পর্যটনে প্রতারণার ফাঁদ : ভ্রমণে চাই বাড়তি সতর্কতা

আপডেট : ১২ ডিসেম্বর ২০২৩, ০৬:৩৪ পিএম

বিদেশে অবকাশযাপন ক্রমেই জনপ্রিয় হচ্ছে। আজকাল অনেকেই ছুটি, উৎসব, বিবাহবার্ষিকী, মধুচন্দ্রিমা উদযাপন কিংবা কেনাকাটা ও  চিকিৎসার কারণে হরহামেশা বিদেশে পাড়ি জমাচ্ছেন। চাহিদা বাড়ায় দেশের নানা প্রান্তে অলি-গলিতে নামে-বেনামে গড়ে উঠেছে হাজারও পর্যটন পরিষেবা প্রতিষ্ঠান, যা ট্রাভেল এজেন্সি নামে পরিচিত।

এসব ট্রাভেল এজেন্সির মধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান সুপরিচিত। তারা ভালো মানের সেবা দিয়ে দীর্ঘপথ পরিক্রমায় মানুষের বিশ্বাসযোগ্যতা অর্জন করেছে। সেবার মান ঠিক রাখতে তাদের প্যাকেজগুলোর মূল্যও কিছুটা বেশি হয়ে থাকে। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান সস্তায় ভালো সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত কথা এবং কাজে মিল রাখতে পারছে না। ফলে গ্রাহকদের রোষানলে পড়ে দুর্নাম ডেকে আনছেন।

অন্যদিকে কিছু অসাধু লোক প্রতারণার উদ্দেশে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান গড়ে কিংবা স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানের নামে ভুয়া ওয়েবসাইট, অনলাইন পেজ, টিকেটিং পোর্টাল, অনলাইন বুকিং পোর্টাল তৈরি করে সাধারণ মানুষকে প্রতারণার ফাঁদে ফেলছেন। এতে অনেকেই ঠকছেন। পাঠকদের সচেতন করতে কয়েকটি প্রতারণার ঘটনা এখানে উল্লেখ করা হলো— 

১. মনির সাহেব (ছদ্মনাম) রাজধানীর একটি নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। ইউটিউব দেখে আরও চার বন্ধুকে নিয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় ইন্ডিয়ার শিলং বেড়াতে যাবার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করেন। বিশ্বব্যাপী সুপরিচিত একটি বুকিং সাইট থেকে পাঁচ তারকা হোটেলে দুই রাত থাকার জন্য দুটি কক্ষ ভাড়া করেন। সব চূড়ান্ত করে একটি বিকাশ নম্বরে টাকা পাঠিয়ে বুকিং কনফার্ম করতে ওই প্রান্ত থেকে তাগাদা দেওয়া হয় তাকে। নইলে রয়েছে বুকিং বাতিল হয়ে যাবার সতর্কতা। এদিকে মনির সাহেব কম টাকায় ভালো হোটেল পেয়ে তা হারানোর ভয়ে সঙ্গে সঙ্গেই ২৬ হাজার টাকা বিকাশে পাঠিয়ে দেন। এর কিছুক্ষণ পরেই নম্বরটি বন্ধ হয়ে যায়। 

২. লিনা (ছদ্মনাম), তার স্বামী, মা ও শাশুড়িকে নিয়ে ওমরাহ পালন করতে যাবেন। কয়েকটি এজেন্সির সঙ্গে কথা বলে সবচেয়ে কম দামের প্যাকেজটি নেন তিনি। তাদের জানানো হয়েছিল মক্কায় মসজিদুল হারামের কাছাকাছি হোটেলে রাখবে, ভালো মানের খাবার দেওয়া হবে এবং আকাশপথে দুই থেকে তিন ঘণ্টার যাত্রা বিরতি থাকবে। তারা যাওয়ার আগে সব টাকা পরিশোধ করে অবর্ণনীয় ভোগান্তিতে পড়েন। আসা-যাওয়া উভয় ক্ষেত্রে বিমানে ৮/৯ ঘণ্টার যাত্রা বিরতি দিয়েছিল। হোটেল দেওয়া হয়েছিল নিম্নমানের খাবার  এবং হোটেল ছিল মসজিদ আল হারাম থেকে দুই কিলোমিটার দূরে। লিনা যোগাযোগ করেও কাউকে পাননি সমস্যাগুলো সমাধানের জন্য।

৩. সম্প্রতি ট্রিপ কার্ড প্রতারণার কথা মিডিয়াতে প্রকাশ হওয়ায় অনেকেই তা জেনে গেছেন। তারা গুলশানে অফিস নিয়ে অবিশ্বাস্য কম মূল্যের লোভনীয় প্যাকেজের বিজ্ঞাপন প্রচার করে। তাদের নিজস্ব কিছু লোক ও পরিচিত ফেসবুক পেজ থেকে বিজ্ঞাপনের নিচে প্রশংসাসূচক মন্তব্য করায়। এতে আকৃষ্ট হয়ে অনেকে অগ্রিম টাকা দিয়ে বুকিং করেন। এরপর দুই তিন মাসে ৫০/৬০ লাখ টাকা নিয়ে অফিস বন্ধ করে, সিমকার্ড ফেলে উধাও হয়ে যায়। এ রকম অভিনব কায়দায় গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার কথা নিয়মিত শোনা যাচ্ছে।  অনেক আশার বিদেশ ভ্রমণ নিরাশায় পর্যবসিত হচ্ছে।

অবশ্য প্রতারণা আগেও ছিল। তবে এখন কৌশল বদলেছে। বর্তমানে অনলাইনে প্রতারণা বাড়ছে। বিদেশ ভ্রমণে কিছু বাড়তি সচেতনতা অবলম্বন করলে এমন অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়ানো যেতে পারে। 

ট্রাভেল এজেন্সি নির্বাচনে সতর্ক হতে হবে। দেখে নিন কোম্পানির ওয়েবসাইট বা অনলাইন পেজটি পুরনো নাকি নতুন। নতুন পেজে লাইক, ফলোয়ার কম থাকে। তাছাড়া পেজে ঢুকে পুরনো পোস্ট দেখা যেতে পারে। সেসব পোস্টের নিচে গ্রাহকদের মন্তব্যগুলো পড়ে দেখা যেতে পারে। বড় এজেন্সিগুলো প্রতারণা করে না, তাই খরচ একটু বেশি হলেও এমন এজেন্সির প্যাকেজ নেওয়া উচিত। আগের জানাশোনা আছে বা পরিচিত কারো সুপারিশ আছে এমন ট্রাভেল এজেন্সি নির্বাচন করুন।

লেনদেনে সতর্ক হোন। ট্রাভেল এজেন্সির নামে নিজস্ব ব্যাংক হিসাব না থাকলে লেনদেন করবেন না। পরিচিত না হলে কারো ব্যক্তিগত ব্যাংক হিসাবে, বা মোবাইল ব্যাংকিং অ্যাপের মাধ্যমে লেনদেন থেকে বিরত থাকুন, এমনকি এজেন্সির অফিসে রসিদ নিয়ে টাকা দেওয়াও নিরাপদ নয়। বড় অংকের টাকা অবশ্যই এজেন্সির ব্যাংক হিসাবে জমা দেবেন। যেসব এজেন্সির নিজ নামে কোনও ব্যাংক হিসাব নেই তাদের সেবা নেওয়া থেকে বিরত থাকুন।

‘সস্তার বারো অবস্থা’ একটি জনপ্রিয় উক্তি। সস্তায় কখনো ভালো সেবা পাওয়া যায় না। এজন্য ভালো দাম দিতেই হবে। যারা বাজার মূল্যের চেয়ে কমে অফার করবে, তারা প্রতিশ্রুতি রাখতে পারবে না। পুরনো মডেলের গাড়ি কিংবা কম ভাড়ার হোটেল রুম দিয়ে তারা পুষিয়ে নেবে।

বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনে তালিকাভুক্ত ট্রাভেল এজেন্সি নির্বাচন করুন। পর্যটন করপোরেশনের ওয়েবসাইটে বৈধ ট্রাভেল এজেন্টদের তালিকা দেওয়া আছে। সেখান থেকে দেখে নিতে পারেন।

পরিবার-পরিজন নিয়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বিদেশ ভ্রমণে না যাওয়াই উত্তম। নির্ভরযোগ্য ট্রাভেল এজেন্সিকে দায়িত্ব দিয়ে নিশ্চিন্ত থাকা যেতে পারে। নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় খরচ খুব যে কম হয়, তা কিন্তু নয়। এজেন্সিকে দায়িত্ব দিলে বিদেশ বিভুঁইয়ে গাড়ি এসে আপনার জন্য দাঁড়িয়ে থাকবে, আর নিজ ব্যবস্থাপনায় গেলে গাড়ির জন্য দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। এছাড়া পদে পদে ঠকার ভয় আপনাকে তাড়িয়ে বেড়াবে, যা আপনার ভ্রমণ আনন্দকে মাটি করতে যথেষ্ট।

লেখক: ব্যবস্থাপনা পরিচালক, রিজ ট্যুরিজম প্রাইভেট লিমিটেড

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত