারক করীম (রহ.) ও ফরিদাবাদ মাদ্রাসার সাবেক শায়খুল হাদিস আল্লামা আবদুল হাফীজ (রহ.)-সহ দেশবরেণ্য উলামা-মাশায়েখদের হাতে অনাড়ম্বর রুহানি পরিবেশে খালেস তাকওয়া, ইখলাস ও তাওয়াক্কুলের ওপর জামিয়া কুরআনিয়া ইমদাদুল উলুম ফুলছোঁয়া নামে মাদ্রাসার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। 

মাত্র দুই যুগের ব্যবধানে বর্তমানে মাদ্রাসার জায়গা বিস্তৃত হয়েছে চার একরে। মাদ্রাসাটি ফিকহ ও ফতোয়া বিভাগ, আরবি আদব ও ভাষা শিক্ষা বিভাগ ইত্যাদি বিশেষায়িত বিভাগসহ কওমি মাদ্রাসার কারিকুলামের সর্বোচ্চ শ্রেণি দাওরায়ে হাদিস পর্যন্ত উন্নীত হয়েছে। জায়গার সুপ্রশস্ততা, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষার্থীদের আমল-আখলাকের উৎকর্ষতা অর্জনের মাধ্যমে মাদ্রাসাটি দেশের প্রথম সারির মাদ্রাসা ও অন্যতম প্রধান দীনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিগণিত।

এই মাদ্রাসা ছাড়াও ইসলামি জ্ঞান-বিজ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় গবেষণা ও সুদক্ষ লোক তৈরির লক্ষ্যে তিনি ঢাকার শ্যামপুরে (রসুলবাগ) সুবিস্তৃত জমিতে গড়ে তুলেছেন দারুল ফিকরি ওয়াল ইরশাদ। এছাড়া আরও অনেক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা ও প্রতিষ্ঠার সঙ্গে তিনি জড়িত।

মুফতি আবু সাঈদ ওয়াজ-নসিহত, বক্তৃতা-বক্তব্যের মাধ্যমে মুসলমানদের নৈতিকতাসম্পন্ন খাঁটি দীনদার সুনাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সতত প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। পাশাপাশি একাধিক মাদ্রাসায় সহিহ বোখারি শরিফের দরস দিয়ে ছাত্রদের ইলমে নববির জ্ঞানপিপাসা নিবারণে নিমগ্ন রয়েছেন। প্রচলিত সব ধরনের রাজনীতির সংশ্রব থেকে তিনি নিজেকে গুটিয়ে রেখেছেন। তবে ইসলামবিরোধী অথবা দেশ ও জাতিবিরোধী যেকোনো ষড়যন্ত্র চক্রান্ত ও অপতৎপরতার বিরুদ্ধে তিনি ওয়াজ-নসিহত ও বক্তৃতা-বিবৃতির মাধ্যমে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় তীব্র প্রতিবাদ করে থাকেন। তিনি মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন, বিপুল সংখ্যক মুসলমান শরিয়াভিত্তিক জীবনযাপনে অভ্যস্ত না হলে ইসলামি শাসনব্যবস্থা কায়েম সম্ভব নয়।

প্রতি বছর ফুলছোঁয়া মাদ্রাসার বিস্তৃত ময়দানে মুফতি আবু সাঈদের তত্ত্বাবধানে দুই দিনব্যাপী মাহফিল অনুষ্ঠিত হয়। দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ইশকে ইলাহির অদম্য উচ্ছ্বাসে তীব্র আকর্ষণে ফুলছোঁয়ার ফুলেল সৌরভে বিমোহিত হয়ে ছুটে আসেন ভক্ত-মুরিদানরা। শরিয়ত ও তরিকতের সমন্বিত সাধনায় নিজেদের জীবনকে গড়ে তোলেন ফুলের মতো। দেশের অন্য সব মাহফিলের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধাঁচের বাস্তবিক অর্থেই ব্যতিক্রম এই মাহফিল। দেশে অনুষ্ঠিত অসংখ্য মাহফিলের দশভাগও যদি ফুলছোঁয়ার মাহফিলের আদলে হতো তাহলে সাধারণ মুসলমান বিদআত, কুসংস্কারমুক্ত হয়ে সঠিক আকিদা-বিশ্বাস ও সুন্নত মোতাবেক জীবন গঠনের দিশা পেয়ে যেত।

জরুরি ইমান ও আকাইদ বিষয়ক অনিবার্য বিষয়গুলো আলোচনা করা হয় গুরুত্বের সঙ্গে। কুফর, শিরক, বিদআত ও কুসংস্কার প্রসঙ্গে প্রামাণিক বক্তব্যের মাধ্যমে ইমান সংরক্ষণের দিকনির্দেশনা দেওয়া হয় পরম দরদে। অজু, গোসল, নামাজ, পানাহার, মলমূত্র ত্যাগ ও নিদ্রা গমনসহ দৈনন্দিন জীবনের সবকিছু সুন্নতে নববির আলোকে সম্পাদনের নিয়মনীতি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় হাতেকলমে। ইখলাস, তাকওয়া, তাওয়াক্কুল সম্পর্কে আবেগঘন ওয়াজ করেন বুজুর্গ আলেমরা। মোটকথা, শরিয়ত ও তরিকতের সমন্বিত চর্চা ও সাধনার এমন ব্যতিক্রম মাহফিল সত্যিই বিরল।

দরস-তাদরিস, ইরশাদন্ডতালকিন ও ওয়াজ-নসিহতের পাশাপাশি দীনি বিষয়ক তার অনেক নিবন্ধ-প্রবন্ধ ও বই প্রকাশিত হয়েছে। তার অধিকাংশ নিবন্ধ মাওলানা মুহিউদ্দীন খান সম্পাদিত মাসিক মদীনায় প্রকাশিত হয়েছে। তার রচিত ও সম্পাদিত বইয়ের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো- সমকালীন জরুরি মাসয়িল, আধুনিক সমস্যার সমাধান, মৌলিক আকিদা, পাঁচ ওয়াক্তের হাদিয়া, মহিলারা কোথায় নামাজ আদায় করবেন, ইসলামের দৃষ্টিতে রোগী ডাক্তার ও চিকিৎসা ব্যবস্থাপনা ইত্যাদি। ইতিমধ্যে তার বয়ানের সংকলন ‘দীনি মাওয়ায়েজ’ নামে প্রকাশিত হয়েছে। আমরা মহান আল্লাহর কাছে মাওলানা মুফতি আবু সাঈদের দীর্ঘ নেক হায়াত প্রার্থনা করি। মহান আল্লাহ কবুল করুন। আমিন।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত