অনেকটা নীরবেই পক্ষ বদল হলো। আর তা ঘটল জাতীয় পার্টির (জাপা) ভেতরেই। দলটির শীর্ষ দুই নেতা জি এম কাদের ও রওশন এরশাদ নিজেদের পক্ষ বদল করেছেন। জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের একসময় আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ট ছিলেন। এখন ঠিক তার উল্টো। অন্যদিকে বিএনপি ঘনিষ্ট রওশন এখন আওয়ামী লীগের কাছের মিত্র।
প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের ছোট ভাই ও স্ত্রী রওশনের এই পক্ষ বদল ঘটে ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত দশম সংসদ নির্বাচনের সময়। ওই নির্বাচনে বিএনপি ও প্রধান কয়েকটি দল অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলে জাপার অবস্থান হয়ে ওঠে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সে সময় দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এরশাদ সেই নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন এবং তার সেই সিদ্ধান্তের বড় সমর্থক ছিলেন জি এম কাদের। কিন্ত এই সিদ্ধান্তের বিপক্ষে শক্ত অবস্থান নেন রওশন। তিনি ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সঙ্গে মিলে জাপাকে নির্বাচনে যেতে বাধ্য করেন। জি এম কাদের-রওশনের এই বিপরীতমুখী অবস্থান রাজনীতিতে তাদের নতুন পরিচয় তৈরি করে। দীর্ঘদিনের মিত্র জি এম কাদের হয়ে উঠেন আওয়ামী লীগ বিরোধী এবং রওশন ক্রমেই ঘনিষ্ঠ হয়ে যান আওয়ামী লীগ সরকারের।
এর আগে ১৯৯৬ সালের সপ্তম সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ১৪৬টি আসন এবং বিএনপি ১১৬টি আসনে জয় পায়। একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় ৩২ আসনে জয়ী জাপা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে দুই দলের জন্য। জেলে থাকা এরশাদের সঙ্গে উভয় দলের নেতারা দেখা করে সমর্থনের অনুরোধ জানান। নানা নাটকীয়তার পর অবশেষে জাপার সমর্থন নিয়ে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ।
এর মাধ্যমে ২১ বছর পরে ক্ষমতায় ফিরে আসে দলটি। আওয়ামী লীগকে সমর্থন দেওয়ার নেপথ্যে সে সময় আনোয়ার হোসেন মঞ্জুর সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন সদ্য রাজনীতিতে পা রাখা জি এম কাদের।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে জাপার রাজনীতিতে আসেন জি এম কাদের। ১৯৯৬ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবারের মতো অংশ নিয়ে লালমনিরহাট-৩ আসন থেকে জয়লাভ করেন। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগের সঙ্গে মহাজোট গঠনেও জি এম কাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। সে সময় তিনি মহাজোট সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় এবং বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
রাজনীতিতে জি এম কাদের উচ্চাকাঙ্ক্ষী এবং স্বাধীনচেতা হিসেবে পরিচিত। বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালন করার সময় ডিম আমদানির অনুমতি নিয়ে ব্যবসায়ী ও আওয়ামী লীগের একদল নেতাকর্মীর সঙ্গে মনোমালিন্য হয়েছিল জি এম কাদেরের। আমদানির অনুমতি না দেওয়ার পক্ষে তার যুক্তি ছিল, এতে দেশীয় খামারিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
কিন্তু ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে এরশাদ শেষ মুহূর্তে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। তার নির্দেশে ছোট ভাই জি এম কাদেরসহ জাপার অনেকেই মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নিয়েছিলেন। এরশাদ ওই নির্বাচনে ঢাকা-১৭, রংপুর-৩ ও লালমনিরহাট-১ আসন থেকে মনোনয়নপত্র নিয়েছিলেন। যেকোনো কারণে লালমনিরহাট-১ ও রংপুর-৩ আসনে তার প্রার্থিতা থেকে যায়। রংপুর-৩ থেকে তিনি নির্বাচিত হন। অথচ এরশাদ নির্বাচনে অংশ না নেওয়ার প্রশ্নে অনড় ছিলেন। এমনকি সে সময় তাকে গ্রেপ্তারের গুঞ্জন উঠলে তিনি আত্মহত্যার ঘোষণা দেন। নির্বাচনের পুরো সময়ে প্রচার চালাননি, ছিলেন ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচে)। ওই নির্বাচনে জাপার অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে মধ্যস্থতার জন্য ছুটে এসেছিলেন ভারতের তখনকার পররাষ্ট্র সচিব সুজাতা সিং।
আওয়ামী লীগের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ওই সময়ে পাশে দাঁড়িয়েছিলেন রওশন। এরশাদের সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করে জাপা নির্বাচনে থাকবে, এমন ঘোষণা দেন তিনি। তারা অনুসারীরা এরশাদের নির্দেশ অমান্য করে মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করেননি। এরশাদের ঠাঁই হয় সিএমএইচে। জি এম কাদের আগেই মনোনয়ন প্রত্যাহার করে নেওয়ায় গুরুত্বহীন হয়ে পড়েন। চালকের আসনে চলে আসেন রওশন। এরশাদকে হাসপাতালে রেখে তিনি দফায় দফায় আওয়ামী লীগ ও জাপার নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেন। জাপায় আওয়ামীপন্থী হিসেবে পরিচিত জিয়াউদ্দিন আহমেদ বাবলু, আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, দলের মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, গোলাম সারওয়ার মিলন, মশিউর রহমান রহমান রাঙ্গাকে পাশে পান রওশন।
আনুগত্যের প্রতিদান হিসেবে আওয়ামী লীগ রওশনকে বিরোধী দল নেতার আসনে বসিয়েছিল। আর এরশাদকে করা হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত ও বিরোধী দলের উপনেতা। অথচ রওশন রাজনৈতিক জীবনের শুরুর দিকে বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
এ বিষয়ে রওশনপন্থী হিসেবে পরিচিত এরশাদ আমলের শিক্ষা উপমন্ত্রী গোলাম সারোয়ার মিলন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০০১ সালের নির্বাচন পর্যন্ত ম্যাডাম (রওশন এরশাদ) দলে বিএনপিপন্থী হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সে সময় বিএনপির সঙ্গে তার ভালো যোগাযোগ ছিল। কিন্ত ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে বিএনপি ম্যাডামকে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল তা নির্বাচনের পর রক্ষা করেনি। ২০০৮ সালের নির্বাচনের আগে থেকে তিনি পুরোপুরি আওয়ামী লীগের দিকে ঝুঁকে পড়েন।’
জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘২০১৪ সালের নির্বাচনে এমন একটা অবস্থা হয়েছিল যে, বিএনপি নির্বাচনে না এলে কোনো দল আসবে না। জাতীয় পার্টি যদি না আসে (নির্বাচন) তাহলে বাংলাদেশে একটা অসাংবিধানিক পরিস্থিতির সৃষ্টি হত। সাংবিধানিক শূন্যতার সৃষ্টি হত। সেই দিন রওশন এরশাদ এবং আমরা কয়েকজন এরশাদের সঙ্গে বেইমানি ও বিদ্রোহ করে নির্বাচন করেছিলাম।’
২০১৪-এর নির্বাচনে জি এম কাদের অংশ না নেওয়ায় দেশের সুশীল সমাজের ভূয়সী প্রশংসা পান ও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ তৈরি হয় তার। একই সঙ্গে জাপার নেতাকর্মীদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। মনে করা হয়, ওই একটা সিদ্ধান্ত জি এম কাদেরকে এরশাদের অবর্তমানে দলের প্রধান হওয়ার দৌড়ে অনেকটা এগিয়ে দিয়েছিল। রাজনীতিতে আরও পরিপক্ক হয়ে ওঠেন এবং জাপায় স্বাধীনচেতা একটি ধারা তৈরি করতে তৎপর হন তিনি। সরকার বিরোধী বিভিন্ন দলের সঙ্গেও তার ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়, যা সব সময় সন্দেহের চোখে দেখেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ।
২০১৯ সালের ৪ মে এক সংবাদ সম্মেলনে এরশাদ বলেছিলেন, ‘আমার অবর্তমানে দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব আমার ছোট ভাই জি এম কাদের পালন করবেন।’ একই বছরের ১৪ জুলাই এরশাদের মৃত্যু হয়। স্বাভাবিকভাবে জি এম কাদের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নেওয়ার কথা থাকলেও বাধা হয়ে দাঁড়ান রওশন ও তার অনুসারীরা। ৫ সেপ্টেম্বর দুজনেই নিজেদের দলটির চেয়ারম্যান বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। যদিও এরশাদের মৃত্যুর পর থেকে কাদের দলটির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছিলেন। এরপর তাদের বিরোধ বাড়তে থাকে সংসদের বিরোধী দলের নেতার চেয়ার নিয়েও। দু’পক্ষের মধ্যে পরে সমঝোতা হলেও বিরোধ আর মেটেনি।
আসন্ন দ্বাদশ নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রশ্নে জি এম কাদের যখন নির্বাচনে না যাওয়ার ঝুঁকি নিতে চেয়েছিলেন তখন আবারও সরকারের পক্ষ হয়ে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেন রওশন। ফলে বাধ্য হয়ে নির্বাচনে যাওয়ার ঘোষণা দেন জি এম কাদেরও। এরপর রংপুর-৩ আসনে ছেলে সাদ এরশাদ ও নির্বাচনে তার অনুসারীদের মনোনয়ন না দেওয়ায় নির্বাচনে না যাওয়ার ঘোষণা দেন রওশন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত মঙ্গলবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করে জি এম কাদের ও তার অনুসারীদের সঙ্গে সমঝোতা না করার অনুরোধ করেন রওশন।
