ফুটবল প্রতিভার খোঁজে অ্যাকাডেমি চ্যাম্পিয়নশিপ

আপডেট : ০৮ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৩:০০ এএম

এ দেশের জনসংখ্যা জেনে ফুটবল বিশ্বের অনেকেই বিস্মিত হন। ১৮ কোটি মানুষের দেশে কেন বিশ্বমানের ১১জন ফুটবলার পাওয়া যাবে না? কেনই বা বিশ্ব র‌্যাংকিংয়ে এ দেশের অবস্থান তলানিতে? বিশ্বকাপ থেকে কেন এই দেশটির অবস্থান শত-সহস্র আলোকবর্ষ দূরে? খেলার এত জনপ্রিয়তা সত্ত্বেও কেন বাংলাদেশ হাবুডুবু খায় আন্তর্জাতিক অঙ্গনে?

ফুটবল তো রকেট সায়েন্স নয়। তাই কারণটা কমবেশি সবার জানা। এত এত মানুষ, ফুটবল নিয়ে আকাশছোঁয়া উন্মাদনার দেশে ফুটবলটা যে নেই কক্ষপথে। গেল দুই দশকে রাজধানীকেন্দ্রিক হয়ে পড়েছে ফুটবল। গ্রামে-গঞ্জে চর্চা একেবারেই কমে গেছে। কাজী সালাউদ্দিনের জমানায় জেলার লিগগুলো জাদুঘরে ওঠার জোগাড়। গ্রামে-গঞ্জে খেলা নেই, যার প্রভাবে দেশের ফুটবলের সবচেয়ে বড় ব্যামো প্রতিভাবান খেলোয়াড় সংকট। সেটা কাটাতে বাফুফে প্রধানকে সেভাবে আন্তরিক হতে দেখা যায়নি কোনো কালেই। চতুর্থ মেয়াদে সভাপতির আসনে বসেই জেলার ফুটবল জাগানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন সালাউদ্দিন। সেটা মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ থেকেছে। সালাউদ্দিনের উদাসীনতার মধ্যেই ব্যতিক্রমী এক উদ্যোগ নিয়ে হাজির হয়েছেন বাফুফের সহ-সভাপতি ও ডেভেলপমেন্ট কমিটির চেয়ারম্যান আতাউর রহমান ভুঁইয়া মানিক। তৃণমূল থেকে প্রতিভার খোঁজে তিনি আয়োজন করতে যাচ্ছেন বাফুফে অ্যাকাডেমি চ্যাম্পিয়নশিপ। দেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ফুটবল অ্যাকাডেমিগুলো নিয়ে হবে এই আসর। যেখান থেকে প্রতিভা ছেঁকে নিয়ে এলিট অ্যাকাডেমিতে লালন-পালন করে ভবিষ্যতের জন্য গড়ে তোলা হবে।

এই উদ্যোগে ফিফা দিচ্ছে অর্থের জোগান। প্রায় এক লাখ ডলার মিলেছে উদ্যোগ বাস্তবায়নে। ২০২০ সালে বাফুফের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হওয়ার পর মানিককে দেওয়া হয় ডেভেলপমেন্ট কমিটি। দায়িত্ব পেয়েই বাফুফে ভবনের সামনে নিজ অর্থায়নে গড়ে তোলেন শেখ জামাল জিমনেশিয়াম। এরপর কমলাপুরে তার প্রচেষ্টায় গেল তিন বছর ধরে চলছে এলিট অ্যাকাডেমির কর্মকা-। এতদিন সেই অ্যাকাডেমিতে বিকেএসপি ও কয়েকটি বেসরকারি অ্যাকাডেমির ছাত্রদের এনে পরিচর্যা করা হয়েছে। বছরব্যাপী প্রশিক্ষণে অ্যাকাডেমির ছাত্রদের উন্নতির প্রমাণ বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগে দল হিসেবে ওপরের দিকে থাকা। কিছুদিন আগেই এই ফুটবলারদের নিলামের মাধ্যমে প্রিমিয়ার লিগের ক্লাবগুলোর কাছে বিক্রি করার অভিনব উদ্যোগ নেন মানিক। পাশাপাশি ঢাকায় অর্থের বিনিময়ে শুরু করে ফুটবল স্কুলের কর্মকা-। শুরুতে এ নিয়ে সমালোচনা হলেও, দিন যত গড়িয়েছে, মানিকের এই উদ্যোগ ব্যাপক সাড়া ফেলেছে অভিভাবকদের মধ্যে। ফুটবল উন্নয়নে এমন সব উদ্যোগ ব্যাপকভাবে প্রশংসিত হওয়ার পর এবার তিনি চোখ রাখছেন ঢাকার বাইরে। ২০২১ সালে তার উদ্যোগে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রায় দুইশ ফুটবল অ্যাকাডেমিকে অধিভুক্ত করে বাফুফে। এবার সেই অ্যাকাডেমিগুলো থেকে ১৭০টি দল নিয়ে আয়োজন করতে যাচ্ছেন চ্যাম্পিয়নশিপ। সারা দেশের ৪৮টি জেলা ২৪টি জোনে বিভক্ত হয়ে অংশ নেবে রাউন্ড রবিন লিগভিত্তিক প্রথম রাউন্ডে। ২৪টি জোনের সেরা ২৪ দল চলে যাবে দ্বিতীয় রাউন্ডে। সেখানে হবে প্লে-অফ। নকআউটের বিজয়ী ১২ দল নিয়ে হবে চূড়ান্তপর্ব। ১৯ থেকে ৩১ ডিসেম্বর হবে প্রথম রাউন্ড। এই আসরে অংশ নেওয়া ১৭০টি অ্যাকাডেমির প্রতিটিকে অংশগ্রহণ বাবদ দেওয়া হবে ১০ হাজার টাকা করে। এছাড়া চূড়ান্তপর্বে যে ১২টি দল খেলবে তারা পাবে ৫০ হাজার টাকা করে। এই আয়োজনের বাইলজে দারুণ একটা নিয়ম যুক্ত করার কথা জানালেন মানিক। প্রতি জোন থেকে যে অ্যাকাডেমিগুলো বিদায় নেবে সেই অ্যাকাডেমির সেরা খেলোয়াড়দের চাইলে জোনসেরা দল পরের রাউন্ডের জন্য দলভুক্ত করতে পারবে। মানিক বলেন, ‘আমাদের প্রতিটি জোনে একজন করে কোচ থাকবেন, যারা প্রতিভাবান ফুটবলার খুঁজে বের করে তালিকা করবেন। জোনের খেলা শেষে সেরা খেলোয়াড়দের জোন চ্যাম্পিয়ন দলে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হবে। যাতে করে সেরারাই পরের ধাপগুলোতে খেলার সুযোগ পায়। এমন করে ফাইনালে যে দু’দল খেলবে সেখানে যাতে আসরের সেরারা খেলে সেটা নিশ্চিত করতে চাই।’ মানিক আরও জানান, ‘এই আসরের পরিকল্পনা ফিফা অনুমোদন দিয়েছে এবং এর জন্য তারা বিশেষ বরাদ্দ দিয়েছে। এটা ফিফার ট্যালেন্ট হান্ট স্কিমের অধীনে আমরা প্রতি বছর করব। আমার বিশ্বাস এটা প্রতি বছর হলে ফুটবলার সংকট অনেকটা কেটে যাবে।’ আপাতত অনূর্ধ্ব-১৫ বয়সীদের নিয়ে হবে দেশব্যাপী এই টুর্নামেন্ট। তবে মানিক চান বয়সটা ধীরে ধীরে কমিয়ে ৮-১০-এ নিয়ে আসতে।

এটাকে প্রথাগত টুর্নামেন্ট না বলে বলা যেতে পারে প্রতিভা অন্বেষণের একটা ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এতে করে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা অ্যাকাডেমিগুলোর মধ্যে ভালো কাজের স্পৃহা বাড়াবে। ভবিষ্যতে তারাও চাইবে ভালোমানের ফুটবলার গড়ে তুলতে। পাশাপাশি এই টুর্নামেন্টের মধ্য দিয়ে সারা দেশে ফুটবলটাও খানিকটা গা ঝাড়া দিয়ে উঠবে, বিশ্বাস বাফুফের।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত