রাজনীতির পথপরিক্রমা

আপডেট : ০৬ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:৩৯ এএম

মানুষ সামাজিক জীব, সেই সঙ্গে রাজনৈতিকও বটে। সে সক্রিয়ভাবে রাজনীতি করুক, বা না করুক, রাজনীতি তাকে নানাভাবে স্পর্শ করে। প্রাচীন এথেন্সের স্বর্ণযুগের রাষ্ট্রনায়ক পেরিক্লিস যথার্থই বলেছিলেন, “Just because you do not take an interest in politics does not mean politics would not take an interest in you..” রাষ্ট্রের জননিরাপত্তা ও উন্নয়নমূলক কর্মকাণ্ড এ প্রক্রিয়ার সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। রাজনীতি এ দুটো কাজকেই নির্ধারণ ও নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

ভারতবর্ষ ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে যে স্বাধীনতার জন্য সংগ্রাম করেছিল, তার পেছনে স্বরাজের চেয়ে অর্থনৈতিক মুক্তিলাভের আকাক্সক্ষাও কম কিছু ছিল না। এজন্য স্বাধীনতা লাভের পর পরই পরিকল্পিত পদ্ধতিতে নাগরিকদের জীবনমানের উন্নয়নে ভারত ও পাকিস্তান উভয় দেশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা গ্রহণ করে। পাকিস্তানের বেলায় এই কৌশল আর্থ-সামাজিক স্তরবিন্যাসে আয় ও সম্পদের মালিকানায় ব্যাপক ফারাক সৃষ্টি করে; মাত্র দু’দশকের মধ্যে ২২টি পরিবার দেশের দুই- তৃতীয়াংশ শিল্প এবং তিন চতুর্থাংশ ব্যাংকিং ব্যবসার দখলদারিত্ব নিয়ে নিতে সক্ষম হয়। চিনিয়োটি, মেমন, বোহরা, খোঁজা প্রভৃতি ব্যবসায়ী সম্প্রদায় রাজনীতিতে ক্রমবর্ধমান হারে প্রভাব বিস্তার করতে থাকে।

স্বাধীনতার অর্ধ শতাব্দীর মধ্যে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক ক্ষেত্রে অসামান্য অগ্রগতি অর্জিত হয়। কিন্তু এই সাফল্যের পর এখন দেখা যাচ্ছে- যে বৈষম্যের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে দেশ স্বাধীনতা লাভ করেছে, উন্নয়নের এই পরিক্রমায় আজ দেশ নিজেই যেন সেই বৈষম্যের জাঁতাকলে পিষ্ট হচ্ছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো পরিচালিত ২০২২ সালের খানা আয়-ব্যয় জরিপে দেখা যায়, আয়ের ক্ষেত্রে গিনি সহগের মান এখন হয়ে পড়েছে ০.৪৯৯। এর আগে ২০১৬ ও ২০১০ সালে এই সহগের মান ছিল যথাক্রমে ০.৪৮২ ও ০.৪৫৮। বৈষম্য পরিমাপের জন্য প্রণীত ০ (শূন্য) থেকে ১ পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত এই স্কেলে আয় ও সম্পদের মালিকানার ক্ষেত্রে শূন্য হলো পরম সমতা এবং ১ চরম অসমতা নির্দেশ করে। বৈষম্য পরিমাপের জন্য পাল্মা অনুপাতটা আরও সহজবোধ্য; সেখানে সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটা অংশের সঙ্গে সবচেয়ে ধনীদের একটা অংশের আয় ও সম্পদের তুলনা করা হয়। একটা পাল্মা অনুপাতে দেশের সবচেয়ে ধনী ১০ শতাংশের আয়ের সঙ্গে সবচেয়ে গরিব ৪০ শতাংশের আয়ের তুলনা করা হয়েছে। তাতে দেখা গেছে যে, এই অনুপাত ২০১৬ যেখানে ছিল ২.৯, ২০২২ সালে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.২। এর অর্থ হলো ২০১৬ সাল থেকে ২০২২ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ ১০ শতাংশ ধনী মানুষের আয় সবচেয়ে গরিব ৪০ শতাংশ মানুষের আয়ের চেয়ে ৩.২ গুণ বেড়ে গেছে। এই ১০ শতাংশ সর্বোচ্চ ধনী মানুষের হাতে এখন দেশের ৪১ শতাংশ আয় কুক্ষিগত, ২০১৬ সালে যেটা ছিল ৩৮ শতাংশ (The Financial Express,November, 2023)। দেখা যাচ্ছে যে, দেশে বৈষম্যের বলগা হরিণ দ্রুতবেগে ধাবমান। প্রদর্শিত গিনি সহগের উল্লিখিত বছরগুলোতে দেশে জিডিপির প্রবৃদ্ধি হয়েছে যথাক্রমে ৭.১০, ৭.১১ ও ৫.৫৭ শতাংশ হারে (macrotrends)। এ চিত্র থেকে অনেকেই অনুমান করতে পারেন যে, উচ্চ প্রবৃদ্ধিই সম্ভবত বৈষম্যকে ক্রমবর্ধমান হারে উসকে দিচ্ছে। তবে এটা শুধু উন্নয়নের মডেলের ত্রুটি নয়, এর পেছনে আরও গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে।

আগে রাজনীতিতে ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের প্রভাবকের ভূমিকা সীমাবদ্ধ ছিল মূলত রাজনীতিতে তহবিল সরবরাহের মধ্যে। কিন্তু এখন তারা রাজনীতির মাঠে প্রত্যক্ষ খেলোয়াড় হয়ে উঠেছেন। পাকিস্তান আমলে ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে জয়ী আইন প্রণেতাদের মধ্যে ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের হার ছিল ৪ শতাংশ। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর, এর ২০ বছর পর এ শ্রেণির অংশীদারত্ব হয় ১৩ শতাংশ। ১৯৭৯ সালে নির্বাচিতদের মধ্যে ব্যবসায়ী ছিলেন ৩৪ শতাংশ, আর ১৯৯৬ সালের সংসদে এই গোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্ব করতেন ৪৮ শতাংশ এমপি (প্রথম আলো ১৩ অক্টবর, ২০১৫)। আর ২০০১ ও ২০০৯ সালে এই সম্প্রদায় থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্যের হার দাঁড়ায় যথাক্রমে ৫২.১০ ও ৬৩ শতাংশ ((The Daily Star, 14 October, 2015)। চলতি সংসদে ব্যবসায়ী এমপির হার ৬১ শতাংশ বলা হলেও অনুমিত হয় যে, আসল হার অনেক বেশি; কারণ, ব্যবসায়ীরা ক্রমবর্ধমান হারে যেমন রাজনীতিতে আসছেন, তেমনি অধিকাংশ রাজনীতিবিদ সংসদে এসে ব্যবসায়ী বনে যাচ্ছেন। বিপরীতে ভারতে লোকসভায় নির্বাচিতদের মধ্যে ব্যবসায়ী মাত্র ২০ শতাংশের মতো। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে ব্যবসায়ীদের সংখ্যা কখনো ২৫ শতাংশ অতিক্রম করেনি। মার্কিন কংগ্রেসে তাদের প্রতিনিধিত্ব ৪০ শতাংশের নিচে (প্রথম আলো, ১৩ আগস্ট, ২০১৫)।

দেশের রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের ভিড় বেড়ে যাওয়ায় প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ একটা অনুষ্ঠানে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, ‘রাজনীতি এখন ব্যবসায়ীদের পকেটে চলে গেছে। যেভাবেই হোক, এ অবস্থা থেকে দেশকে মুক্ত করতে হবে।’ ভিড় বেড়ে যাওয়ার কারণ সংসদ সদস্যদের জন্য প্রযোজ্য এন্তার আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধা। তাছাড়া, অন্যদের জন্য কঠিন হলেও এদেশে সংসদ সদস্যদের ব্যবসা করা অত্যন্ত সহজ। আগে শুধু শেয়ার বাজারে সিন্ডিকেটের খেলোয়াড়দের কারসাজি চলত।এখন এই খেলোয়াড়দের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় সিন্ডিকেটের অনুপ্রবেশ ঘটেছে দেশের ভোগ্যপণ্যের বিপণনব্যবস্থার মধ্যে। কিছু দিন পর পর একেকটা ভোগ্যপণ্যের ওপর তাদের আছর পড়ছে; আর মূল্যস্ফীতিতে সাধারণ মানুষের পকেট কাটা পড়ছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বিশ্বব্যাপী যেখানে আমানত ও ঋণের সুদহার বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল, সেখানে এদেশে এই হারে আনা হয়েছিল নয়-ছয়। এখানে একদিকে প্যাকেজে প্যাকেজে চলেছিল সুলভে ঋণ বিতরণ, অন্যদিকে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়তে দেওয়া হয়েছিল অকার্যকর ঋণের পাহাড়। এখানে সহজে ও সস্তায় চলছে পুনঃতফসিলিকরণ, চলছে হুন্ডিতে মুদ্রাপাচার, আন্ডার ইনভয়েসিং ও ওভার ইনভয়েসিং। কেউ আবার রপ্তানির অর্থ দেশেই আনেন না। দেশে রাজস্বের ৬৬ শতাংশ আসে পরোক্ষ কর থেকে, যেটা আসলে দেয় নিম্ন আয়ের মানুষ। কিন্তু এসবের কোনো প্রতিকার দৃশ্যমান হচ্ছে না। উল্টো অনেক মন্ত্রী সিন্ডিকেটের পক্ষে অবস্থান নিচ্ছেন। আগে সব সরকার নিজদের জনবান্ধব হিসেবে আখ্যায়িত হতে পছন্দ করত, কিন্তু এখন তারা নিজেরাই প্রচার করছেন যে, তারা ব্যবসায়ীবান্ধব। ‘রাজা বেপারী তো, প্রজা ভিখারী’ প্রবচনটি তাদের কাছে আর কোনো অর্থ বহন করে না। রাজনীতির এই গুণগত পরিবর্তনই বর্তমান সংকট ও বৈষম্য বৃদ্ধির অন্যতম প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।

এবার দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের এমপি পদে মনোনয়ন প্রত্যাশী ছিলেন ৩,৩৬২ জন। এত বিপুল সংখ্যক মানুষের মনোনয়ন প্রত্যাশা কীসের ইঙ্গিত দেয়? এক্ষেত্রে ক্ষমতা, মর্যাদা, স্বীকৃতি, দায়মুক্তি ও প্রাপ্তিযোগের প্রেরণা বেশি, নাকি জনসেবার তাগিদ, সেটা বোঝার জন্য বোধ করি কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই। মজার বিষয় হলো এই মনোনয়ন প্রত্যাশায় শুধু দলীয় কর্মী ছিলেন না; ছিলেন অগণিত অবসরপ্রাপ্ত বেসামরিক ও সামরিক কর্মকর্তা, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, খেলোয়াড়, ডাক্তার, অভিনেতাসহ নানা পেশার মানুষ। এদের অধিকাংশই হঠাৎ এই দলটির চেতনায় উদ্বুদ্ধ। এদের সম্পর্কে স্যার উইনস্টন চার্চিলের একটা মন্তব্য বেশ খাটে। মন্তব্যটি তিনি করেছিলেন লিবারেল পার্টিতে যোগদানের ঠিক আগে তার সহকর্মী কনজারভেটিভদের সম্পর্কে। মন্তব্যটি ছিল “ÒThey are a class of right honourable gentlemen, all good men, all honest men - who are ready to make great sacrifices for their opinions, but they have no opinions. They are ready to die for the truth, if only they knew what the truth was.” কাজেই এই হঠাৎ উদ্বুদ্ধরা কী রকম কাজে লাগবে, সেটা বোঝার ক্ষমতা অনেক পুরনো এই দলটির অবশ্যই থাকার কথা। এই হঠাৎদের ভিড়ে অনেক নিবেদিতপ্রাণ দলীয় কর্মী অবহেলিত ও পরিত্যক্ত হয়ে পড়েন; তাদের মধ্যে জন্ম নেয় ক্ষোভ ও হতাশা। তবে রাজনীতিতে উড়ে এসে জুড়ে বসার সংস্কৃতি রাজনৈতিক দলগুলোর দেউলিয়াপনারই বহিঃপ্রকাশ ঘটায়।

বর্তমানে দেশের অর্থনীতিতে যে বৈষম্য ও সংকট লক্ষ করা যাচ্ছে, তার মূলে রয়েছে আর্থিক খাতে সুশাসনের অভাব। আর এই সুশাসনের অভাব দূর না করতে পারার অন্যতম প্রধান কারণ রাজনীতিতে ব্যবসায়ীদের বেসামাল প্রভাব। এজন্য প্রয়োজন রাজনীতি ও অর্থনীতির মধ্যে পৃথকীকরণ, যেটার অর্থ প্রাক্তন রাষ্ট্রপতির ভাষায় রাজনীতিকে ব্যবসায়ীদের খপ্পর থেকে মুক্ত করা। এখন আমাদের দরকার রাজনীতিতে সংস্কার। কিন্তু আমরা হাঁটছি উল্টোপথে। এ প্রসঙ্গে স্যার উইনস্টন চার্চিলকে আবারও স্মরণ করছি। রাজনীতিতে সংস্কার সম্পর্কে তার বক্তব্য হলো “It would be a great reform in politics if wisdom could be made to spread as easily and as rapidly as folly.” গণতান্ত্রিক-ব্যবস্থায় সাধারণ মানুষ নেতা বা ইশতেহার নির্বাচনে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করে না; তাদের সামনে যেসব বিকল্প উপস্থাপিত হয়, সেগুলোর মধ্য থেকেই একটাকে নির্বাচন করতে হয়। কাজেই রাজনৈতিক সংস্কারের পক্ষে যত দ্রুত শুভবুদ্ধির উদয় হবে, তত তাড়াতাড়ি দেশ ও মানুষের কল্যাণ হবে। সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী এবং দু-দু’বারের ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর কথার তাৎপর্য এটাই।

লেখক : খাদ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক ও কলামিস্ট

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত