প্রার্থী ডামি দুঃখগুলো ডামি নয়

আপডেট : ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ০২:৩১ এএম

প্রতিটি জাতীয় সংসদ একটি নতুন প্রবণতা, অভিজ্ঞতা ও শিক্ষা নিয়ে আসে। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচন থেকে ২০১৮ সালের একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রতিটিই বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য নিয়ে এসেছে। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনও এর বাইরে থাকতে পারছে না।

এবারের বহুল আলোচিত বিষয় হচ্ছে, ডামি বা বিকল্প প্রার্থী। সাধারণভাবে ধারণা এই যে কোনো কারণে মূল প্রার্থী নিজে নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে না পারলে তিনি এমন কাউকে নির্বাচনে প্রার্থী করেন, যাতে সে নির্বাচিত হলেও ক্ষমতা তার নিজের হাতেই থাকে। কিন্তু এবার তেমন হচ্ছে না। প্রধান বিরোধী দলসহ অনেক দল অংশ না নেওয়ায় ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনে সারা দেশের ৩০০ আসনের মধ্যে ১৫৩টি আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জয় লাভ করেছিল ক্ষমতাসীন দল। যা নিয়ে দেশে-বিদেশে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল এবং এখনো বিতর্ক চলছে। এ ধরনের নির্বাচন নয়, আগামী নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ করার তাগিদ দিয়ে আসছে ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ পশ্চিমা অনেক দেশ। কিন্তু দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নয়, নিরপেক্ষ সরকারের দাবিতে আন্দোলন করতে থাকা দলগুলো এবারের নির্বাচনে অংশ না নেওয়ায় অংশগ্রহণমূলক এবং প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোট দেখানোটা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দলের শীর্ষপর্যায় থেকে বলা হয়েছে, বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হলে খবর আছে। প্রয়োজন হলে ডামি প্রার্থী রাখতেও বলা হয়েছে। ফলে হাওয়াটাই পাল্টে গেল।

আগে দলের মনোনীত প্রার্থীর বাইরে কেউ প্রতিদ্বন্দ্বী হলে ব্যবস্থা নেওয়া হতো। কিন্তু এবার স্বতন্ত্র প্রার্থিতার বিষয়টি উম্মুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিজয়ী হলেও তারা মূলত আওয়ামী লীগের ঘরের লোক হিসেবেই থাকছেন। ফলে নির্বাচন হবে আমি আর ডামির মধ্যে। যেই জিতুক না কেন তারা তো একই দলের। এ নিয়ে সমালোচনা হওয়ায় আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর এক সদস্য একটি ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, স্বতন্ত্র প্রার্থী আর ডামি প্রার্থী এক নন। তিনি বলেছেন, ‘ডামি প্রার্থী ও স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থী এক নয়। প্রধানমন্ত্রী যে ডামি প্রার্থী রাখতে বলেছেন সেটা সব জায়গায় নয়। যেসব আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ছাড়া অন্য কেউ মনোনয়ন জমা নাও দিতে পারেন, এমনটি মনে হলে সংশ্লিষ্ট আসনের নৌকার প্রার্থী নিজ দলে কাউকে প্রার্থী মনোনীত করবেন। এমনটাই বোঝানো হয়েছে।’

এতে ব্যাপারটা আরও খোলাসা হলো। তবে ডামি প্রার্থী একটি দলের ভেতর থেকেও যেমন হতে পারে, তেমনি তাদের সহযোগী দলের মধ্য থেকেও আসতে পারে বলে মনে করছেন অনেকে। ডামি প্রার্থী করার ভাবনা এসেছে প্রধানত নির্বাচনকে অংশগ্রহণমূলক দেখানোর জন্য। জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের যারা ‘ডামি বা বিকল্প’ প্রার্থী হচ্ছেন তাদের ‘খেলনা বন্দুকের’ সঙ্গে তুলনা করেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী এবারের নির্বাচনে ঘোষণা দিয়েছেন ডামি ক্যান্ডিডেট রাখার জন্য। আসলে ডামি ক্যান্ডিডেট কী সেটা তো আমরা জানি।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমরা ছোটবেলায় কুচকাওয়াজ করেছি। তখন আমাদের একটা বন্দুক থাকত। সে বন্দুকের নলও নেই, গুলিও হয় না। সেটাই হলো ডামি। সেই বন্দুক ফোটেও না। ক্ষতিও করে না। তো নির্বাচনে আমরা এমন একটা ডামি ক্যান্ডিডেট রাখব।’ তিনি আরও বলেন, ‘যাতে করে আন-কনটেস্ট কেউ কোনো জায়গা থেকে নির্বাচিত না হয়। মূলত আমরা কমপিটিশনের মধ্যে দিয়ে একটা চমৎকার অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চাই।’ তার চাওয়া পরিষ্কার কিন্তু পথটা তো পরিচ্ছন্ন নয়।

নির্বাচন যেভাবেই হোক না কেন যারা নির্বাচিত হন এবং যাদের কাছে ভোট পেয়েছেন বলে দাবি করেন তাদের মধ্যে আয়ের পার্থক্য ক্রমাগত বাড়ছে। হলফনামা থেকে তার কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়। হলফনামার বেশ কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ। প্রথমত হলফনামায় যে তথ্য দেওয়া হয় তার সঙ্গে বাস্তবতার মিল কতটুকু? দ্বিতীয়ত যে আয় ও সম্পদের হিসাব দেওয়া হয় তার সঙ্গে আসলে বৈধ আয়ের সামঞ্জস্য থাকে কি না? আর তৃতীয়ত হচ্ছে, নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সময় যে হলফনামা দেন তারপর নির্বাচিত হওয়ার পর পরবর্তী পাঁচ বছরে তার সম্পদের বিকাশ কী পরিমাণ হয়েছে? এবারের নির্বাচনে প্রার্থীদের হলফনামা বিশ্লেষণ করে গণমাধ্যমে যেসব প্রতিবেদন এসেছে তা থেকে দেখা যায়, অনেক প্রার্থীর নিজের নামে সম্পদ দেড়-দুইগুণ বাড়লেও তাদের স্ত্রীদের নামে সম্পদের পরিমাণ ৫০-৬০ গুণ পর্যন্ত বেড়েছে। দুটি উদাহরণ বিবেচনা করে দেখা যাক!

একজন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী ১০ বছর আগে দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় তার কাছে পাঁচ লাখ টাকা রয়েছে বলে উল্লেখ করেন। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের হলফনামায় তিনি উল্লেখ করেছেন, তার কাছে নগদ আছে ১০ কোটি ৯২ লাখ ৯৪ হাজার ১৯৯ টাকা, যা ১০ বছর আগের তুলনায় ২১৮ গুণ বেশি। পাশাপাশি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে জমাকৃত অর্থের পরিমাণও ১০ বছরের ব্যবধানে বেড়েছে ২ কোটি ৫৪ লাখ ৬০ হাজার ৭৮৭ টাকা। নারায়ণগঞ্জের একজন সংসদ সদস্য নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে পেশা হিসেবে উল্লেখ করেন ঠিকাদারি ব্যবসা, এবং বার্ষিক আয় দেখান ৩ লাখ ৫৮ হাজার টাকা এবং স্ত্রীর চিকিৎসা পেশা থেকে বাৎসরিক আয় দেখানো হয় ১ লাখ ৭৪ হাজার টাকা। অস্থাবর সম্পত্তি নগদ ৭ লাখ ৫১ হাজার টাকা। সে সময়কার স্থাবর সম্পত্তি ছিল ৮ দশমিক ৫ শতাংশ অকৃষি জমি, যার মূল্য ধরা হয়েছিল ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। স্ত্রী ও নির্ভরশীলদের কোনো সম্পদ ছিল না। দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে হলফনামায় তার স্ত্রীর নামে সম্পদের পরিমাণ দাঁড়ায় ৩৫৫ শতাংশ অকৃষি জমি, যার বাজার মূল্য ৯৫ লাখ ৬২ হাজার টাকা এবং ৩৯ শতাংশ জমির ওপর একতলা আধাপাকা দালান যার হলফনামায় উল্লেখিত মূল্য ৩৯ লাখ ৩১ হাজার টাকা এবং বাবুর নামে দেখানো হয় ৩৬১ শতাংশ অকৃষি জমি, যার আনুমানিক বাজার মূল্য ২ কোটি ৫ লাখ ৫৫ হাজার টাকা। ২ দশমিক ২ শতাংশ জমির ওপর নির্মিত দালানের মূল্য দেখানো হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার টাকা। এ ছাড়া ঢাকায় রয়েছে ৩২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট যার মূল্য ৮১ লাখ টাকা এবং পূর্বাচল রাজউক নিউ মডেল টাউনে ৪১ লাখ টাকা মূল্যের ১০ কাঠার একটি প্লটসহ ৩ কোটি ২৯ লাখ ১২ হাজার টাকার সম্পত্তি।

একজন সংসদ সদস্য আইন প্রণয়নে ভূমিকা রাখবেন বলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় তার ভাতাসহ নানা সুবিধা প্রদান করা হয়। সেসবের মধ্যে অন্যতম হলো মাসিক বেতন-৫৫,০০০ টাকা, নির্বাচনী এলাকার ভাতা প্রতি মাসে-১২,৫০০, নির্বাচনী এলাকার অফিস খরচ-১৫,০০০, মাসিক পরিবহন ভাতা-৭০,০০০, টেলিফোন ভাতা-৭,৮০০, দেশের অভ্যন্তরে বার্ষিক ভ্রমণ ভাতা-১২০,০০০, সম্মানি ভাতা-৫,০০০, ক্রোকারিজ বাবদ-৬,০০০ এবং প্রতি মাসে লন্ড্রি ভাতা-১,৫০০ টাকা। এ ছাড়াও শুল্কমুক্ত গাড়ি আমদানির সুবিধা, ফ্ল্যাট এবং প্লট পাওয়ার সুবিধা আছে। আইন অনুযায়ী এতসব পাওয়ার পরও অন্যান্য ক্ষমতা দেখানোর সুবিধা তো আছেই।

কিন্তু যে দায়িত্ব পালনের জন্য এত সুবিধা প্রদান করা হয়, সেই দায়িত্ব পালনে কতটুকু আন্তরিক, তা প্রশ্নের উদ্রেক করে। সংসদ চালাতে প্রতি মিনিটে গড়ে ২ লাখ ৭২ হাজার ৩৬৪ টাকা খরচ হয়। একাদশ সংসদে শুধু প্রধানমন্ত্রী ও সরকারের প্রশংসা করতে সময় ব্যয় হয়েছে ৬১ ঘণ্টা ২৬ মিনিট। যার আর্থিক মুল্য দাঁড়ায় ১০০ কোটি ৩৯ লাখ টাকা। আইন প্রণেতারা আইন প্রণয়নের জন্য ব্যয় করেছেন মাত্র ১৬ দশমিক ৭ শতাংশ সময়।

সংসদ চালানোর এই টাকা যারা জোগান দেন বা যারা ভোটারদের বৃহৎ অংশ, সেই কৃষক শ্রমিকের অবস্থাটা কী? সরকার চলতি মৌসুমে ধানের দাম ৩০ টাকা, চালের দাম ৪৪ টাকা এবং আতপ চালের দাম ৪৩ টাকা নির্ধারণ করেছে। কিন্তু কৃষকরা বলছেন, বর্তমানে ধানের উৎপাদন খরচ আগের থেকে অনেক বেড়েছে। চাষের জন্য প্রয়োজনীয় ডিজেল ও সারের দাম থেকে শুরু করে শ্রমিকের মজুরি প্রতিটি ক্ষেত্রেই খরচ বেড়েছে। এমন অবস্থায় উৎপাদন খরচ বেশি আর দাম নির্ধারণ যদি কম হয়, তাহলে কৃষকের কোনো লাভ হবে না। চলতি বছর বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউটের (ব্রি) ধানের উৎপাদন খরচের হিসাব পর্যালোচনা করে দেখিয়েছে, ধান ও চালের উৎপাদন খরচ গত বছরের তুলনায় ১০-১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। বিশেষ করে কেজিপ্রতি ধানের উৎপাদন খরচ বেড়ে হয়েছে ৩০ টাকা এবং চালের ৪১ টাকা। সে হিসাবে প্রতি মণ ধানের দাম দাঁড়ায় ১২০০ টাকা। এত গেল হিসেবের কথা। বাস্তব চিত্র অন্যরকম।

আমন ধান উঠতেই ধান উৎপাদনের প্রধান এলাকা নওগাঁ, দিনাজপুরে প্রতি বস্তা ধানের দাম ১০০-১৫০ টাকা কমেছে। গত সপ্তাহে বি আর-৫১ জাতের ধান ১১২৫ টাকায় বিক্রি হলেও এখন বিক্রি হচ্ছে ১০৫০ টাকা মণ দরে। অন্য জাতের ধানেরও একই রকম দাম। তাহলে লাভ তো দূরের কথা কৃষকের উৎপাদন খরচ কী উঠবে? শ্রমিকদের অবস্থা কেমন তা বুঝতে বেশি দূরে যেতে হয় না। এবারের গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণ থেকে তার আঁচ পাওয়া যায়। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম গার্মেন্টস পণ্য রপ্তানির দেশ অথচ সবচেয়ে কম মজুরি বাংলাদেশে। দ্রব্যমূল্য, বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, পানি, গ্যাস, পরিবহন ব্যয়, চিকিৎসা এবং শিক্ষা কোন খরচটা বাড়ছে না?

শ্রমিকের খরচ কমানোর একটাই পথ খাদ্যসহ অন্যান্য প্রয়োজন কমানো। ফলে পুষ্টিহীন, স্বাস্থ্যহীন, শ্রীহীন শ্রমিক এবং নিম্নমানের শিক্ষা নিয়ে গড়ে ওঠা প্রজন্ম তৈরি হচ্ছে। দেশে এত উন্নয়নের জোয়ার কিন্তু শ্রমিকদের জীবনে তার প্রভাব পড়ছে না। সস্তা শ্রমিকের দেশ হিসেবে বাংলাদেশ দেশি-বিদেশি মালিকদের কাছে লোভনীয় হলেও যুব শক্তি দেশ ছাড়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে আছে। একটা জরিপে দেখা যায়, যেকোনো ধরনের কাজের সন্ধান পেলেও ৪৭ শতাংশ যুবক দেশ ছাড়তে আগ্রহী।

দেশের শ্রমশক্তির পরিমাণ ৭ কোটি ৩৬ লাখ ৯০ হাজার। আর দেশের ভোটারের সংখ্যা ১১ কোটি ৯১ লাখ ৫১ হাজার ৪৪০ জন। শ্রমিক কৃষকের আয়, মধ্যবিত্তদের আয় আর ধনীদের আয় একই গতিতে বাড়ছে না। ফলে বৈষম্য বাড়ছে বিপুল গতিতে। নির্বাচনেও এ বৈষম্যের প্রতিফলন ঘটছে। নির্বাচিত বলে ঘোষিত হলে কত দ্রুতগতিতে নিজে এবং পরিবারের সদস্যরা সম্পদশালী হয়ে ওঠেন, তা দেখলে যেকোনোভাবেই নির্বাচিত হওয়ার কারণ বুঝতে অসুবিধা হবে না। একতরফা নির্বাচনের ফলে সংসদে কোনো জবাবদিহি করার সুযোগ থাকবে না। জবাবদিহিহীন পরিবেশ গনতন্ত্রকে ধ্বংস করে। ফলে ডামি প্রার্থীর এই নির্বাচনে কৃষক, শ্রমিক এবং মধ্যবিত্তের যন্ত্রণার অবসান ও গণতন্ত্রের পশ্চাদপসরণ রোধ করা যাবে না বরং নিয়ন্ত্রনহীনভাবে বৃদ্ধি পাবে।

লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত